অর্থ-সম্পদ এবং সুখ: এ দুটি কি পরস্পরের পরিপূরক?

Freedom
ID 180011469 © CristinaConti | Dreamstime.com

অর্থ-সম্পদ এবং সুখ, এ দুটিকে মানব জীবনের আরাম-আয়েশ ও শান্তির পেছনের মূল উৎস হিসেবে দেখা হয়। এমনকি আমরা এটাও বলতে পারি যে, অর্থ-সম্পদই সুখ তৈরি করে, সম্পদের ভালোবাসার আলিঙ্গনে সুখ দৃঢ় ও মজবুত হয় এবং এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য উপহার স্বরূপ। 

সুখী কারা ?

কিন্তু এটাই কি সর্বসম্মত নিয়ম যে, অর্থের মাঝেই সুখ লুকিয়ে আছে? না, আমার এমন মনে হয় না। যদি এটি সত্যই হত তাহলে দুনিয়ার সকল ধনীরাই সুখী হত।

এই যেমন লোকে বলে, অর্থ-সম্পদই আসলে জীবন। যার টাকা আছে পৃথিবী তার হাতের মুঠোয়। টাকা থাকলে আপনি আপনার সমাজে জনপ্রিয় হবেন। সবাই আপনার কাছের মানুষ হতে চাইবে- যেহেতু অর্থ-সম্পদই এই পৃথিবীতে সবচেয়ে দরকারী জিনিস। আপনার যা কিছু দরকার সবকিছু আপনার জন্য সহজলভ্য হবে, জীবনসঙ্গীনী হিসেবে একজন সুন্দরী স্ত্রী, থাকার জন্য একটি আলিশান বাড়ি এবং একটি নজরকাড়া গাড়ি এবং আরো অনেক কিছু আপনি অর্থের মাধ্যমে পাবেন।

কিন্তু জীবনটা আসলে ফুলশয্যা নয়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অর্থ মোক্ষম বস্তু হতে পারে না। যেহেতু এটা  মানুষের তৈরি। সুতরাং মানুষের ক্ষমতা যদি সীমাবদ্ধ হয় তবে তার তৈরি জিনিসের ক্ষমতাও সীমিত হবে। এইজন্যই আমরা দেখি যে, বিত্তশীলদেরও অনেকক্ষেত্রে কঠিন সময় পার করতে হয়।

ব্যস্ততা সম্পদশালীদের জন্য মহামারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক বেশি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে তাদের সাধারণ জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করতে গিয়ে তারা তাদের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের সময় পায় না। পরিবারের সবচেয়ে ছোটোরা, যাদের সবচেয়ে বেশি যত্নের দরকার তারাই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে। সন্দেহ নেই যে, এদের সন্তানদের মাঝেই আমরা অপরাধ প্রবণতা বেশি দেখছি শুধু মাত্র পিতামাতার শাসনের অভাবে এবং অতিরিক্ত স্বাধীনতার ফলে।

কোন কারণ ছাড়াই বিদ্রোহী হয়ে ওঠা

ধনীদের জীবনের যন্ত্রণা আর অশান্তি আন্দাজ করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। সুতরাং আমরা পরিষ্কার ভাবেই দেখতে পাই যে, ধনী বা সম্পদশালী হওয়া এক জিনিস আর সুখে শান্তিতে জীবনযাপন করা আরেক জিনিস। সুখী  জীবনযাপন করার জন্য অবশ্যই অন্তরে সন্তুষ্টি থাকতে হবে। একজন মানুষের সুখী হওয়ার জন্য কোটিপতি হওয়ার নেই বরং তখনি সে প্রকৃত সুখের স্বাদ পাবে যখন সে যা পাবে, তার উপরই সন্তুষ্ট হবে।

সাম্প্রতিক একটি জরিপে পাওয়া গেছে যে, ফোর্বস এর অত্যন্ত ধনী ৪০০ জন ব্যক্তি ও পূর্ব আফ্রিকার মাসাইয়ের পশু-পালক লোকেরা একই পরিমাণে সুখী!

বৈবাহিক সুখ

ভালোবাসা আরো একটি জিনিস যা মানুষ অর্থ দিয়ে কিনতে পারেনা। আমরা যদি বলি যে, ভালোবাসার ক্ষেত্রে টাকা পরিপূরক এই অর্থে যে, এটা পরস্পরের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি করে, তবে এক্ষেত্রে আমরা কিছুটা হলেও সঠিক। কারণ যদি ভালোবাসার পেছনে এতে সাপোর্ট দেওয়ার মতো টাকা থাকে তাহলে সেখানে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু যদি আমরা এটা বোঝাই যে, ভালোবাসার ক্ষেত্রে টাকা একটি অপরিহার্য উপাদান, এটি ছাড়া ভালোবাসা বাড়বে না, তবে এক্ষেত্রে আমাদের আন্দাজে ভুল আছে।

আমরা এমন সমাজে বাস করি যেখানে নারীদের তাদের পছন্দ মতো জীবনসঙ্গী বাছাই করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে, সেখানে বেশির ভাগ নারীর প্রথম চাহিদা থাকবে একটি স্নেহপূর্ণ ভালোবাসা। প্রাকৃতিক ভাবেই নারীদের কোমল হৃদয়ের ফলে তারা একটু যত্নশীল হয়ে থাকে, আর তাই স্নেহপূর্ণ ভালোবাসার প্রতি তারা অবনত হয়। নারীরা সাধারণত সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে একটু কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়। কিন্তু তাদের চাহিদায় ভালোবাসাটাই সবার আগে থাকে।

এটা অবশ্য সত্য যে, কিছু নারী টাকার পেছনে ছোটে, টাকাকেই বিবাহের প্রথম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু এটাকে সবসময়ই ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা হবে। আর আমরা সবাই জানি যে, এতো সম্পদ ও আভিজাত্যের মাঝেও এইসব বিয়ের ক্ষেত্রে ভাগ্যে সাধারণত থাকে ভয়ঙ্কর পরিমাণ কষ্ট ও দুর্দশা। 

কীভাবে?  

সব মিলিয়ে, আমি বিশ্বাস করি যে, টাকা এবং সুখের মাঝের সম্পর্ক বুঝতে হলে আমাদের বুঝতে হবে যে, আমাদের জীবনে সম্পদের ভূমিকা কতটুকু এবং তা কিভাবে ব্যয় করা উচিত। কারণ মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করতে শুরু করেছেন যে, ধনী মানুষের দুর্দশার সম্ভাব্য একটি কারণ, তারা কিভাবে তাদের সম্পদ ব্যয় করছে তার উপর নির্ভর করে।  

সুখ এবং অর্থ-সম্পদ এ দু’য়ের মাঝের সম্পর্ক এটাই বর্ণনা করে যে, অর্থ-সম্পদ মানুষকে সুখী হতে সাহায্য না করলেও সুখ মানুষকে অর্থ-সম্পদ অর্জনে সাহায্য করে।