অবহেলার শিকার নয়, আশাবাদী থাকুন অবসর জীবনে

elderly couple, retirement
ID 172758969 © Paulus Rusyanto | Dreamstime.com

অবসর সময় একটা মানুষের জন্য আশীর্বাদ। ব্রিটিশ বিখ্যাত দার্শনিক বার্টান্ড রাসেল তাঁর নব্বুইতম জন্মদিনে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। ওই প্রবন্ধে তিনি বার্ধক্য সম্পর্কে লিখেছেন: বার্ধক্যের সৌন্দর্য যেমন রয়েছে তেমনি ত্রুটিও রয়েছে। ত্রুটিটা স্বাভাবিক ব্যাপার এবং এই স্বাভাবিকতা আকর্ষণীয় নয়। তবে তাঁর সৌন্দর্য অনেক। কেন না তার জীবনের অভিজ্ঞতা ব্যাপক। আমি এমন মানুষের জীবনও দেখেছি যে যৌবনে বা তরুণ অবস্থায় ছিল বেশ কর্মক্ষম কিন্তু তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাকে দিয়ে হয়নি। বুড়ো বয়সে অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পেরেছে যে তার কী করা উচিত।

মানুষ মাত্রই চায়, ইস! যদি আরেকটু বেশী পেতাম। তাহলে কী করতাম? এখানেই নিহিত অবসর সময় সম্পর্কিত একটি বিশ্বজনীন সত্য। অবসর সময় দুইভাবে ব্যয় হতে পারে। এই সময় হয় কোনো কল্যাণকর কাজে ব্যয় হয়, নয়তো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাপ কর্মের মধ্য দিয়ে এই সময়ের অপচয় করা হয়। নিশ্চিতভাবেই আমাদের সবাই স্বীকার করব যে, অবসর সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার হবে যদি সেই সময়কে কিছু ইবাদত কর্মের মধ্য দিয়ে কাটানো যায়। তবে অধিকাংশ সময় আমাদের মনেই থাকে না যে, আমাদের পার্থিব জীবনের লক্ষ্যই হলো আল্লাহ্‌র ইবাদত করা।

বার্ধক্য বা অবসরকালীন জীবনের গুরুত্ব কিন্তু অন্যান্য জীবন পর্বের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে বহু মানুষ তাদের জীবনের বৃহৎ সাফল্যগুলো অর্জন করেছে বৃদ্ধ বয়সে। গুণীদের অনেকেই এই বার্ধক্যে এসেই নিজেদের জ্ঞান ও উদ্ভাবনীর স্বীকৃতি পেয়ে ধন্য হয়েছেন। অষ্টাদশ শতকের জগদ্বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘দর্শন সংস্কৃতি’ লিখেছেন সত্তর বছর বয়সে। মার্কিন বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন, বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক হিসেবে সবাই একনামে চেনেন তাঁকে। তিনিও তাঁর মহান আবিষ্কারটি করেছিলেন সত্তর বছর বয়সে।

পেশা আমাদের জীবনের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে। সারা জীবন ধরে আমরা কাজের মধ্যে থাকি। চাকরি করি, ব্যবসা করি বা কোনো না কোনোভাবে আয়-রোজগার করি। সময় কেটে যায়। বয়স বাড়ে। শক্তি কমে আসে। সময় আসে অবসর গ্রহণের। সব কিছু কেমন বদলে যায়!
বয়সকালের জটিল রোগ যেমন, ডায়াবেটিস, আরথ্রাইটিস, হাড়ের ক্ষয় রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, ডিমেনসিয়া ইত্যাদির সঙ্গে হতাশা ও উৎকণ্ঠা জড়িত থাকে।ফলে শারীরিক রোগের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। জীবনযাত্রার গুণগত মান অনেক কমে যায়। অনেক সময় তারা অবহেলার শিকার হন।
অবসরগ্রহণকে সুন্দর সময়ে পরিণত করা যায়। এর জন্য অবসরপ্রাপ্তদের যেমন দায়িত্ব আছে,তেমনি সমাজের সবারই দায়িত্ব আছে। অবসর গ্রহণের পর মানসিক সমস্যা কমাতে যা ভাববেন বা যে কাজগুলো করতে পারেন :

১. অবসরজীবনকে পূর্ণতার সময় হিসেবে দেখুন। সারা জীবন আপনি যথেষ্ট করেছেন। এখন বিশ্রাম নেওয়া ও আনন্দে থাকা আপনার অধিকার।

২. নেতিবাচক চিন্তাকে প্রশ্রয় দেবেন না। এগুলো মুখ দিয়ে উচ্চারণও করবেন না। আশাবাদী হন। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। হতাশা প্রশ্রয় দেবেন না।

৩. সমালোচনা এড়িয়ে চলুন। দুনিয়ার সবাইকে ঠিকপথে চালিত করার দায়িত্ব নেওয়ার দরকার নেই। উচিত, অনুচিত, সৌজন্য শিক্ষা দেওয়াও একটা মাত্রার মধ্যে রাখা ভালো। আপনার সন্তান, পুত্রবধূ, কাউকেই নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মাত্রাতিরিক্ত কঠোর হবেন না। ভালো ব্যবহার করুন, ক্ষমা করুন, সৌজন্য করুন, ছাড় দিন।

৪. অবসর গ্রহণের জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করুন। যাতে অর্থকষ্ট পড়তে না হয়, সে জন্য সঞ্চয় করুন। অবসরের সময় কীভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন তার একটি বাস্তব পরিকল্পনা করুন।

৫. নিজেকে বুড়ো ভাববেন না। বুড়ো ভাবলেই বুড়ো। না ভাবলে আপনার মন সতেজ থাকবে। শরীরও থাকবে ভালো।

৬. নিজের সামাজিক সম্পর্কগুলো ঝালাই করে নিন। আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে অবসরের অনেকটা আগেই নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। সন্তানের সঙ্গে, স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে নিন। কোনো সমস্যা থাকলে অবসরের বেশ আগেই মিটিয়ে ফেলুন। অবসরে এই নতুন মাত্রার সম্পর্কটি আপনার কাজে আসবে।

৭. নিজের শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলুন। আপনার অজপাড়াগায়ের মানুষ, আপনার চিরচেনা আত্মীয়রা, ছোট্ট বেলার বন্ধুরা বার্ধক্যে আপনার বড় ধরনের বন্ধন হয়ে উঠতে পারে। তাদের কাছে যান। যাতে আপনার প্রয়োজনে তারাও আপনার সঙ্গে থাকে।

৮. জীবনের নতুন অর্থ দাঁড় করান।

৯. অবসরের সময়ে এমন কিছু করুন যে কাজ করে আপনি সত্যিই আনন্দ পান।

১০. জীবনের সুস্থ রুটিন বজায় রাখুন। নিয়মিত সকালে ঘুম থেকে উঠুন ও সময়মতো ঘুমাতে যান। নিয়মিত গোসল করুন, দাঁত মাজুন ও নখ কাটুন

১১. স্বাস্থ্যবিধি মানুন। নিয়মিত হাঁটুন। দৈনিক আধা ঘণ্টা হাঁটলে সেটাও খারাপ নয়। হাঁটার জন্য একজন সঙ্গী-সঙ্গিনী জোগাড় করুন। হাঁটা সহজ হবে।

১২. শখের কাজ করুন। যেমন : বাগান করুন, গাছ লাগান, বেড়ান ইত্যাদি।

১৩. রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

১৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

১৫. প্রয়োজনমতো চিকিৎসা নিন। নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করান। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করুন। ব্যথা-বেদনার জন্য প্রয়োজনে ফিজিওথেরাপি নিতে পারেন।

১৬. ডাক্তারের পরামর্শমতো ক্ষতিকর খাবার এড়িয়ে যান। যেমন, যদি গ্যাস্ট্রিক থাকে তবে গ্যাস্ট্রিক বাড়ে এমন খাবার খাবেন না ।

১৭. সংসারের টুকিটাকি কাজে লাগুন। রান্নাবান্না করা, বাজার করা, বিল দেওয়া ইত্যাদি করুন।