অজানা ইরাক: ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন

মধ্য প্রাচ্য ১৮ মার্চ ২০২১ Contributor
ফোকাস
অজানা ইরাক
Gate of partially restored Babylon ruins, Hillah, Iraq. © Sergey Mayorov | Dreamstime.com

আজ আমরা এমন এক অজানা ইরাক-এর কাহিনি আপনাদের শোনাব, যে কাহিনি আগে কখনও শোনেননি! ইরাক বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত শতধাবিভক্ত এক দেশের ছবি। কখনও ১৯৮০-র ইরাক-ইরান যুদ্ধে, কখনও ১৯৯০-এ ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পর উপসাগরীয় যুদ্ধে, আবার কখনও বা ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেনের শাসন থেকে ইরাকিদের ‘মুক্ত করতে’ আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের যৌথ আক্রমণে বারংবার রক্তাক্ত হয়েছে মধ্য এশিয়ার এই দেশ।

যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতে বহু ইরাকবাসীই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই ইরাকিদের কথায়, সাক্ষাৎকারে প্রায়শই ফিরে আসে তাঁদের ফেলে আসা প্রিয় দেশের কথা। আর তাঁদের বয়ানেই রূপ পায় এক অজানা ইরাক! আজকের লেখায় সেই অজানা ইরাকের কিছু খণ্ড ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করব আমরা।

অজানা ইরাক: প্রাচীন ইতিহাসের মেসোপটেমিয়া

আপনারা অনেকেই জানেন, আজকের ইরাকেই ছিল খ্রিস্টপূর্বাব্দ যুগের প্রাচীন মেসোপটেমিয় বা সুমেরিয় সভ্যতা। এই সভ্যতার বাণিজ্য চলত হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানা প্রান্তের প্রাচীন সভ্যতাগুলির। সেকালের ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের কথা আজও লোকের মুখে-মুখে ফেরে! ইরাকের সভ্যতা ও সংকৃতি প্রাচীনকাল থেকেই উন্নত। প্রাচীন পৃথিবীর প্রাণকেন্দ্র এই সুমের, অর্থাৎ ইরাকেই আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে লেখার আবিষ্কার হয়। আরব দুনিয়ার বহু খ্যাতনামা কবি, চিত্রকর, স্থপতির জন্মস্থান এই ইরাক ভূখণ্ড। এরপর ইসলামের আবির্ভাবের পর অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে এখানে আব্বাসীয় খলিফাদের রাজত্ব শুরু হয়। এঁদের রাজধানী ছিল বাগদাদ নগরীতে। হাতের সূক্ষ্ণ নানা কারুকাজ, গালিচা, কার্পেট ইত্যাদির জন্য ইরাক বিখ্যাত।

হারুন-অল-রশিদের রাজত্বকালে স্বপ্ননগরী ছিল বাগদাদ!

অজানা ইরাক সম্পর্কে আমরা কিছুটা ধারণা পেতে পারি ‘আরব্য রজনী’তে। সেখানে বাগদাদের খলিফা হারুন-অল-রশিদের রাজধানী বাগদাদের গল্প পড়ে সে যুগের ইরাকের বিলাসে মজেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন! শোনা যায়, তাঁর সময়েই নাকি বাগদাদ প্রাচুর্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতির শিখরে পৌঁছয়। আটের দশকে যুদ্ধবিদ্রোহ শুরু হওয়ার কিছু বছর আগেও ইরাক সমৃদ্ধ এক দেশ ছিল। বিভিন্ন ইরাকবাসীদের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণা থেকে সে সময়কার এক অজানা ইরাকের কাহিনি জানা যায়।

সেকালে ইরাক খুব সুন্দর এক দেশ ছিল। সেখানকার মিঠা পানি, বৃষ্টি পড়ার পর সোঁদা মাটির গন্ধ, বসন্তে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় কমলালেবুর ফুলের সুবাস, উঁচু-উঁচু পামগাছ, ভোরবেলা ঘুঘুর ডাকের সঙ্গে ভেসে আসা নাইটিঙ্গেল পাখির গান, যারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে খেজুর খেয়ে বেড়াত, বাচ্চাদের খেলাধুলোর আওয়াজ, মসজিদে আজানের সুর, আর বাজারে দোকানিদের ফল, সবজি বেচার জন্য হাঁকাহাঁকি… সব মিলিয়ে ইরাকের শহরগুলি ছিল প্রাণবন্ত।

যুদ্ধপূর্ব ইরাক: নির্ঝঞ্ঝাট দিন

ছোটবেলায় বাচ্চারা খেলাধুলো করত, বাড়ির বাগানে, কখনও বা মাঠে। জাগলিং থেকে শুরু করে স্কিপিং, দৌড়নো, জগিং ইত্যাদি সেখানকার শিশুদের প্রিয় খেলা। সেসময় স্মার্টফোনের বাড়াবাড়ি ছিল না। ফলে জীবন ছিল অনেক সহজ। ছোটবেলায় স্মার্টফোনে একা-একা গেমস খেলার বদলে সকলের সঙ্গে খেলাধুলো করে বা টেলিভিশনে কার্টুন দেখেই নির্ঝঞ্ঝাট দিন কাটত বাচ্চাদের। গরমকালে আনাগোনা বাড়ত আইসক্রিমওয়ালাদের। ছোট গাড়ি করে নানা স্বাদের আইসক্রিম বিক্রি করত তারা। শীতে আবার দেখতে পাওয়া যেত হামাস বিক্রেতাদের। এভাবেই ছোট গাড়ি করে “গরমাগরম হামাস! তাড়াতাড়ি এস ছোট্ট বন্ধুরা। মাত্র ১০ ফিলসে (০.৫ সেন্টস)-এ নিয়ে যাও গরম হামাস!” বলে হেঁকে যেত। তখনকার ইরাকে আজকের দিনের মতো অগ্নিমূল্য ছিল না সব। ফলে সস্তায় মিলত খাবার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস।

এক ইরাকি ভদ্রলোকের স্মৃতিচারণায় জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার পরই তাঁর সামনে ইরাকের এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। দক্ষিণ থেকে উত্তর, পশ্চিম থেকে পূর্ব, সমগ্র ইরাকই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে ফেলেছিলেন। ইরাকের দক্ষিণে শত-অল-আরব নদীর তীরে অবস্থিত বিখ্যাত শহর বসরা, যা এককালে বিখ্যাত ছিল সুগন্ধী বসরাই গোলাপ আর মুক্তোর জন্য। এছাড়াও বসরা থেকে ৭৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে রয়েছে আল-কারনা শহর। এই শহরেই প্রাচীন মেসোপটেমিয় সভ্যতার প্রাণবিন্দু ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী পরস্পরের সঙ্গে মিশেছে। সুমেরিয় সভ্যতার সময়কালীন জিগগুরাটের সন্ধান পাওয়া যায় আর এক ঐতিহাসিক শহর উর-এ। এগুলি ছাড়া মায়সান, এল মুথানা, ব্যাবিলনিয়া, ইত্যাদি শহরগুলি আজও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। সম্রাট দ্বিতীয় নেবুকাডনেজারের সময়কালে নির্মিত ব্যাবিলনে অবস্থিত প্রায় ২৬০০ বছর আগের পাথরের সিংহটির জৌলুস আজও অটুট!

দিলখোলা এক অজানা ইরাক!

ইরাকের মানুষজন খুব উদার ও দিলখোলা। সুখ-দুঃখ, যাই বলুন, ইরাকিদের মতো বন্ধু কিন্তু হয় না! কোনও ইরাকি যদি আপনার আশেপাশে থাকেন, বা কোনও ইরাকির সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হয়, তাহলে আপনি কখনওই খালিপেটে থাকবেন না! তাঁরা এতটাই বন্ধুত্বপূর্ণ ও অতিথিবৎসল, যে নিজেরা না খেয়ে আপনাকেই আগে থালা ভর্তি করে খেতে দেবেন। ইরাকি মহল্লায় বাড়ি হলে দেখবেন, আপনি আপনার প্রিয় কাউকে হারালে, কাঁধ দেওয়ার জন্যই তাঁরাই আগে এগিয়ে আসবেন, এমনকী, সেই সময়কার সমস্ত আয়োজনের দায়িত্বও ইরাকিরা নিজ কাঁধেই তুলে নেবেন! এছাড়া পবিত্র রমজান মাসে একসঙ্গে ইফতারি করা বা ইদে একসঙ্গে দেখা করা তো রয়েছেই।

আর ইরাকের যে-শহরের কথা না বললেই নয়, সেটি অধুনা ইরাকের রাজধানী এবং বিখ্যাত ঐতিহাসিক শহর বাগদাদ। প্রাচীন আরবি বাজার, সরু গলি, তামার বাজারের টুংটাং আওয়াজ, রঙিন জামাকাপড় আর পুরনো কার্পেট, টাটকা রুটির দোকান, এই নিয়েই বাগদাদ। শুরগা স্ট্রিটে গেলেই আপনি যেমন পাবেন ধুপ আর মশলার গন্ধ, তেমই পুরনো আল-রাশেদ স্ট্রিটে গেলে দেখতে পাবেন, সে রাস্তা কেমন সেজে উঠেছে উজ্জ্বল আলোয়! তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে এসব বেশিরভাগ স্মৃতিই ঝাপসা। তাও মাঝে-মাঝে বাগদাদের পুরনো অলিতে-গলিতে উঁকি দেয় অজানা এক ইরাক, যে-ইরাকে আজও মানুষ যুদ্ধ ভুলে শান্তিতে থাকতে চায়।