অ্যামাজনের গভীর জঙ্গলে রহস্যজনক ফুটন্ত নদী

asso-myron-ogCOt5X9_ko-unsplash
Fotoğraf: Asso Myron-Unsplash

সারা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় জঙ্গল হচ্ছে অ্যামাজন। এই জঙ্গলে এখনো এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে যা আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারবোনা। দক্ষিণ আমেরিকার সাতটি দেশজুড়ে স্থান করছে এই মহাজঙ্গলটি। প্রতিদিন এই জঙ্গলের বিভিন্ন ধরনের অকল্পনীয় এবং আশ্চর্যজনক বিষয় আবিষ্কৃত হচ্ছে। তেমনি এক রহস্যময় নদীর সন্ধান মিলেছে অ্যামাজন জঙ্গলে। তবে এই নদীটি কোন সাধারণ নদী নয়। এটি একটি “ফুটন্ত নদী”। নামলে যেকোনো জীবেরই সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এই নদীতে আপনি হয়তো কখনোই নামতে চাইবেন না।

ছোটবেলায় আমরা বিভিন্ন রূপকথার গল্প এমন নদীর কথা শুনেছি। এমন একটি ফুটন্ত নদী, যার গরম পানিতে যেকোনো পশুপাখি পড়ে গেলে তা সিদ্ধ হয়ে যায়। যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে সেই ফুটন্ত নদীর গল্প আমরা শুনেছি। রূপকথায় আরো আছে, স্প্যানিশ বিজেতারা স্বর্ণের খোঁজে অ্যামাজনের গহীনে গিয়ে ফিরে এসে বিষাক্ত পানি, মানুষ খেকো সাপ আর টগবগে ফুটন্ত নদীর গল্প শোনাতেন।

তবে এবার রূপকথায় নয়, বাস্তবেই সেই ফুটন্ত নদীর দেখা গেল অ্যামাজন জঙ্গলের গভীরে। ভাবতে অবাক লাগলেও এটি সত্যি। রূপকথার এই নদীর সন্ধান মিলল পেরুতে। খুঁজে পেয়েছেন পেরুর ভূবিজ্ঞানী আন্দ্রে রুজো।

ভূবিজ্ঞানী আন্দ্রে রুজোও অবাক হয়েছিলেন প্রথমে তিনি যখন এই নদীর কথা শুনলেন। ফুটন্ত নদী রয়েছে এ কথা তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ১২ বছর আগে পারিবারিক এক অনুষ্ঠানে তার দাদুর কাছে প্রথম তিনি এই ফুটন্ত নদীর কথা শুনেছিলেন। তখন তার কাছে এটি নিছক গল্প ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। যদিও এমন নদীর খোঁজ তিনি সব সময়ই করতেন।

এক সময় তার কাকা তাকে জানালেন যে, ফুটন্ত নদীর কথা শুনেছেন যা অ্যামাজনের গভীরে অবস্থিত। তবে সে কথায় খুব একটা ভরসা করতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে তার নিজের চিন্তা এমন ছিল যে, একটি নদীর পানিকে ফোটানোর জন্য যে পরিমাণে উত্তাপের প্রয়োজন হবে তার জন্য সেই নদীর আশেপাশে অনেকগুলো অগ্নিগিরি থাকতে হবে। কিন্তু অ্যামাজনে তো এমন কিছু নেই। সুতরাং এমন কিছু পাওয়া অসম্ভব। তবুও তিনি একবার নিজ চোখে যাচাই করার জন্য রওনা দিলেন অ্যামাজনের গভীরে। আর একটি স্থানে গিয়ে তিনি বিস্মিত হয়ে দেখলেন সেই ফুটন্ত নদীকে।

অ্যামাজনের গভীরে পেরুতে তিনি দেখতে পেলেন সেই আশ্চর্যজনক নদী। প্রায় চার মাইল লম্বা এই নদী থেকে অনবরত ধোঁয়া উঠছে যেমনটি ধোঁয়া উঠে থাকে ফুটন্ত পানি থেকে। আর নদীর পানিতে পড়ে আছে নানা রকমের জীবজন্তু। হয়তো পানি পানের আশায় নদীতে নেমে অথবা অন্য কোন কারণে নদীতে নেমে তারা আর ফিরে আসতে পারেনি। ভূবিজ্ঞানী আন্দ্রে রুজো পানির উষ্ণতা অনুধাবন করার জন্য তিনি এই নদীর পানিতে হাত দেবার চেষ্টা করেন। এবং এই নদীতে হাত দিতেই তিনি টের পান এর উষ্ণতা। এই পানির এমনই উত্তাপ যে, যদি কোন মানুষ এই পানিতে পড়ে যায় তাহলে সে সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

রহস্যময় এই জঙ্গলের রহস্যময় এই নদীর পানির গড় তাপমাত্রা প্রায় ৮৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। নদীটি চওড়ায় প্রায় ২৫ মিটার, এবং এর গভীরতা ও প্রায় ৬ মিটার। গরম পানির প্রবাহ আছে সোয়া ৬ কিলোমিটার জুড়ে। তিনি দাবি করেন সারা পৃথিবীতে এমন নদী এই একটিই রয়েছে। যার স্থানীয় নাম শানায়-তিমপিশকা অর্থাৎ সূর্যের তাপে টগবগে।

ভূবিজ্ঞানী আন্দ্রে রুজো তার গবেষণায় দেখেছেন বৃষ্টির মত একটি ঝর্ণার পানি এই নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে উল্টোদিকে। এবং এতেই প্রকাণ্ড এক জলবিদ্যুৎ তৈরীর মত করে পৃথিবীর ভূ-তাপীয় শক্তিতে গরম হয়ে উঠছে এই পানি। অপর একটি ব্যাখ্যায় মনে করা হচ্ছে যে, ভূপৃষ্ঠের বুকে শিরার মত প্রচুর ফন্ট লাইন রয়েছে। তার মধ্যে গরম পানি ভর্তি। এগুলো ভূপৃষ্ঠের সংস্পর্শে আসার ফলে ভূ তাপ নির্গত হয় এবং উপরের পানি উষ্ণ হয়।

অবশ্য পৃথিবীতে এমন ফুটন্ত পানির নদী কিংবা হ্রদের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। রাশিয়া, চীন ও জাপানে এই ধরনের ফুটন্ত পানির নদী আছে। তবে আমাজানে এই নদী পাওয়ার বিষয়টিকে রহস্যজনক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন আন্দ্রে রুজো। তাঁর ভাষ্যমতে, চীনে ইয়াংটজে নদীর রক্ত লাল বর্ণের পানির কারণ হলো পাশেই থাকা ফসফরাস উদগীরণকারী আগ্নেয়গিরি। আর এই আগ্নেয়গিরির কারণেই রাশিয়ার ইয়েকেটারিনবার্গ শহর দিয়ে প্রবাহিত ‘ওলখভকা’ নদীর পানিও টগবগ করে ফোটে।