অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বাড়িয়ে তোলে ডিপ্রেশন

প্রযুক্তি ০২ এপ্রিল ২০২১ Contributor
মতামত
সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার
Photo by Tracy Le Blanc from Pexels

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ভাল না খারাপ, এই বিতর্ক আজকের সমাজের রীতিমতো এক ‘হট টপিক’। হাতের স্মার্টফোন আর সুলভ ইন্টারনেটের দৌলতে নেটদুনিয়া এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। বিশেষত করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে মানুষে-মানুষে আলাপ, যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে সোশ্যাল মিডিয়া। পাশাপাশি বসে গল্পে নয়, মানুষ এখন তার বিনোদন খোঁজে সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতে। দুই বন্ধু হয়তো কাছাকাছি বসে, বহুদিন পরে হয়তো দেখা হয়েছে তাদের। কিন্তু অল্প গল্পের পরেই মন চলে গিয়েছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্র্যামের দেওয়ালে। সামনাসামনি গল্প নয়, সেলফি তুলে সেগুলি পোস্ট করে ভার্চুয়াল দুনিয়া থেকে ‘লাইক’ বা ‘কমেন্টসে’ বাহবা পেয়েই মন ভরছে তাদের! আবার কখনও দেখা যায়, বাড়িতে একই ঘরে বসেও পরিবারের চার সদস্য হয়তো মজে সোশ্যাল মিডিয়ার নেশায়!

সোশ্যাল মিডিয়ার অভিশাপ

এই ঘটনাগুলির শিকার কম-বেশি আমরা সকলেই। অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার যে কীভাবে মানুষের, বিশেষ করে যুবসমাজের ক্ষতি করছে, এই নিয়ে নানা গবেষণা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বনাশা নেশাই বর্তমান সমাজে ডিপ্রেশন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, এই নিয়ে মনোবিদরা বহুদিন থেকেই সরব। যে-সমস্ত যুবক-যুবতীরা দিনের বেশিরভাগ সময়েই সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকেন, মোটামুটি ছ’মাসের মধ্যেই তাঁরা নাকি অবসাদে যেতে শুরু করেন, সম্প্রতি কলেজ অফ এডুকেশন অ্যান্ড হেলথ প্রফেশনস-এর ডিন এবং ইউনিভার্সিটি অফ আরকানসাস-এর পাবলিক হেলথ বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর ব্রায়ান প্রাইম্যাকের নতুন সমীক্ষায় উঠে এল এমনই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

দেখা গিয়েছে, যে-সমস্ত যুবক-যুবতী অংশগ্রহণকারীরা প্রতিদিন ১২০ মিনিট বা দু’ঘণ্টার কম সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে থাকেন, তাঁদের তুলনায় যারা ৩০০ মিনিট পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্র্যামে ব্যয় করে থাকেন, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে তাঁদের ছ’মাসের মধ্যে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রায় ২.৮ গুণ বেশি।

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ডেকে আনে ডিপ্রেশন

অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার এবং তার সঙ্গে ডিপ্রেশনের সম্পর্ক নিয়ে এত বড় মাপের জাতীয় সমীক্ষা এর আগে আর হয়নি। সমীক্ষাটি গতবছরের ডিসেম্বরে অনলাইনে প্রকাশিত হওয়ার পর এবছর ‘আমেরিকান জার্নাল অফ প্রিভেনটিভ মেডিসিন’-এর ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাইম্যাকের কথায়, “এই বিষয়ক পূর্ববর্তী সমীক্ষাগুলি আমাদের কাছে ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’র মতো শাশ্বত কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। সেখান থেকেই আমরা জেনেছিলাম যে, ডিপ্রেশন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের সম্পর্ক নিবিড়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারেই ডিপ্রেশন আসে, নাকি ডিপ্রেশনই বাড়িয়ে তোলে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার, এই প্রশ্নের উত্তর তখনও অজানা ছিল। আমাদের নতুন সমীক্ষা এইসমস্ত ক্ষেত্রে আলোকপাত করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা দেখেছি, প্রাথমিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারই ডিপ্রেশনকে বেশি করে বাড়িয়ে তোলে। যদিও, ডিপ্রেশনের ফলে যে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার বেড়েছে, এমন কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।”

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কমায় মানুষের মধ্যে যোগাযোগ!

২০১৮ সালে প্রাইম্যাক এবং তাঁর সহকর্মীরা ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবার্গে ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ১০০০ জনেরও বেশি আমেরিকানের নমুনা সংগ্রহ করে তাঁর উপর সমীক্ষা চালান। এঁদের কারওর ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন রয়েছে কিনা, তা জানার জন্য গবেষকরা ন’টি বিষয় যুক্ত একটি প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে সমীক্ষা চালান, এবং অংশগ্রহণকারীরা দিনের কতক্ষণ সময় ফেসবুক, টুইটার, রেডিট, ইনস্টাগ্র্যাম, স্ন্যাপচ্যাট ইত্যাদিতে ব্যয় করছেন, সেই নিয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁদের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের বয়স, লিঙ্গ, জাতি, শিক্ষা, উপার্জন এবং কর্মের উপর জোর দেন। এবং এই সমীক্ষার ফলাফল থেকে যাতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জনসংখ্যার অবস্থার কথা জানা যায়, সেদিকেও তাঁরা নজর দেন।

“এর একটা কারণ হতে পারে, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার কিন্তু দিনের একটি মূল্যবান সময় আমাদের থেকে নিয়ে নেয়,” জানালেন ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবার্গের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও এই সমীক্ষার সহলেখক ডক্টর সিজার এস্কোবার-ভিয়েরা। তাঁর কথায়, “অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার মানুষে-মানুষে ব্যক্তিগত যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে না ব্যক্তিগত, না পেশাগত, কোনও লক্ষ্যই পূরণ হয় না। এমনকী, সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার আমাদের ভাবনা-চিন্তা, আত্মসমীক্ষার সময়ও কমিয়ে দেয়।”

গবেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের সামাজিক প্রতিতুলনার ফলে আরও কিছু বিষয় উঠে আসে।

করোনাকালীন সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া

“সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই আমাদের সামনে ইতিবাচক, সুন্দর একটা চিত্র তুলে ধরে। সেকারণেই একে বিশেষভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে যে-সমস্ত কমবয়সী যুবক-যুবতীরা তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যে-সময়টা তাঁদের পরিচিতি গড়ে ওঠার সময়, সেটিই বাধাপ্রাপ্ত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারের নেশায় তাঁরা বেশিরভাগ সময়েই বুঝে উঠতে পারেন না যে, সোশ্যাল মিডিয়া আদতে কতটা ঠুনকো!” জানাচ্ছেন ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবার্গের মেডিসিনের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ও এই সমীক্ষার সহলেখক জেমি সিডানি।

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ‘ওয়র্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন’ (‘হু’)-এর তরফ থেকে ডিপ্রেশনকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘হু’-এর কথায়, অবসাদ বর্তমানে অক্ষমতার অন্যতম বড় কারণ। অন্যান্য মানসিক সমস্যার চেয়ে অবসাদই মানুষের আরও বেশি ক্ষতি করে। সেই কারণে বর্তমান সময়ে এই সমীক্ষার ফলাফল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

“বর্তমান বিশ্বে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে এই সমীক্ষার ফলাফল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখন সামাজিক দূরত্ববিধির ফলে মানুষে-মানুষে মুখোমুখি যোগাযোগের সম্ভাবনা কমছে। আর তাই আরও বেশি করে মানুষ ফেসবুক, টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভার্চুয়াল জগতে আরও বেশি করে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এইসমস্ত প্রযুক্তি যদিও মূল্যবান, তবে তাকে বুঝে ব্যবহার করা উচিত। আমি সকলকে বলব, যে-প্রযুক্তিগুলি মানুষের সত্যিকারের কাজে লাগে, সেগুলোই ব্যবহার করুন। আর যেগুলো ব্যবহার মানুষের ক্ষতি করে, সেগুলি শত ভাল লাগলেও, তাদের বর্জন করাই যুক্তিযুক্ত,” পরামর্শ প্রাইম্যাকের।

তাই সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার আপনার ভাল লাগলেও আপনার কতটা সময় আপনি তাতে দেবেন, সেটি কিন্তু বুঝতে হবে নিজেকেই। ফলে এক্ষেত্রে সতর্ক থাকাই শ্রেয়।