অন্যমনস্কতার জন্য কঠিন মূল্য না চোকাতে হয় যেন

The Salda Lake like Maldives from Burdur Turkey.Blues and sand amazing
Fotoğraf: ID 177089920 © Alperayten | Dreamstime.com

আমাদের প্রজন্ম আজ এক গভীর অন্যমনস্কতায় মধ্যে ডুবে আছে। আমি স্বীকার করছি যে, আমিও ব্যতিক্রম নই। সম্প্রতি একদিন আমার বাচ্চাদের স্কুলের সামনে হাঁটছিলাম। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, সেই মুহূর্তে একটা ফোন এল। আমি ফোনে কথা বলছিলাম, ফোনে একজন মহিলা তার মায়ের মৃত্যুর কথা বলছিল, আমি একটু শোকাচ্ছন হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার দুই সন্তান সাইকেল নিয়ে পড়ে যাবার উপক্রম। ওরা বড় রাস্তার কাছে চলে গেছে। সেখান দিয়ে দ্রুতবেগে ট্রাক চলে যাচ্ছে। আমি কোনমতে ফোন রেখে চিত্কার করে ছোটটার নাম ডাকলাম। ওর দুজনেই হতভম্ব হয়ে থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য আমার হৃদয় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল।

পরমুহূর্তে দেখলাম একটা গাড়ি ওদের সাইকেলের সামনে এসে দাঁড়াল। আর সেখান থেক নেমে এলেন মহিলা পুলিশ অফিসার। আমি প্রমাদ গুনলাম। আমাদের বাসস্থান আমেরিকা। এখানকার অঙ্গরাজ্য টেক্সাসে, স্কুলের আশেপাশে গাড়ি চালানো এবং ফোনে কথা বলা অবৈধ।

তবে স্কুল অঞ্চলের বাইরে লোকে যথেচ্ছারে ড্রাইভিংয়ের সময় মোবাইল ব্যাবহার করছে। টেক্সট করছে। যার ফলে পথ্য দুর্ঘটনা মারাত্মক আকার নিয়েছে। এই নিয়ে কঠোর আইন প্রণয়ন হয়নি। নিয়ম থাকলেও লোকে বুড়ো আঙুল দেখায়।

আমি গাড়ি চালানো অবস্থায় সেল ফোনের ব্যবহার অবৈধকরণের ব্যাপারে একজন দৃঢ় সমর্থক, এবং এখনও, আমার সাম্প্রতিক পদচারণার সময় একটি দুর্বল সিদ্ধান্তের কারণে অসংখ্য জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছি: এই ভাবনা আমাকে কুরে কুরে খায়। বাচ্চাদের খেলার মধ্যবর্তী সময়ে জরুরি ফোন কল নেবার করার কারণে এমনটি হয়েছিল বলে মনে হয়। হয় ফোনটি মুলতবি রাখা প্রয়োজন ছিল অথবা বাচ্চাদের খেলা বন্ধ রাখা প্রয়োজন ছিল।

যাই হোক, অফিসার এসে আমাকে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে বললেন। বাচ্চারও আমার সঙ্গে ছিল। আমি যখন রাস্তার ধারে বসেছিলাম, ওখানকার মধ্যবিত্ত আবাসিক পাড়ায়, পুলিশের গাড়ির বাতি, কিছুই আমার মনে প্রবেশ করছিল না। একরাশ অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরেছিলঃ অপরাধবোধ, অপমানবোধ, তবে শেষ পর্যন্ত, কৃতজ্ঞতা। আমাদের চারপাশে অনেকেই দৈনিন্দিন নানা ঘটনায় এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। যেখানে অপরাধবোধ আমাদের মনকে ছাপিয়ে যায়। কিন্তু সর্বশক্তিমানের কাছে কৃতজ্ঞতায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে হৃদয়। কথা বলতে চাইলেও মুখ দিয়ে বাক্য সরে না। শুধু দোয়া কবুলের জন্য দুই হাত তাঁর দিকে প্রশস্ত হয়।

সেই মুহুর্তে বৃষ্টি শুরু হল, এবং আমার বাচ্চারা আর আমি অপেক্ষা করছিলাম। পুলিশ অফিসার ফিরে এলেন। তিনি আমাকে আবার তিরস্কার করলেন এবং আমার উভয় বাচ্চাকেও তিরস্কার করলেন। এবং তারপরে তার চোখও পানিতে ভিজে গেল। তিনি বললেন, “আমিও একজন মা। আপনি কি বুঝতে পারছেন যে, যখন আমি দেখলাম যে আপনি নিজের বাচ্চাদের দিকে খেয়াল করছেন না তখন আমার হৃদয় কীভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল? আপনি জানেন, আমার মেয়ের বয়স ১৫ বছর।  তবুও সে আঘাত পাবে, এই ভয়ে আমি গাড়ি পার্কিং লটেও সর্বদা তার হাত ধরে রাখি?”

“আমি ভুল করেছি, আমাকে ক্ষমা করুন”। আমি অফিসারটির দিকে ইঙ্গিত করে বললাম এবং সরাসরি আমার বাচ্চাদেরকেও বললাম। “আমি এই এলাকাবাসীদের কাছেও ক্ষমা চাচ্ছি যাদেরকে আমি বিপদে ফেলেছি। আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি যে, এরকম আর হবে না।” এরসাথে নিঃশব্দে আমি ‘ইনশাআল্লাহ’ (আল্লাহ যদি চান) উচ্চারণ করলাম।

সর্বদা অন্তরে ঈমানের প্রেরণা কাজ করেঃ ঈমান দৃঢ় হয় যখন আমরা আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি এবং এটাও অন্তরে প্রোথ্রিত আছে যে, করুণাময় আল্লাহ আমাদের উপরে নজর রাখবেন এবং আমাদেরকে সকল প্রকার বিপদ থেকে রক্ষা করবেন। বাড়িতে পৌঁছে পরের দিন আমি আয়াতুল-কুরসী পাঠ করা শুরু করলাম (আল কুরআন-২:২৫৫)। এই দুর্ঘটনা আমাকে বাস্তবতাকে শিখিয়েছে। বাস্তবতার এই তাত্পর্য এবং তাত্ক্ষণিকতা যেন সর্বদা আমাদের সাথে থাকে এবং সর্বদা আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে। আমীন।

আয়াতুল কুরসীর অনুবাদ এখানে দেওয়া হল- “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছ এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে কিংবা পিছনে যা কিছু রয়েছে সে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারে না, কিন্তু যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন। তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]