অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার আপনার সন্তানকে স্বার্থপর করে দেয়

আমার ছেলেকে উইন্ডোজ বন্ধ করতে বললে ও ল্যাপটপ টার্ন অফ করে দেয়।’

‘আমার মেয়ে তো ওর বইগুলোও সোয়াইপ করে স্ক্রিন ভেবে।‘

একবিংশ শতকের বাবা-মায়েরা ছোট থেকেই সন্তানদের টেক-স্যাভি অভ্যাসে যে খুশি তার প্রমাণ পাওয়া যায় এই আনন্দিত উক্তিতে। 

‘আমার ছেলে মেয়েরা তো একদম জ্বালায় না, ফোনেই ওরা সারাদিন ব্যস্ত।‘ এটা বলার মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি আছে তা কিন্তু আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। সন্তানকে মানুষ করতে আপাতভাবে টেকনোলজি খানিক সাহায্য করলেও, আদতে তা আপনার সন্তানের উন্নতি পরিপন্থী। মহান আল্লাহ তা’আলা প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে নিজেদের সন্তানকে মানুষ করে তুলতে বলেছেন, সেই উপদেশ ভুলে যাবেন না। 

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে পেরেন্টিং বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে আমাদের মতো ইসলাম বিশ্বাসী মানুষদের জন্য। আমাদের কিছু কিছু উসুল রয়েছে যা অনেক সময়ই বাকি দুনিয়ার সঙ্গে মেলে না। এই উসুল বজায় রাখার জন্য খুব সচেতন ভাবেই নিজেদের আচার আচরণ সম্পর্কে খেয়াল রাখতে হয়। একদিকে নিজেদের উসুল বজায় রাখা, অন্যদিকে জগতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা আমাদের সন্তানের হাতে তুলে দিই ফোন, ল্যাপটপ, এক্সবক্স-এর মতো যন্ত্র। এটা ভুলে যাই, ছেলেবেলা হল ছোটাছুটি করে খেলাধুলো করার সময়, এখন তাদের এইসব দিলে এক স্থবির ছেলেবেলা উপহার দেওয়া হয়। 

 আপনার সন্তান যখন দেড় বছর বয়সেই ফোনের সুইচ টিপে অন করে দেবে, বা তিন বছরেই নিজের প্রিয় ইউটিউব ভিডিয়ো চালিয়ে শুনবে তখন আপনি নিশ্চয়ই ভাববেন যে সে অন্যান্যদের থেকে বেশি বুদ্ধিমান। আসলে, ঠিক উলটো। যত বেশি প্রযুক্তি ও যন্ত্রে সে মগ্ন হয়ে পড়বে তত তার স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা কমতে থাকবে। একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায়, গ্যাজেট ব্যবহার করার জন্য কিন্তু খুব তুখোড় মাথা প্রয়োজন হয় না। আমরা ২-৩ দিনেই নতুন ফোন ব্যবহার করতে শিখে যাই। যেকোনও যন্ত্র ওভাবেই তৈরি হয়, যাতে মানুষ সহজেই ব্যবহার করতে পারে। 

প্রকৃতিগতভাবে, ছেলে-মেয়েরা শ্রবণ, দর্শণ, স্পর্শ ও অন্বেষনের মাধ্যমে জীবনশৈলির শিক্ষা নেয়। তারা ভুল করে, ভুল থেকে শেখে। এইভাবে বড় হয়ে ওঠায় তাদের চিন্তাশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। অপরদিকে, যদি এই সময় তাদের ‘স্ক্রিন টাইম’ বেশি হয়, যদি ফোন বা ল্যাপটপ তাদের হাতের কাছে থাকে তবে সবার আগে মনোযোগ নষ্ট হতে শুরু করে। 

একটি বাচ্চার স্ক্রিন টাইম (ল্যাপটপ, টিভি, ফোন) যত বেশি হবে, তত সে এন্টারমেন্টের প্রতি আকৃষ্ট হবে। নিজে থেকে হাতে কলমে কিছু জানা বা শেখার প্রতি আগ্রহ কমতে থাকবে। এর কারণ, সে সমস্তটাই হাতের কাছে পাচ্ছে। সে জ্ঞান আহরণ করছে না, তাকে তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে। আহরণ ও পরিবেশনের মধ্যে বিস্তর ফারাক! 

ছোট থেকে নানারকম তথ্য যদি একটি শিশুকে গিলিয়ে দেওয়া যায় তাহলে তার জীবনটা সম্পূর্ণভাবেই ওই তথ্যনির্ভর হয়ে ওঠে।  শিশুটি বড় হয় একটি কৃত্রিম পরিবেশে, তার চাহিদাও ভীষণ ভাবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নির্ভর হয়ে যায়। একটা সময় সে বিশ্বাস করতে শুরু করে তার প্রতিদিনের জীবন সোশ্যাল মিডিয়ায় ডকুমেন্টেড না করলে তার দিনযাপনে একটা অপূর্ণতা থেকে যাবে। 

আপনার সন্তান যদি ছোট থেকেই প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়ে যায় তাহলে তার বেড়ে ওঠা হয়ে উঠবে কৃত্রিম ও বাজারচলতি চিন্তাভাবনায় প্রভাবান্বিত। নিছক পড়াশুনোর জন্য ইন্টারনেট বা ফোন ব্যবহার করা সমস্যার নয়, সমস্যা এটাই যখন সেই ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়। 

তবে, বর্তমান জীবনযাত্রায় প্রযুক্তিকে একেবারেই সরিয়ে রাখা যাবে না। সেই জন্য শিশুদের স্ক্রিন টাইমের একটা প্রচলিত গাইডলাইন রয়েছেঃ

০-১৮ মাস – কোনওপ্রকার ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা যাবে না। মাঝে মাঝে ভিডিয়ো চ্যাটিং ছাড়া। 

১৮ মাস থেকে ২ বছর- শুধুমাত্র পড়াশুনোর জন্যই ব্যবহার করা যাবে।

২-৫ বছর- প্রতিদিন এক ঘণ্টা মাত্র

৫ বছরের বেশি- নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম না থাকলেও বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে কতক্ষণ সময় কাটাচ্ছে ও কী দেখছে। 

ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হল মানবজাতির কল্যাণে নিজেকে সমর্পণ করা। প্রত্যেক সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহকে দেখা। জীবনে ছোট ছোট অভিজ্ঞতায় আনন্দ খুঁজে পাওয়া। স্বার্থপরতা বদলে পরোপকারে মন দিলেই প্রকৃত মুসলমান মুক্ত হতে পারে। বস্তুগত জগত থেকে অ্যাধ্যাত্মিক জগতে উত্তরণও ইসমালের লক্ষ্য। প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে আমাদের ফোন আমাদের সেই অ্যাধ্যাত্মিক জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। স্বার্থপর করে তোলে। আমাদের সন্তানকে নিশ্চয়ই এমন এক স্বার্থপর দুনিয়া আমরা দিয়ে যেতে চাই না।

তাই, পরের বার, যখন আপনার সন্তান বায়না করবে, কাঁদবে, তখন তার হাতে ফোন না দিয়ে পাজল বা বিল্ডিং ব্লক তুলে দিন। প্রয়োজনে তাকে ছবি আঁকতে শেখান। নিদেনপক্ষে আপনার হাতে হাতে কাজ করতে শেখান। কারণ, প্রযুক্তি আপনার সন্তানকে অলস করে তোলে, জীবনের সঙ্গে যোগ থাকলে সেই আলস্য কাটানো যায়। 

আর, ইমানদার মুসলমান ও মুসলিম্মা হিসাবে নিজেদের সন্তানকে পরিশ্রমী করে গড়ে তোলার কর্তব্য আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন।