অ্যান্টার্কটিকায় কেন দেখা যাচ্ছে ‘সবুজ বরফ’?

antarctica

সবুজ  পৃথিবীর  অন্যতম আকর্ষণীয় অঞ্চল শুভ্র অ্যান্টার্কটিকা ।

পৃথিবীর শুষ্কতম ও শীতলতম  মহাদেশ। দক্ষিণ মহাসাগর দিয়ে ঘেরা এবং পৃথিবীর দীর্ঘতম এই মহাদেশের লুকিয়ে আছে কত অজানা রহস্য। যার অনুসন্ধানে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন দেশের শতশত বিজ্ঞানী, অভিযাত্রী ছুটে গেছেন এই মহাদেশ।

বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সূর্যমামার দেখা পাওয়া যায় না এখানে। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই এখানকার তাপমাত্রা  অনেক কম থাকে। − ১০° সেলসিয়াস থেকে −৬৩ °সেলসিয়াসের মধ্যে দিনের তাপমাত্রা উঠানামা করে। মে থেকে জুলাই মাসের ভেতরে সূর্যমামার সামান্য আলো এখানে পাওয়া যায়।

এই অ্যান্টার্কটিকার অনেকগুলো রহস্যের মধ্যে একটি রহস্য হচ্ছে এর সবুজ বরফ।

সূর্য রশ্মি নীল রঙের প্রতিফলন ঘটায় বলে বরফের রং হয় হালকা নীল।  এ কারণেই সমুদ্রে ভাসতে থাকা বেশিরভাগ হিমশৈলের রং নীল অথবা সাদা। কিন্তু অ্যান্টার্কটিকার পূর্বদিকের সমুদ্রে অত্যন্ত দুর্লভ সবুজ হিমশৈল ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। গত প্রায় ১০০ বছর ধরে এ অঞ্চল নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানী, অভিযাত্রী, নাবিকরা মহাসাগরে ভাসতে থাকা এই সবুজ অদ্ভুতদর্শন হিমশৈলের কথা বলেছেন।

তারা বিভিন্ন সময় তাদের গবেষণার জন্য বা অভিযাত্রীরা, নাবিকরা যখন এসব অঞ্চলে অবস্থান করতেন বা অঞ্চলের পাশ দিয়ে যেতেন তখন তারা এই দুর্লভ দৃশ্য দেখতে পান। এবং পরে  এ খবরটি বিভিন্ন  স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।

লরা হেরেইজ, যিনি অস্ট্রেলিয়ান তাসমানিয়া ইউনিভার্সিটির একজন সমুদ্র বিজ্ঞানী ।  তিনি ১৯৮০ সালে অ্যান্টার্কটিকায়  অভিযানে যান।  সেখানে তিনি Amery Ice Shelf এর বরফে থাকা লোহার পরিমাণ পরীক্ষা করেন।  এই বরফের মধ্যে হিমবাহের বরফের তুলনায় ৫০০ গুণ বেশি লোহা ছিল।

এরপর ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির হিমবাহবিদ, স্টিফেন ওয়ারেন তার দলবল নিয়ে অ্যান্টার্কটিকায় পৌঁছান সবুজ হিমশৈলর রহস্য সন্ধানের জন্য। সেখানে পৌঁছে তিনি পেয়ে যান একটি প্রকাণ্ড হিমশৈল। এবং সরঞ্জাম নিয়ে উঠে পড়েন এর উপর।

তিনি রীতিমত বিস্মিত হয়ে যান হিমবাহটির স্বচ্ছতা দেখে। এটি ছিল কাঁচের মত স্বচ্ছ।  এর ভেতরে ছিল না কোন বাতাসের বুদবুদ।  তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটি কোন সাধারণ হিমশৈল নয়।

তিনি ও তার দলের  গবেষকরা প্রথমে  ধারণা করেছিলেন সবুজ রঙের জন্য সমুদ্রের পানির অশুদ্ধতা দায়ী। অনেক আগে মৃত সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও অণুবীক্ষণিক দেহাবশেষ, পানিতে দ্রবীভূত জৈব কার্বন একত্রিত হয়ে সমুদ্রের পানিকে অশুদ্ধ করেছে।  এই অশুদ্ধ পানি জমে এই সবুজ বরফের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৬  সালের তাদের একটি অভিযানে তাদের নিজেদের একটি গবেষণায় তাদের এই ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হয়।

কিন্তু তিনি দমে না গিয়ে কাজ চালিয়ে যান। তিনি ও তার দলের সদস্যরা এর পরবর্তীতে আবিষ্কার করেছিলেন যে সবুজ  বরফ  তৈরি হয়েছে সমুদ্রের পানি জমে হওয়া বরফ বা Marine ice দিয়ে।

এই বরফ হিমবাহের বরফের চেয়ে গাঢ় রঙের এবং স্বচ্ছ হয়ে থাকে। কারণ এর ভেতরে কোন বাতাসের বুদবুদ থাকে না,  ফলে এতে আলোর প্রতিফলন হয় না।

আয়রন অক্সাইড এই বরফের রঙ সবুজ করার পেছনে  কাজ করে, এমনটি মতামত দেয় বিজ্ঞানী দলটি। আয়রন অক্সাইড মরিচায়  বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঙে পাওয়া যায়, যেমন হলুদ, কমলা, লাল ও বাদামি। এছাড়াও মাটিতে পাথরেও পাওয়া যায়। বরফে আয়রন অক্সাইড এর উপস্থিতির পরিমাণের উপর নির্ভর করে বিভিন্ন বিভিন্ন রঙের হিমশৈল তৈরি হয়। আর  হিমশৈলের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা ঐ হিমশৈলের বরফে লোহার পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।

সাধারণত লোহার অভাব থাকে সমুদ্রর পানিতে। তাহলে সামুদ্রিক বরফে এত আয়রন অক্সাইড আসছে কোথা থেকে? The Journal of Geophysical Research ম্যাগাজিনে ওয়ারেন সম্প্রতিক প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে লিখেছিলেন এই আয়রন অক্সাইড সমুদ্রে আসছে অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগ থেকে।

অ্যান্টার্কটিকার স্থলভাগের হিমবাহগুলি পাথুরে মেঝেতে ঘষা খেতে খেতে সমুদ্রের দিকে এগোয়। ঘর্ষণের ফলে তৈরি হয় glacial flour (পাথরের পাউডার)। যখন হিমবাহ ভেঙে বরফ খণ্ড সমুদ্রে এসে পড়ে, পাথরের লালচে-হলুদ পাউডার সমুদ্রের জলে মিশে যায়।

glacial flour বরফে প্রবেশ করে যখন সমুদ্রের পানি জমে সামুদ্রিক বরফ তৈরি হয় । ফলে সামুদ্রিক বরফ দিয়ে তৈরি হিমশৈলে  glacial flour মিশে যায়।  পাউডারের রঙ লালচে-হলুদ এবং বরফের রঙ হালকা নীল হওয়ায়,  নীল আর লালচে-হলুদ রঙ মিলে তৈরি করে বরফের সবুজ রঙ ।