অপ্রয়োজনীয় আসক্তি থেকে দূরে থাকাই জান্নাতের উপায়

পরিবার Contributor
ফিচার
অপ্রয়োজনীয় আসক্তি

চাকরির সুবাদে সম্প্রতি আমাকে নতুন দেশে আসতে হয়েছে। খুব সহজ ছিল না এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া, বিশেষ করে আমার মতো পরিবারমুখী মানুষের পক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন ঠিক করলাম চাকরির অফারটা নিয়ে নেব তখন অন্য একটা প্রশ্ন আমার চিন্তা ভাবনার পরিসরে এসে পড়েছে। আমার দেশ বদলের (হ্যাঁ, দেশ বদল, বাসা বদল নয়) খবর পেয়ে তখন বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন সকলেই একটা প্রশ্ন করেছেন, ‘জীবনের অনেকটা পালটে যাবে বেশ, তাই না?’

আম্মি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘নতুন দেশে গিয়ে মানিয়ে নিবি কীভাবে?”

সত্যি কথা বলতে কি, এই প্রশ্নগুলো আমার মধ্যে একদম নতুন একটা ভাবনার সূচনা করছিল একটু একটু করে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়া মানে যেমন একদিকে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন অ্যাডভেঞ্চার, নতুন করে কিছু শিখা। আরেকদিকে, মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। এমনও হতে পারে নতুন জায়গায় আমি একেবারেই কম্ফোর্ট পাব না, কিন্তু সেটা মানিয়ে নেওয়াও জীবনের পথে এক বড় অভিজ্ঞতা। পুরনো মানুষের সংস্পর্শ কাটিয়ে নতুন মানুষকে চেনা, আল্লাহ তালার দুনিয়ায় বহু অভিজ্ঞতার জন্ম এভাবেই হয়।

অপ্রয়োজনীয় আসক্তি কীভাবে আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই অনুরক্তি ও স্থাবর সম্পদের প্রতি অপ্রয়োজনীয় আসক্তি-র আসল অর্থ বুঝতে পারলাম আমি।

এই বোধোদয় হল কিন্তু প্যাকিং করতে গিয়ে। বেশিরভাগ মালপত্র প্যাকারস ও মুভারসদের দিয়ে পাঠিয়ে দিলেও, নিজের ছোট্ট লাগেজটি নিজেই নিয়ে যাব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শুরুর এক সপ্তাহ এই লাগেজের জিনিস পত্র দিয়েই চালাতে হবে। কিন্তু সেই লাগেজটি প্যাক করতে গিয়ে দেখলাম, আমার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের যেন কোনও শেষ নেই। বার চারেক রিপ্যাক করার পর শেষ পর্যন্ত বুঝলাম কোন কোন জিনিস আমার আদতে প্রয়োজন, আর কোন কোন জিনিসকে আমি ভেবে রেখেছিলাম আমার প্রয়োজন হিসাবে। এইখান থেকে আমি দুটি বিষয় জানলাম-

১। প্রয়োজনের থেকে কত বেশি দ্রব্যের প্রতি আমার অনুরক্তি ও আসক্তি রয়েছে।

২। আমার জীবনে কোন জিনিসের গুরুত্ব কতখানি, আর কোন জিনিস আদতে আমার জীবনে স্থায়ী, সেই বিষয়ে আমার কোনও সম্যক ধারণা নেই। আমি যা পাই, তাই আঁকড়ে ধরি।

এই দুই অনুভূতি আমার অন্তরাত্মাকে নড়িয়ে দিয়েছিল যেন। বিশেষ করে, নতুন দেশে যাওয়ার পর আমি দেখলাম যে আমার অন্যান্য সামগ্রী পৌঁছতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু আমার সঙ্গে নেওয়া লাগেজ আর ক্যাশেই আমার জীবন যাপন চলে যাচ্ছে মোলায়েম ভাবে। তাহলে কেন আমরা ত্যাগে ভয় পাই? কেন মনে করি আনন্দের বরাত সবসময় বাইরের দ্রব্যের উপর নির্ভরশীল? কী হবে যদি আমি আমার ফিল্টার কফি মেশিন নিয়ে যেতে না পারি, আমি সেই কদিন ক্যাফে থেকে কফি কিনে খাব। কিংবা ইনস্ট্যান্ট কফি বানিয়ে খাব।

ইসলামে রয়েছে আসক্তি ত্যাগের নির্দেশ

ইসলামের ইতিহাসে ফিরে তাকালে কিন্তু দেখা যাবে মহান আল্লাহ সবসময় আত্মত্যাগের পবিত্র নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন আমাদের। আমাদের পবিত্র ধর্মে রয়েছে এরকম অজস্র উদাহরণ,

প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ)-র পৌত্র ইমাম হুসেন (রাঃ ) ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের মহরমের সময় মদিনা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছিলেন তিনি। তাঁর অনুগামীদের মধ্যে একাংশ মদিনার মায়া ত্যাগ করতে পারেনি, কারণ তাদের কাছে আল্লাহর নির্দেশের থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদের আকর্ষণ বেশি ছিল। কিন্তু বাকিরা নির্দ্বিধায় তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন। বাকিদের কিন্তু কোণও সম্পদের প্রতি আসক্তি ছিল না। পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছু ছিল না। একমুঠো খেজুর আর পরনের কাপড় নিয়ে তাঁরা হুসেনের অনুগমন করেছিলেন। হ্যাঁ, তাঁদের হৃদয় পরিপূর্ণ ছিল আল্লাহ ও হুসেনের প্রতি ভালবাসায় ও সম্মানে। তাই, ইসলামের ইতিহাসে তাঁরা উজ্জ্বল হয়ে আছেন।

আত্মত্যাগের মধ্যে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি রয়েছে। দুনিয়াতে স্বার্থপর ভাবে না বাঁচা—এটা মানুষের মনে একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্ম দেয়। নিজের প্রতি শ্রদ্ধা। যে যত বেশি আত্মত্যাগ করে তার মনে হয় আরও অনেক কিছু করা বাকি। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর জন্য নিজেকে সঁপে দেওয়াই আত্মত্যাগ। আর আত্মত্যাগের প্রাথমিক ধাপ আসে নিজের দ্রব্য ও সম্পদের প্রতি আসক্তি কমিয়ে ফেলার মধ্যে দিয়ে।

এ জীবন আসলে এক লম্বা যাত্রা, সেই যাত্রায় আমরা যত হালকা ভাবে চলতে পারব, তত তাড়াতাড়ি বেহেস্তের দ্বার আমাদের জন্য খুলে যাবে। এমনকি যখন এই জীবন থেকে পরের জীবনের দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হবে, তখনও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন স্থূল ও দ্রব্যবাচক ভার আমরা ঝেড়ে ফেলতে পারি। অযাচিত ও অপ্রয়োজনীয় আসক্তি ত্যাগ করে যেন পবিত্র ইসলামের আশ্রয়ে হয়ে উঠতে পারি ঈমানদার মুসলমান।