শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

অপুষ্টি কী সেটা আগে জানুন ? প্যাকেটজাত খাবার কিন্তু শিশুর জন্য সুষম নয়

malnutrition in children
ID 63979141 © Samrat35 | Dreamstime.com

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি—
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এই প্রত্যয়ী মনোভাব কি আজকালকার বাবা মায়েরা তাদের শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে রাখতে পারবে? সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনিসেফের ‘স্টেট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড চিলড্রেন, ২০১৯’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব জুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যু-হারে এখনও উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটেনি। কয়েকটি তথ্য দিলে এর ভয়াবহতা আন্দাজ করা যাবে। ২০১৮ সালে সারা ভারতে পাঁচ বছরের নীচে মোট শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ছিল আট লক্ষ ৮২ হাজার। নাইজেরিয়ায় সংখ্যাটি ছিল আট লক্ষ ৬৬ হাজার এবং পাকিস্তানে চার লক্ষ ন’হাজার। বাংলাদেশে প্রতি ছয় জনের মধ্যে একজন অপুষ্টিতে ভুগছেন। জোগাড় করতে পারছেন না পর্যাপ্ত খাবার।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশে ২০০৪-২০০৬ সালে যেখানে অপুষ্টির শিকার মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৩৮ লাখ ছিল, ২০১৮ সালে এসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখে। তবে খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৪-২০১৬ সালে এ সংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ছিল। তবে ২০১৬-২০১৮ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬৮ লাখে। শিশুমৃত্যুর জন্য প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী অপুষ্টি। প্রতি দু’টি শিশুর এক জন কোনও না কোনও ভাবে অপুষ্টির শিকার। এর মধ্যে ‘স্টানটিং’ অর্থাৎ বয়সের তুলনায় কম উচ্চতাযুক্ত শিশু রয়েছে ৩৫ শতাংশ। ১৭ শতাংশ ‘ওয়েস্টিং’ বা উচ্চতার তুলনায় কম ওজনসম্পন্ন। আর ২ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ‘ওভারওয়েট’ অর্থাৎ ওজনজনিত অপুষ্টির শিকার।
পাঁচ বছরের নীচের শিশুদের মৃত্যু-হার কমানোর জন্য বিশ্বজুড়ে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, তা লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ‘স্টানটিং’ শিশুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও অন্য অপুষ্টির লক্ষণ যথেষ্টই রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অণুখাদ্যের অভাবজনিত কারণে অপুষ্টি। তাই প্রতি পাঁচ জনে এক জন ভিটামিন এ-র অভাবে, তিন জনের একজন ভিটামিন বি১২-এর অভাবে এবং চার জনের দু’জন রক্তাল্পতায় ভুগছে।
গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া এলাকা ও শহুরে বস্তিতেই অপুষ্টির ছবি দেখতে আমরা অভ্যস্ত। ভারতে অতিরিক্ত ওজনজনিত অপুষ্টি তেমন গুরুতর সমস্যা না হলেও সংখ্যাটা ক্রমবর্ধমান। ‘জাঙ্ক ফুড’ খাওয়ার প্রবণতা ও প্যাকেটজাত খাবার বা অন্য ফাস্টফুডের বাজার এখন শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গিয়েছে। আদিবাসী যে কোনও গ্রামেও দেখা যাবে, যাঁদের মোটামুটি ক্রয়ক্ষমতা রয়েছে, তাঁরা সাধ্যের বাইরে খরচ করেও বাচ্চাদের চিপ‌্স জাতীয় প্যাকেটের খাবার, কেক-পেস্ট্রি বা ঠান্ডা পানীয় কিনে খাওয়াচ্ছেন। এ ছাড়া, কয়েকটি নামীদামি ব্র্যান্ডের শিশুখাদ্য ও স্বাস্থ্য-পানীয় দারুণ ভাবে জায়গা করে নিয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে এমনকি দরিদ্র পরিবারেও।
গত এক দশকে বাংলাদেশে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ লাখ। তবে গুরুতর খাদ্য ঝুঁকি কমাতে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে বাংলাদেশে গুরুতর খাদ্য ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৮ লাখ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে সে সংখ্যা কমে ১ কোটি ৬৮ লাখে নেমে আসে। এমনকি কমেছে গুরুতর বা মধ্যম খাদ্য ঝুঁকিতে থাকা মানুষের হারও। গত কয়েক বছরে পুষ্টির ক্ষেত্রে ধীর গতিতে উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। তবে বেশ কিছু জেলা এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
কারণ পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সঠিক ধারণা নেই। অনেক সময় সমর্থ্যবানরাও কেবল অজ্ঞতার কারণে অপুষ্টিকর খাবার প্রদান করেন শিশুদের। মাছ-মাংসসহ তথাকথিত ভালো ভালো খাবারই যে পুষ্টিসমৃদ্ধ হবে এমন কিন্তু নয়। ডাল, শিম কিংবা সাধারণ মৌসুমি শাকসবজিতেও পুষ্টিমান আশানুরূপ মাত্রায় থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় পুষ্টিসম্পন্ন খাবারে এনার্জি, প্রোটিন ও ফ্যাট ছাড়াও সকল ধরনের পুষ্টি উপাদান, বিশেষত নয় ধরনের ভিটামিন ও চার ধরনের মিনারেলের উপস্থিতি আবশ্যক। কিন্তু স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসের কারণে দেশে ভাত ও অপর্যাপ্ত পুষ্টি উপাদানসংবলিত খাদ্যের ওপর অতিনির্ভরশীলতা লক্ষ্য করা যায়।
এখনো দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৭৫ শতাংশের বেশি ক্যালরি আসে ভাত থেকে। একই সঙ্গে ৫৭ শতাংশ প্রোটিন, ৬২ শতাংশ জিংক ও ৪৫ শতাংশ আয়রনের জোগানদাতা ভাত। ভাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে জনগণের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার বাড়ছে , যার ফলে বিভিন্ন রোগের উপসর্গ দিন দিন বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুর জীবনের প্রথম হাজার দিন (অর্থাৎ গর্ভাবস্থার ২৭০ দিন ও জন্মের পরে দু’বছর) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিবহুল। এই সময়ে যেমন তার মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে, তেমনই তাকে কিছু সন্ধিক্ষণের মধ্যে দিয়েও যেতে হয়। প্রথম ছ’মাস বুকের দুধ খাওয়ার পরে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি আর তা থেকে সম্পূর্ণ হয় না। দরকার পড়ে পরিপূরক খাবারের। কিন্তু বুকের দুধ থেকে একেবারে শক্ত আহারে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই শুরুতে নরম পাতলা খাবার দিয়ে শিশুকে আস্তে আস্তে অভ্যস্ত করে তোলা দরকার। তার পরে আস্তে আস্তে পৌঁছতে হয় আধা শক্ত খাবারে। ৬-৯ মাসের মধ্যে এই ধাপগুলি সম্পূর্ণ যায়। এক বছর বয়সে বাচ্চাটি নরম খাবার চিবিয়ে খেতে পারে।
দুধ বা দুধ জাতীয় সামগ্রী, প্রাণীজ খাদ্য, চিনি, গুড়, তেল, ঘি, মাখন ইত্যাদি অবশ্যই শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে। বাড়িতে বানানো স্বাস্থ্যকর টাটকা খাবার, যাতে চাল ও ডালের অনুপাত ২:১ শিশুকে দিতে হবে। চাল-ডাল, শাকসবজি-সহ হালকা তেল বা ঘি দিয়ে বানানো খিচুড়ি পরিপূরক আহার হিসাবে খুবই কার্যকরী।

কৌটোর শিশুখাদ্যের উপরে বেশিদিন ভরসা করা ঠিক নয়। শিশু চিকিৎসকরা বলেন,যত দ্রুত সম্ভব শিশুকে ঘরের খাবারে অভ্যস্ত করায় বাঞ্ছনীয়। প্যাকেটজাত খাবারের কুফল থেকে অপুষ্টি তৈরি হয়। অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়তে হলে সমাজের সর্বস্তরে ঠিক বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরি করতে হবে। অন্যথায় আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অপুষ্টিতে ভুগতেই থাকবে।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন