অভূতপূর্ব শান্তির দূত নোবেল জয়ী আবী আহমেদ আলী

abiy ahmed ali
ID 161399602 © Olha Kostenko | Dreamstime.com

ওরে হাল্লা রাজার সেনা, তোরা যুদ্ধ করে করবি কী তা বল

সীমান্তে দু’দশকের গোলাগুলি, যুদ্ধ কবলিত দুই দেশ, নিহত ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। দাঁড়িপাল্লায় ওজন বেশি অস্ত্রের। অবহেলায় পড়ে থাকে দারিদ্র্য-অনাহার সমস্যা। রাজনীতির বাহুবলীদের কাছে জমির দাম যে জীবনের দামের চেয়ে অনেক বেশি।
তবে আচমকাই যদি সেই হানাহানি বন্ধ হয়ে যায়। রূপকথার ‘শুনডি’ আর ‘হাল্লা’ যদি ভাই-ভাই হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। অনর্থক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অভুক্ত সেনাদের সামনে যদি আসে হাঁড়ি হাঁড়ি মণ্ডা-মিঠাই। কাল্পনিক চরিত্র গুপী-বাঘাকে দরকার নেই, আফ্রিকা মহাদেশে এই গল্প সত্যি করেছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবী আহমেদ আলী। শান্তিরদূত হয়ে এসে দু’প্রজন্ম ধরে চলা ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার সীমান্ত-সমস্যা ঘুচিয়ে দিয়েছেন। ২১ শতকের বিশ্বে, দেশে-দেশে হানাহানি যখন রোজনামচা, তখন সীমান্ত মুছে ‘ভালোবাসার সেতু’ গড়ার কাজ করেছেন ২০১৯ সালের শান্তির জন্য নোবেল প্রাপক আবী আহমেদ। আর সেটা করেছেন মাত্র এক বছরে।

লোহিত সাগরের বুকে ছোট্ট দেশ ইরিত্রিয়া। আসলে এথিওপিয়া থেকেই জন্ম তার। পূর্ব-আফ্রিকার শিংয়ের মতো বেরিয়ে থাকা আফ্রিকান হর্ন অঞ্চলে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার দ্বন্দ্ব প্রায় ৭০ বছর পুরানো। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ইরিত্রিয়া হয় ইথিওপিয়া ফেডারেশন রাষ্ট্রের অধীনে একটি বিশেষ অঙ্গরাজ্য। কিন্তু তখন থেকেই ইথিওপিয়ার রাজার দুর্নীতি এবং কঠোর শাসনব্যবস্থা অতিষ্ট করে তুলে দেশের জনগণকে। প্রায় ৩০ বছর ধরে দু’দেশের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ হয়। এরপর ১৯৯৩ সালের গণভোটের মাধ্যমে ইরিত্রিয়া আলাদা হয়ে যায় ইথিওপিয়া থেকে। যদিও বন্ধুত্বপূর্ণভাবে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল, কিন্তু সবকিছুর মোড় যেন পাল্টে যায় ঠিক এর পর থেকেই। ১৯৯৮ সালে দুই দেশই দাবি করে বসে দুই দেশের সীমান্তে থাকা শহর বাদমের মালিকানা। অর্থনৈতিকভাবে যদিও এই শহরের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই, তবুও এই শহরকে নিয়েই শুরু হয় টান টান উত্তেজনা। এই শহরের মালিকানা পেতে দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় যুদ্ধ। সংঘর্ষে প্রায় এক লক্ষের মতো মানুষের নিহত হয় এবং অনেক বেসামরিক নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়। শরণার্থী সমস্যা বিকট আকারে ধরা দেয় দুই দেশেই।

পরে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়ালে একটি কমিশন গঠিত হয়। ২০০২ সালে সেই কমিশন রায় দেয় যে, বাদমে শহরটি ইরিত্রিয়াকেই হস্তান্তর করা উচিত। কিন্তু ইথিওপিয়া সেই দাবী মেনে নেয়নি। সে দেশের সরকার পুনরায় বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য আদালতে আবার আবেদন করতে থাকে। কিন্তু ইরিত্রিয়া সে দাবি আবার নাকচ করে দেয়। আর সেই কারণেই সীমান্তের এই সমস্যার আর কোনো সুরাহা হয়নি। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সেই বিবাদপূর্ণ অবস্থার কোনো সন্তোষজনক সমাধান দেখেনি বিশ্ব মোড়লবৃন্দ।

এদিকে ইথিওপিয়াতেও চলছিল রাজনৈতিক সংকট। সংবাদপত্রগুলো হারিয়েছিল তাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের অতিমাত্রায় দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব এবং বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার তারতম্য যেন ডেকে আনতে চাইছিল সরকারের পতন। ঠিক সেটিই হলো। টানা তিন বছরের আন্দোলন এবং বিক্ষোভের মুখে ২০১৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ইথিওপিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিলেমারিয়াম দেসালেং পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপরেই এপ্রিল মাসে ক্ষমতায় আসেন ৪১ বছর বয়সী আবী আহমেদ আলি। এই প্রথম দেশটির সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নৃ-গোষ্ঠী ওরোমো থেকে একজন প্রতিনিধি দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন।

২০১০ সালে ওরোমো ডেমক্রেটিক পার্টি (ওডিপি) থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন আবী। ২০১৮ সালে ওডিপি পার্টির প্রধান নির্বাচিত হন। ইথিওপিয়ার বেসাসা শহরে ১৯৭৬ সালের ১৫ই আগস্ট জন্ম নেন তিনি। দরিদ্র কৃষক মুসলিম পিতা এবং খ্রিস্টান মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়া আলী ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যকে দেখে আসছেন খুব কাছ থেকে। কৈশোর থেকে তিনি বুঝতে শিখেছেন যে, যুদ্ধ শুধু ধ্বংসাত্মক এক লীলাখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। শান্তি আর সৃষ্টির উল্লাসে যে কী অপরিসীম আনন্দ তা হয়তো তিনি বাল্যকাল থেকেই খুঁজে চলেছিলেন। আর তাই তো ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডাতে যান। পড়ালেখায় ভালই ছিলেন আবী। একইসাথে দক্ষ ছিলেন ওরোমো, আমরাহা, টাইগারি এবং ইংরেজি ভাষায়। এসব ভাষা ইথিওপিয়ার নৃ-গোষ্ঠীদের। তিনি নিজেও ওরোমো গোত্রের ছিলেন। তাই রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিলেন ওডিপি পার্টির থেকে।

কিশোর বয়েসে আবী]সামরিক বাহিনীতে একজন রেডিও অপারেটর হিসেবে যোগ দেন। সরকারে ঢোকার আগে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবি পেয়েছিলেন। ইথিওপিয়ার সাইবার গোয়েন্দা সংস্থা ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক সিকিউরিটি এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ছিলেন তিনি। ২০১০ সালে তাঁর জন্মস্থান ‘জিম্মা জোনে’ মুসলমান ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গায় ‍বহু মানুষ নিহত হয়। সে সময় পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে দাঙ্গা ঠেকাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এজন্য তিনি ‘রিলিজিয়াস ফোরাম ফর পিস’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ওরোমি অঞ্চল, বিশেষ করে আদ্দিস আবাবার চারপাশে অবৈধভাবে জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকায় চলে আসেন আবী। আন্দোলনের মুখে জমি অধিগ্রহণের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

এসব কারণের ইথিওপিয়ার মানুষ যেন আলাদাভাবে এক নতুন রাষ্ট্রনায়ককে দেখতে পেল। আফ্রিকার দরিদ্র যে রাষ্ট্রে এতদিন ধরে সংঘর্ষ লেগেই থাকতো, যে রাষ্ট্রে দুর্নীতির কারণে দিনকে দিন অর্থনৈতিক বৈষম্য তুমুল আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো, সেই রাষ্ট্রে এমন এক মহানায়কের আগমন যেন অনেকটা স্বর্গীয় বার্তাই নিয়ে এলো। মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার হতে লাগলো। সবাই বুঝতে লাগলো, আফ্রিকার এই দেশে হয়তো এই মহানায়কের হাত ধরেই আগমন ঘটবে গণতন্ত্রের। যে গণতন্ত্রের জন্য তারা এতদিন আকাতরে প্রাণ বিলিয়ে আসছিলেন। আগের রাজনৈতিক শাসনকালে যারা বিক্ষোভ কিংবা ভিন্নমত প্রকাশ করার জন্য কারাবন্দী হয়েছিলেন, ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসেই তাদের কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে দেন তিনি। যেসব ওয়েবসাইট আগে সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ ছিল শুধু সরকারের সমালোচনার জন্য, তিনি সেগুলো আবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। শুধু তা-ই নয়, সেদেশে সে যে আগে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর উপর অমানুষিক অত্যাচার হয়েছিল, তিনি সেটা সাবলীলভাবে মেনে নিয়ে জাতির কাছে ক্ষমাও চান।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ২০০২ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের কমিশন নির্দেশিত বাদমে শহর ইরিত্রিয়াকে ফিরিয়ে দেওয়ার রায় মাথা পেতে নেন আবী। ইথিওপিয়ার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেন বাদমে শহর থেকে। এতদিন যে শহরের জন্য ইরিত্রিয়ার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল ইথিওপিয়া, সেই সংঘর্ষের সমাধান হয়ে গেল তিনি ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই। মাত্র এক বছরে তিনিই পেরেছেন দুই দেশের মধ্যে বিবাদমান প্রায় ২০ বছরের সংঘাতের সমাপ্তি টানতে, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।
ইথিওপিয়া যখন ঘোষণা দিল যে তারা তাদের সৈন্য সীমান্তের সেই শহর থেকে প্রত্যাহার করে নেবে, এরপরে ইরিত্রিয়া থেকেও ঘোষণা আসে যে তারা তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে। এভাবেই দুই যুগের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয় ভালবাসার মাধ্যমে। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় গিয়ে প্রেসিডেন্ট আফওয়ের্কির সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন আগে আবী আহমেদ আলী ঘোষণা করেন, “এখন থেকে আর ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার মাঝে কোনো কাঁটাতার থাকবে না, ভালবাসার সেতু সেই প্রাচীরকে ভেঙে দিয়েছে।”