অর্থের অভাব যেন শিক্ষার অভাবের কারণ হতে না পারে, ইসলামের এই শিক্ষা আজও মেনে চলে প্রায় প্রতিটি দেশ

dreamstime_s_15409447

সমগ্র কুরআন জুড়ে, আল্লাহ বারবার শিক্ষার গুরুত্বের উপরে যে জোর দিয়েছিলেন, তা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। মহানবী হযরত মুহাম্মদও আল্লাহের সেই ইচ্ছা তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন শিক্ষার প্রসার রুদ্ধ, বহু জাতি ও ধর্মাবলম্বীরা যখন অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত, মুসলিমরা সেই সময় থেকেই শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। ইসলাম প্রথম দিন থেকেই শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ প্রদান করেছে, মুসলমানদের শিক্ষিত হওয়ার গুরুত্ব বুঝিয়েছে।

তবে শিক্ষা বলতে শুধুই কুরআন পড়ার মধ্যে মুসলমানদের আবদ্ধ থাকতে বলা হয়নি, বরং পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, জ্ঞানের খোঁজ করতে। বলা হয়েছে, এই দুনিয়ার প্রতিটি বিস্ময়কর জিনিস মন দিয়ে দেখতে এবং তা সৃষ্টি করার জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাতে। ইসলাম বৈজ্ঞানিক খোঁজেও উৎসাহ দেয়; জনগোষ্ঠীর সংস্থান ব্যবহার; সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি; গল্প বলার মাধ্যমে এবং বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদানের কথা বলে। শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য হয়েছে যে নবী মুহাম্মদ শিক্ষাকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

প্রথম জ্ঞান অধিবেশন

হযরত মুহাম্মদ কাবার অদূরেই দারুল আরকামের বাড়িতে প্রথম জ্ঞান অধিবেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি নামাজের পরে মসজিদে বসে থাকতেন, তখন সাহাবীরা তাঁর চারপাশে ঘিরে বসতেন। তখন মহানবী তাঁদের ইসলামের ভিত্তি, নৈতিকতার গুরুত্ব এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আল্লাহের এক ও অদ্বিতীয় অস্তিত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। হযরত মুহাম্মদ কুরআনের আয়াতসমূহের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেন এবং তিনি মক্কা ও মদিনার বাইরের সম্প্রদায়গুলির কাছে কুরআনের শিক্ষকদের পাঠাতেন।

কুরআন মুখস্থ করা এবং তার মানে বোঝাই হল ইসলামী শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার ঠিক পরেই গুরুত্ব আরোপ করা হয়, নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শিক্ষা ও ঐতিহ্য আত্মস্থ করার উপরে। এই ঐতিহ্যগুলি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শেখানো হয় এবং তার সাথে থাকে ব্যাখ্যার শৃঙ্খল, যা তাদের সত্যতা নিশ্চিত করে- ঠিক যে ভাবে, কোনও স্কলারশিপের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য আজও বিবলিওগ্রাফি বা সহায়ক গ্রন্থতালিকা প্রকাশ করা হয়।

শিক্ষকরা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) – এর সমস্ত ঐতিহ্য মেনে চলতেন। তাঁরা মাটিতে বসতেন এবং তাঁদের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে বসে থাকতেন ছাত্ররা। শিক্ষকের পাশে থাকতেন তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং জ্ঞানী শিক্ষার্থী। শিক্ষক যা যা বলতেন, ওই শিক্ষার্থী সেগুলি ব্যাখ্যা করতেন। মসজিদের সাথে লাগোয়া মাদ্রাসার মাধ্যমে ছোট ছোট গোষ্ঠীকে বিনামূল্যে শিক্ষাপ্রদানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইসলামে শিক্ষার হার দ্রুত বাড়তে থাকে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমগ্র ইসলামী খিলাফত জুড়ে বড় স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। 

খিলাফত প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কুরআন ও ইসলামী জ্ঞান আরোহণ প্রশংসনীয় পেশা হিসাবে বিবেচিত হত। প্রতিটি ইসলামিক শহর ও গ্রামে কুত্তবস (শিক্ষিত পুরুষ) এবং মু’আল্লাম (শিক্ষক) থাকতেন। ইবনে হক্কল দাবি করেন, তাঁর সিসিলি সফরের সময় সেখানে অন্তত ৩০০ জন প্রাথমিক শিক্ষক ছিলেন। 

সেই সময় সর্বাধিক খ্যাতিমান এবং সম্মানিত বিদ্বানরা মনে করতেন, শিক্ষাদান একটি সম্মানের কাজ। কথিত আছে যে, ইবনে মুজাহিম (মৃত্যু ৭২৩ খ্রিঃ), এক জন প্রখ্যাত ঐতিহ্যবাদী ও ব্যাকরণবিদ, কুফায় তাঁর একটি স্কুল ছিল যেখানে প্রায় ৩০০০-এরও বেশি শিশু পড়তে আসত। 

ইসলামী শিক্ষার সম্প্রসারণ

মুসলিমদের জ্ঞানের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে দ্রুত অন্যান্য বিষয়গুলিও ইসলামী শিক্ষায় যুক্ত হতে থাকে। সেই সময় ইসলামী রীতি, ইসলামী আইন ও আইনশাসন, গণিত, ব্যাকরণ এবং চিকিৎসা, কৃষি, নীতিশাস্ত্র, পৌরবিদ্যা, অর্থনীতি এবং ইতিহাসের পড়ানো হত। শিক্ষক, তাদের সহায়ক এবং তাদের শিক্ষার্থীরা সকলেই শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতেন। এক শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতির নিম্নলিখিত বর্ণনা পাওয়া গিয়েছে :

“তিনি আইনের বইটির সেই অনুচ্ছেদটি বারবার পড়লেন, ছাত্ররা নিজেদের স্মৃতিতে সেটি যুক্ত করার পরে, সেটি আরও কয়েক বার আওড়ানো হয়,  বিশেষ করে ইমাম মালিক ও আবু হানিফার ভিন্ন শাসন বিধি সম্পর্কে এবং কখনও অন্যের এবং আবার কখনও পাঠ্যবস্তু সংরক্ষণের দিকে মনোনিবেশ করার আহ্বান জানালেন। তারপরে তিনি প্রমাণ পাঠ্যগুলির উদ্ধৃতি দিলেন, তারপরে তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বিভিন্ন উপমা পেশ করতে থাকেন, এবং ততক্ষণ সেগুলির পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন, যত ক্ষণ না সেগুলি শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে যায়। ”

মসজিদ এবং স্কুলগুলি মূলত দাতব্য শিক্ষাদানে বিশ্বাসী ছিল। সাক্ষরতা এবং শিক্ষাকে এত জোরালোভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল যাতে কোনও ছাত্রকে অভাবের জন্য ফিরে যেতে না হয়। অর্থের অভাব যেন শিক্ষার অভাবের কারণ হয়ে উঠতে না পারে, সেদিকে সর্বদা লক্ষ্য রাখা হত। প্রারম্ভিক ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা পদ্ধতি এবং শিক্ষার সুবিধাসমূহের সাথে বর্তমান যুগের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। সেই সময়েও দক্ষতা, কবিতা এবং বক্তৃতা প্রতিযোগিতার জন্য পুরষ্কার প্রদান করা হয়, পরীক্ষা নেওয়া হত, এবং ডিগ্রি প্রদান করা হত।

প্রাজ্ঞ বিদ্বান পণ্ডিতদের উপস্থিতি

একজন বিখ্যাত শিক্ষক ইবনে সিনা (পশ্চিমে অ্যাভিসেনা নামে পরিচিত) তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, ডাক্তার এবং শিক্ষক। খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে তিনি একটি মেডিকাল পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন যাকে ৮০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক চিকিৎসার রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা হত।

তিনি শিশুদের কুরআন, কবিতা, ধর্মপ্রাণতা এবং নৈতিকতা শেখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। তবে তিনি শিশুদের জীবনে খেলাধুলা, চলাচল এবং মন ভালোনারো প্রয়োজনীয়তাও উপেক্ষা করেন নি। তিনি ভেবেছিলেন যে শিক্ষার সামগ্রিক লক্ষ্য হ’ল প্রতিটি ব্যক্তির দৈহিক, ধর্মমনস্কতা এবং নৈতিকতার বৃদ্ধি। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা হল সমাজে দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখার জন্য শিশুদের প্রস্তুত করার উপায়। 

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে নিরক্ষর হলেও আল্লাহের করুণা ও অনুগ্রহে সাক্ষরতা এবং শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের জ্ঞান সন্ধান করতে এবং সেই জ্ঞানকে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তিনি কুরআন মুখস্থ করার গুরুত্ব শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য তাঁকে চিনতে হবে। আল্লাহকে জানার মাধ্যমেই তাঁর সৃষ্ট এই পৃথিবীর নানা রহস্য বুঝতে পারা সম্ভব। তাই জ্ঞান হল আল্লাহ-কে ভালোবাসার  এবং তাঁকে উপলব্ধি করার মূল চাবিকাঠি।