অস্ট্রেলিয়ায় কীভাবে এখনও বেঁচে রয়েছে ইসলাম?

Auburn Gallipoli Mosque in Auburn, Sydney.
Auburn Gallipoli Mosque in Auburn, Sydney. Photo 13912078 © - Dreamstime.com

প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়াতে ধুমধাম করে ‘অস্ট্রেলীয় দিবস’ পালন করা হয়। দেশের সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে বিভিন্ন স্থানে সেই দিবস উদযাপন করে। আলোর মালা, বাজি, লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার ‘সভ্য’ হওয়ার ইতিহাস ইত্যাদি সিডনি ও মেলবোর্ন শহরের নানা স্থানে দেখানো হয়।

ইউরোপিয়ানদের কাছে এই দিনটি ঠিক যতটা আনন্দের, অস্ট্রেলিয়ার দেশীয় আদিবাসীদের কাছে দিনটি ততটাই যন্ত্রণার। এই দিনেই, ১৭৮৮ সালে ক্যাপ্টেন আর্থার ফিলিপের নেতৃত্বে ব্রিটিশ জাহাজবাহিনী অস্ট্রেলিয়ার জমিতে অধিকার কায়েম করে। ব্রিটিশদের কাছে অস্ট্রেলিয়া ছিল ‘টেরা নুলিয়া’ , এমন এক মহাদেশ যেখানে কেউ বাস করে না। আদতে, অস্ট্রেলিয়ার দেশীয় মানুষদের ইউরোপিয়ানরা কখনই গুরুত্বপূর্ণ বলে গ্রাহ্য করেনি।

পশ্চিমা সভ্যতার পূর্বে

২২৯ বছর আগে, এই ২৬ জানুয়ারি থেকেই অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের স্থানীয় অধিবাসীদের উপর যে অত্যাচার শুরু হয় তা প্রায় একশো বছর বজায় ছিল। ১৯৬০ পর্যন্ত আদিবাসীদের নানারকম অন্যায্য আইনের আওতায় রাখা হয়েছিল। তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে কিছুই ছিল না। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাঁদের বন্যপশুর মতো শিকার করা হত।

মানবাধিকার, মানুষ হিসাবে জীবনযাপনের অধিকার প্রায় কিছুই ছিল না তাঁদের। আদিবাসীদের সন্তানদের বলপূর্বক রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পাঠানো হত যাতে তারা ‘পাশ্চাত্য আধুনিকতা’ শিখে ‘মানুষ’ হতে পারে। ক্রমাগত ইউরোপিয়ান শোষণে স্থানীয় অস্ট্রেলীয়রা ক্রমশ নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষা ভুলে যেতে শুরু করে।

ব্রিটেন কলোনি স্থাপনের মাধ্যমে প্রথমেই স্থানীয় অস্ট্রেলীয়দের জমি দখল করে। তারপর তাঁদের জীবনযাপনে হাত দেয়। শেষে এমন অবস্থা ঘটায় যে স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের শিকড় ভুলে ইউরোপিয়ানদের ঠিক করে দেওয়া পথে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। স্বাধীনতা বলে কিছুই আর থাকে না তাঁদের।

‘ব্ল্যাক হিস্ট্রি ডিড নট স্টার্ট উইথ স্লেভারি’ নামক প্রবন্ধে দাউদ লোকা বর্ণনা করেছিলেন যে ইউরোপিয়ান আগ্রাসনের আগেও অস্ট্রেলিয়াতে ভীষণ সুন্দর স্থানীয় সভ্যতা ছিল। আর সেই সভ্যতায় সামুদ্রিক ব্যবসা বাণিজ্যও হত। তাহলে ব্রিটিশদের দখলের আগে কারা ব্যবসার খাতিরে পা রেখেছিল অস্ট্রেলিয়ায়? কাদের নির্লোভ সৎ বাণিজ্যনীতি কখনই অস্ট্রেলিয়াকে দখল করার কথা ভাবেনি?

ইসলামী সংযোগ

মেলবোর্নের মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানথ্রপলজির অধ্যাপক জন ব্র্যাডলির মতে ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষদের সঙ্গে অস্ট্রেলীয়দের ব্যবসা হত এবং অত্যন্ত সুসম্পর্ক বজায় ছিল। তিনি বলেন, ‘মুসলমান বণিক ও স্তাহ্নীয় বাসিন্দাদের বাণিজ্যের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সরল ও ন্যায্য। কোনোরকম জাতিগত ঔদ্ধত্য বা দখল করার ইচ্ছে ছিল না মুসলমান বণিকদের মধ্যে।’

অনেক অস্ট্রেলিয়ানই এখন জানে না যে ইউরোপিয়ানরা আসার অনেক আগে এই মহাদেশের মানুষের সঙ্গে ইসলামের গভীর আন্তরিক যোগাযোগ ছিল। মক্কাসার শহর থেকে ইন্দোনেশীয় মুসলমান জেলেরা মাছ ধরতে পাড়ি দিত অস্ট্রেলিয়া। এই জেলেরা মূলত সমুদ্র শসা সংগ্রহ করত। এই বিশেষ প্রাণীটি তখন চীনা ওষধির জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই মুসলমান জেলেদের অনেকেই অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রমণীদের বিবাহ করে থেকে যান এবং ধীরে ধীরে ইসলামের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় অধিবাসীদের।

তবে আফগান উট ব্যবসায়ীরা মূলত প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় পরিবার স্থাপন শুরু করে। এখনও অস্ট্রেলিয়ার নেটিভদের মধ্যে খান, সুলতান, মাহমুদ, আকবর প্রভৃতি পদবীর মানুষ দেখা যায়। মুক্তোর কারখানায় প্রচুর মালয় মুসলমান কর্মী কাজ করতেন, তারাও স্থানীয় রমণীদের বিবাহ করেন এবং এভাবেই অস্ট্রেলিয়ার অলিতে গলিতে ইসলাম নিজের পদক্ষেপ ফেলতে শুরু করে।

সর্বধর্ম সমন্বয়

জন ব্র্যাডলি নিজের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ইউরোপিয়ানদের হানার আগে ইসলাম ও অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ পেগান ধর্ম শান্তিপূর্ণ ভাবেই সহাবস্থানে ছিল।

তিনি বলেন, ‘ যদি উত্তর পূর্ব আরনহাম প্রদেশে যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে সেই অঞ্চলের গানের মধ্যে, শিল্পর মধ্যে, অঙ্কণ পদ্ধতির মধ্যে , অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মধ্যে ইসলামের প্রভাব রয়েছে। কুর আন থেকে আল্লাহর বাণীও সেখানকার মানুষের মুখে শুনতে পাওয়া যায়।’

এখনও অস্ট্রেলিয়ার অ-ইউরোপিয় মানুষের মধ্যে ইসলাম ধর্ম নেওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। ২০০১ -এর জাতীয় জনগণনায় ৬৪১ জন স্থানীয় মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। ২০০৬ এর জনগণয়ায় সেই সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১০১৪ জন। ডক্টর পিটা স্টেফেনসন, যিনি অস্ট্রেলিয়ার নেটিভদের নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি সার্ভে করে দেখেছেন যে সমস্ত দেশীয় মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন তারা কোনও না কোনও ভাবে নিজের শিকড়ের কাছে পৌছতে চাইছেন।

তাঁদের মতে, ইসলাম ধর্ম তাঁদের এই বিশেষ ইচ্ছেয় অত্যন্ত সাহায্য করছে।

শিকড়ের টান

এছাড়া ইসলাম বিশেষ করে সাহায্য করছে আদিবাসী রমণীদের। হিজাব ও পরদা প্রথা তাঁদের ইজ্জত রক্ষা করছে যা ইউরোপিয়ান আগ্রাসনে বেশ বিপদের মুখে পড়েছিল। দেশীয় যুবকদের মধ্যে ইসলাম বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের মনোভাব ছড়িয়ে দিচ্ছে যা তাঁদের অসহায়তা দূর করছে। আত্মসম্মান ফিরে পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে নেশা, অসংযত জীবনযাপনের প্রবণতা কমছে।

নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

সমস্ত মানুষ হযরত আদম ও হাওয়া আলাহিস সালাম এর সন্তান। সেই হিসেবে সকল ধর্মবর্ণের মানুষ পরস্পর ভাই ভাই।(বুখারি, হাদিস নং-৩৩৫৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৩৭১)

অস্ট্রেলীয় মুসলমানরা ঐ মহাদেশের নেটিভদের বলতে গেলে নিজের ভাই হিসাবে বুকে টেনে নিয়েছে। তাই জন্যই প্রতি ২৬ জানুয়ারি তাঁদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের মানুষও শোক পালন করে, মনুষ্যত্বের লড়াইয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার করে।