অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা: এক নতুন দিশার সন্ধান

শারীরিক স্বাস্থ্য Contributor
ফোকাস
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা
© Designer491 | Dreamstime.com

অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসার অভাবে মারা যান, এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এমনিতেই ক্যানসার রোগটির নাম শুনলেই মনের মধ্যে ভয় কাজ করে। তার মধ্যে এমন অনেক ক্যানসার রয়েছে, যেগুলির ক্ষেত্রে সেরকম কোনও উপসর্গ আগে থেকে বোঝা যায় না। ফলে চিকিৎসা শুরু করতেই অনেক দেরি হয়ে যায়, আর এই দেরির সঙ্গে-সঙ্গে রোগীর সুস্থতার সম্ভাবনা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার তার মধ্যে অন্যতম। রেডিয়েশন, সার্জারি, কেমোথেরাপির মাধ্যমে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা হলেও সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রত্যেক ১২ মিনিটে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একজন মানুষ অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে মারা যান। তবে সম্প্রতি অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে নতুন এক গবেষণা। আজ আমরা সেই নিয়ে আলোচনা করব।

অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কারণ

ঠিক কী কারণে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার হয়, তা ডাক্তাররা বলতে না পারলেও এর পিছনে বেশ কিছু সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করা গিয়েছে। সাধারণভাবে অগ্ন্যাশয়ের কোনও কোষে ডিএনএ-র পরিবর্তন (মিউটেশন)-এর ফলে এই ক্যানসার হয়। মিউটেশনের ফলে কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, এবং সুস্থ কোষগুলির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধূমপান, ডায়াবেটিস, অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ, পরিবারে কারওর ক্যানসারের ইতিহাস, ওবেসিটি এবং বয়সজনিত কারণে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার হতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর উপসর্গ আগে থেকে বোঝা যায় না। তাই রোগ আগে থেকে ধরা পড়ে না। ক্যানসারের ‘অ্যাডভান্সড’ ধাপে তলপেটে যন্ত্রণা, ক্ষুধামান্দ্য, জন্ডিস, মলের কালচে বর্ণ, চুলকুনি, রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়া, ক্লান্তি ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়।

অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত

সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগো স্কুল অফ মেডিসিন এবং মুরস ক্যানসার সেন্টার, স্ট্যানফোর্ড-বার্নহ্যাম-প্রেবিস মেডিকেল ডিসকভারি ইনস্টিটিউট ও কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকরা একযোগে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন এক পদ্ধতি তুলে ধরেছেন। ‘টিউমার পেনিট্রেটিং থেরাপি’ বা টিউমারে প্রবেশকারী এই থেরাপি ইতোমধ্যেই পশুদের উপর প্রয়োগ করা হয়েছে। এই চিকিৎসাপদ্ধতি কেমোথেরাপির কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে, শরীরের অন্য অংশে ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়া বা ‘মেটাস্ট্যাটিস’-এর হার কমাতে এবং রোগীমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকরী।

৯ মার্চ, ২০২১-এ ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ অনলাইনে প্রকাশিত হওয়া এই গবেষণাপত্রের নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি অনুযায়ী, টিউমারকে টার্গেট করা পেপটাইড বা iRGD, টিউমার রক্ষাকারী বর্মের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এবং তার ফাইবার টিসুগুলিকে ব্যবহার করে টিউমারের গভীরে প্রবেশ করে ভিতর থেকে টিউমারকে ধ্বংস করে।

অগ্ন্যাশয় ক্যানসারে ওষুধ কাজ করে না!

অগ্ন্যাশয় হল আমাদের পেটের পিছনের অংশে থাকা একটি বৃহৎ গ্রন্থি। অগ্ন্যাশয়ে উৎপন্ন উৎসেচক খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে এবং এখানে থাকা হরমোন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডিনোকারসিনোমা (পিডিএসি) অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের একপ্রকার ধরন। এই প্রকারের ক্যানসারের টিউমারের আশপাশে মোটা, শক্ত একধরনের আবরণী থাকে, যার ফলে কোনও ওষুধই এক্ষেত্রে কাজ করে না।

“এইধরনের টিউমার ঘন ফাইবার টিসু দিয়ে তৈরি হয়, যার ফলে কোনও ওষুধই এই ফাইবার টিসুর আবরণী ভেদ করে টিউমারের গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। অনেক ওষুধ আবার টিউমারের নালিকা অবধি পৌঁছতে পারলেও সেগুলি কোনওভাবেই টিউমারের গভীরে প্রবেশে অক্ষম। ফলে এইধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় সেভাবে সাড়া পাওয়া যায় না। আর তাই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে ওঠে,” জানালেন ইউসি সান ডিয়েগো স্কুল অফ মেডিসিন অ্যান্ড মুরস ক্যানসার সেন্টারের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট এবং এই গবেষণাপত্রের প্রথম লেখক তাতিয়ানা হারটাডো দি মেনডোজা (পিএইচডি)।

নতুন চিকিৎসা কতটা কার্যকরী?

“আমাদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, টিউমারের অভ্যন্তরে প্রবেশকারী পেপটাইড iRGD এই ফাইবারের আবরণীকে কাজে লাগিয়ে কেমোথেরাপির ওষুধকে টিউমারের গভীরে পৌঁছে দেয় এবং কেমোথেরাপির কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।”

গবেষকরা একটি ইঁদুরের পিডিএসি টিউমারের ‘মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট’ পরীক্ষা করে দেখেন। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, টিউমারের রক্তনালিকাগুলি টার্গেট করার পর iRGD উচ্চমাত্রার β5 ইন্টিগ্রিন প্রোটিনের সঙ্গে আবদ্ধ হয়। এই β5 ইন্টিগ্রিন কারসিনোমা-অ্যাসোসিয়েটেড ফাইব্রোব্লাস্ট (সিএএফ) কোষ দ্বারা উৎপন্ন হয় এবং টিউমারের ফাইবারযুক্ত আবরণী গঠনে সাহায্য করে।

ইউসি সান ডিয়েগো স্কুল অফ মেডিসিন, ইউসি সান ডিয়েগো হেলথ-এর মুরস ক্যানসার সেন্টারের সার্জিকাল অঙ্কোলজি বিভাগের প্রধান ও এই গবেষণাপত্রের সহলেখক অ্যান্ড্রু লোয়ির কথায়, “আমরা আমাদের ইঁদুরের মডেলে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের প্রতিরূপ তৈরি করেছিলাম। দেখা গিয়েছে, যখনই ইঁদুরের দেহে কেমোথেরাপির মাধ্যমে উচ্চমাত্রার β5 ইন্টিগ্রিনের সঙ্গে iRGD-র প্রবেশ ঘটানো হয়েছে, তখনই শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে ও মৃত্যুহার কমেছে। ফলে আক্রমণাত্মক ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি সাধারণ কেমোথেরাপির চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।”

দ্রুত শুরু হবে মানুষের উপর ট্রায়াল

“তাৎপর্যপূর্ণভাবে খেয়াল করা গিয়েছে যে এই iRGD থেরাপির অন্য কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এটি রোগী চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ,” মন্তব্য লোয়ির।

গবেষকরা জানিয়েছেন, এর পরের ধাপেই মানুষের উপর জাতীয় স্তরে এই চিকিৎসাপদ্ধতির কার্যকারিতার ক্লিনিকাল ট্রায়াল করা হবে। তাঁদের অনুমান, একবছরের মধ্যেই এই ট্রায়াল শুরু হয়ে যেতে পারে।

“আমাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান সরাসরি রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। আমরা এটাও মনে করি যে, কোন-কোন রোগী তাঁদের অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় iRGD কম্বিনেশন থেরাপি থেকে সর্বাপেক্ষা উপকৃত হচ্ছেন, তা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের মধ্যে থাকা β5 ইন্টিগ্রিনের মাত্রা থেকেই বোঝা সম্ভব,” বলছেন লোয়ি।

তাই নতুন ধরনের এই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসা যে নতুন দিক খুলে দেবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.