অহংকারীর আত্মগৌরব মাটিতে ধূলিসাৎ হবে

নিজের পছন্দনীয় অর্থাৎ নিজের ইলিম ও ইবাদতকে স্বীয় ভেবে মনে মনে গর্বিত ও আনন্দিত হওয়া মনের একটি জঘন্য ব্যাধি। মূর্খতা এই ব্যাধির একটি বড় কারণ।

পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ তা’আলা বলেন- কখনো অহংকারবশত মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না, মাটিতে গর্বিতভাবে পা ফেলো না। উদ্ধত অহংকারীকে নিশ্চয়ই আল্লাহ অপছন্দ করেন। ( সূরা লোকমান- আয়াত ১৮)

মহান আল্লাহ তায়ালা যিনি জমিনকে যাবতীয় বস্তু হতে নিচু করে বা নত করে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ সৃষ্টির অন্যতম উপাদান হচ্ছে এই মাটি। কাজেই অহংকারী হয়ে আত্মগৌরবে কখনোই মাটিতে চলাফেরা করা উচিত নয়।

অহংকার এর একটি শাখা আত্মগৌরব। অহংকার ও আত্মগৌরব এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অহংকার হল নিজেকে অন্যের তুলনায় বড় মনে করা। অন্যকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা, নিকৃষ্ট মনে করা। আর ইবলিশ শয়তানই ছিল দুনিয়াতে প্রথম অহংকারী। আর আত্মগৌরব হলো অন্যের দিকে লক্ষ্য না করে শুধুমাত্র নিজেকে মহতি গুনের মালিক বলে ধারণা করা এবং আল্লাহ তা’আলা প্রদত্ত গুণাবলিকে নিজের সম্পদ মনে করা। মহান রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত গুণ নিজ থেকে হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় না করা আত্মগৌরবের অন্তর্গত।

আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের আত্মগৌরব বা খোদপছন্দী না করার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেছেন। কুরআনে এসেছে- অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্রতার বড়াই কোরো না (বিনয়ী হও)। কে আল্লাহ-সচেতন তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। (সুরা নজম : আয়াত ৩২)

রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খোদপছন্দী বা আত্মগৌরব করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন এ সবই মানুষের ধ্বংসের কারণ। হাদিসে এসেছে- ‘প্রবৃত্তির অনুগামী হওয়া, কৃপণতার অনুগত হওয়া এবং আত্মপ্রশংসায় লিপ্ত হওয়া, এগুলো হচ্ছে ধ্বংসাত্মক বদ-অভ্যাসসমূহের অর্ন্তগত। তবে এ সবের মধ্যে শেষটি (‘ধ্বংসাত্মক বদ-অভ্যাস’) হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য।’ (বায়হাকি, মিশকাত)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, তিনটি প্রবৃত্তির মানুষের দ্বীনদারী জীবনকে ধ্বংস করে দেয়।

১. কৃপণতা

২. লোভ

৩. আত্মগৌরব।

তিনি আরো বলেন, তোমরা পাপ না করলেও আমি তোমাদের ব্যাপারে এমন একটি জঘন্য বিষয়ের আশঙ্কা করি যা পাপের চেয়েও বেশি মারাত্মক।তাহলো আত্মদাম্ভিকতা অর্থাৎ নিজের কাজ ও গুণাবলীকে সর্বোত্তম বলে মনে করা। একবার উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা ছিদ্দীক্বা আলাইহাস সালাম উনাকে লোকজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, মানুষ কখন পাপ কাজে প্রবৃত্ত হয়? জাওয়াবে তিনি বলেছিলেন, যখন মানুষ নিজেকে পুন্যবান ও নেক আমলকারী বলে ভাবতে শুরু করে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ বলেছেন দুটি বিষয় দ্বারা মানুষের সর্বনাশ হয়ে থাকে। একটি হচ্ছে আত্মদাম্ভিকতা, আর অপরটি হচ্ছে মহান আল্লাহ তাআলার রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়া। হযরত বশীর ইবনে মনছুর একদিন দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করছেন। আর এই দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতে দেখে এক ব্যক্তি মনে মনে খুব আশ্চর্য বোধ করছিল। নামাজ শেষ করে হযরত বশীর ইবনে মনছুর লোকটি কে উদ্দেশ্য করে বললেন, আশ্চর্যান্বিত হয়ো না। ইবলীসও দীর্ঘকাল ধরে ইবাদাতে লিপ্ত ছিল; কিন্তু তার শেষ পরিণতি তো অবশ্যই জানো।

আত্মগৌরব এর কারণে নানা বিধ অনিষ্ট ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেমন- নিজের দোষ ধরা পড়ে না। অতীতের পাপের কথা স্মরণ হয় না, স্মরণ হলেও পাপ মাফ হয়ে গেছে বলে মনে করা। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিমাণ কমে যাওয়া। আত্মপ্রশংসার লিপ্ত হওয়া। নিজেকে পাপমুক্ত খুব পবিত্র মনে করে অপরের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া। এর বাইরে আরো নানা রকমের অনিষ্ট ঘটনা করতে থাকে।

এ ধরনের মন মানসিকতার কারনে পরস্পরের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ ঝগড়া মারামারি তথা অশান্তির সৃষ্টি হয়।

সুতরাং আত্মগৌরব থেকে নিজেকে সবসময় বিরত রাখতে হবে। এ কারণেই পবিত্র কোরআন এবং হাদিসের আত্মগৌরব থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখার ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হয়েছে।

আমাদের উচিত নিজের মতামত গুণ বা কাজকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্যের ভালো কাজকে, মতামতকে সম্মান করা।

কারণ আত্মগৌরব শুধুমাত্র আল্লাহর।