অ্যারোমাথেরাপির সাহায্যে সুস্থ থাকা সম্ভব কি?

মানসিক স্বাস্থ্য ১৪ জানু. ২০২১ Contributor
ফিচার
অ্যারোমাথেরাপির
© Tabo80 | Dreamstime.com

আধুনিক পৃথিবীতে অ্যারোমাথেরাপি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ধারণা। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন অ্যারোমাথেরাপির বা সুগন্ধির সাহায্যে এই যে থেরাপি করা হয় তা আমাদের মানসিক উদ্বেগ কমায়। আমরা শান্ত হতে পারি এবং আমাদের পেশিকে রিল্যাক্স করে পরেরদিনের কাজের জন্য আমাদের আবার এনার্জি দেয়। সারাদিনের পরিশ্রমের পর ল্যাভেন্ডার বা পাইনের সুগন্ধের মোমবাতি জ্বালিয়ে যদি কেউ রিল্যাক্স করে, সুভানআল্লা,আমি চোখ বুজে বলে দিতে পারি পরের দিন অফিসের কাজে সে আজকের থেকে বেশি কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে।

অ্যারোমাথেরাপির ইতিহাস

ইতিহাসের পাতা উল্টোলে দেখা যাবে, অ্যারোমাথেরাপির সূচনা কিন্তু এখনকার সময়ে নয়। বরং, প্রায় হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এই বিষয় পৃথিবীর মানুষের কাজে লেগেছে। প্রথম এর প্রচলন শুরু হয় চীনদেশে। চীনের অধিবাসীরা নানা প্রকার গাছ, ফুল পাতা ও ভেষজ তেলের সাহায্যে নিজেদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা করত।

নানারকম সুগন্ধির ব্যবহার সে দেশের অভিজাতদের বিলাসিতার অন্তর্গত ছিল। সুগন্ধি মানুষের মন ভাল করে, একটা সদর্থক মানসিক পরিবর্তন ঘটায়।

ইসলামেও সুগন্ধিকে হারাম হিসাবে মানা হয় না। আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সাঃ) সুগন্ধি অন্ত্যন্ত পছন্দ করতেন। তিনি নিয়মিত আতর ব্যবহার করতেন। পবিত্র হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি, মহান নবী ইরশাদ করেছেন,

‘‘তোমাদের দুনিয়ার মধ্যে আমার কাছে স্ত্রী ও খোশবুকে প্রিয় করা হয়েছে। আর নামাযকে করা হয়েছে আমার চক্ষুশীতলতা।’’

তবে, ইসলামে সুগন্ধি, ভেষজ তেল বা সুরভিত মোমবাতির বদলে উপাসনা ও যিকরের মাধ্যমে আত্মার শান্তি ও মনের উদ্বেগ কমানোকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়।

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো দুঃখ-কষ্ট বা চিন্তা ও অস্থিরতার সম্মুখীন হতেন তখন বলতেন-

‘হে চিরঞ্জীব! হে চিরস্থায়ী! আপনার রহমতের মাধ্যমে আপনার নিকটে সাহায্য চাই।’ (তিরমিজি, মুসতাদরেকে হাকেম, মিশকাত)

আসলে মনে রাখতে হবে চীনারা যখন প্রথম সুগন্ধি ভেষজ তেল ব্যবহার করতে শুরু করে তখন তার মধ্যে অ্যালকোহলের খাদ মেশানো হত না। ফলে, ইসলামে তা ব্যবহার হারাম ছিল না। কিন্তু, বর্তমানে যে সমস্ত তেল বা সুগন্ধি তৈরি হয় তার মধ্যে কখনও কখনও কিছু পরিমাণ অ্যালকোহল মেশানো হয়। ফলে, ইসলামে সেগুলির ব্যবহার হারাম হিসাবে পরিগণিত হয়।

সুতরাং, যতি সুগন্ধি তেল কিনতেই হয়, তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন ১০০ শতাংশ পবিত্র ও পরিশুদ্ধ ভেষজ হয়।

সুগন্ধি মোমবাতির ব্যবহার

ঘরে যদি সুগন্ধি মোমবাতি ব্যবহার করতে হয় তাহলে প্রথমে সিডার, ইউক্যালিপটাস, দারচিনি, রোজমেরি, ভ্যানিলা ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি সংসার সন্তান কেরিয়ার সামলে অত্যন্ত ক্লান্ত লাগে তাহলে অবশ্যই ল্যাভেন্ডারের গন্ধযুক্ত মোমবাতি আপনাকে দেবে আরাম। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী সুগন্ধের জন্য ‘ এসেনশিয়াল অয়েল বার্নার’ ব্যবহার করা যেতে পারে। মাত্র চার কি পাঁচ ফোঁটা সুগন্ধি তেল এতে ঢেলে দিলেই পুরো ঘর ম’ম’ করবে সুন্দর গন্ধে।

সারা বিশ্বের মোমবাতি ব্যবসায়ী সমিতির কাছ থেকে সমীক্ষা পাওয়া গিয়েছে যে তারা যে সমস্ত মোমবাতি উৎপন্ন করেন তার শতকরা পঞ্চাশ ভাগ সুগন্ধি। সাধারণ মোমবাতির থেকে সুগন্ধি মোমবাতির চাহিদা অনেক বেশি।

এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক কোন সুগন্ধি মোমবাতি কীসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-

মানসিক শান্তি, সারাদিনের ক্লান্তির পর রিল্যাক্সের জন্য অবশ্যই ব্যবহার করুন ল্যাভেন্ডার, জেরানিয়াম ও ক্যামোমাইল।

নিজেকে তরতাজা ও কর্ম চঞ্চল রাখতে ব্যবহার করুন সেজ ও গোলাপের সুগন্ধি মোম বা তেল।

নিজের হারানো এনার্জি ফিরিয়ে আনতে ব্যবহার করুন রোজমেরি।

মনের সমস্ত চিন্তা, বা উদ্বেগ দূর করতে ব্যবহার করুন ইউক্যালিপটাস, পাইন ও টি ট্রি অয়েল।

অ্যারোমাথেরাপির সাহায্যে সেরে ওঠা

দিনের শেষে ঈষদুষ্ণ জলে রোজ, সিট্রোনেলা বা ল্যাভেন্ডার অয়েল দিয়ে স্নান করলে প্রাথমিক ভাবে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, অনিদ্রা রোগে এটি ভীষণ উপকারী। এই উষ্ণ স্নান ত্বকের পক্ষে অত্যন্ত ভাল এবং ফুসফুসের শ্বাস প্রশ্বাসের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া এটি পেশির ক্লান্তি দূর করে সম্পুর্ণ শরীরকে করে তোলে তরতাজা।

যদি আপনি পেশির যন্ত্রণা কিংবা গাঁটের যন্ত্রণায় ভুক্তভোগী হন তাহলে লাইসেন্সড ও প্রফেশনাল অ্যারোমাথেরাপিস্টের কাছে মালিশ নেওয়া অবশ্য প্রয়োজন। সাধারণত ল্যাভেন্ডারের সাহায্যেই এই মালিশ হয়ে থাকে। এর ফলে আপনার প্রত্যেকটি পেশির তন্তু নরম হয়, ব্যথা কমতে শুরু করে। নিয়মিত মালিশে গাঁটের ব্যায়াম হয়, ফলে আপনি হয়ে ওঠেন আরও সচল।

বর্তমানে জবা ফুলের নির্যাস থেকে তেল বানিয়ে সেই তেলও ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সুগন্ধি তেল উচ্চ রক্তচাপ কমানোতে অব্যর্থ।

কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

‘আর তিনি তোমাদের জন্য যমীনে যা সৃষ্টি করেছেন, বিচিত্র রঙের করে, নিশ্চয় তাতেও নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ [অধ্যায় ১৬, স্তবক ১৩]

মানসিক চাপ কমাতে গোলাপের নির্যাস থেকে বানানো তেলের কোনও বিকল্প নেই। এমনি বেদানা বা দালিমের নির্যাস থেকে বানানো তেল আপনার ত্বকের জ্বলন ও শুষ্কতা দূর করতে সক্ষম।

প্রায় পাঁচশো বছর আগে থেকেই মিশরিয়রা চীনদেশের এই অনুপম আবিষ্কার ব্যবহার করে আসছে নিজেদের শারীরিক উন্নতির জন্য। মহান আল্লাহ আমাদের সুস্থ থাকার বিধান দিয়েছেন। একজন ইমানদার মুসলমান তখনই উম্মাহর প্রতি দায়িত্বশীল হতে পারে যখন সে সুস্থ থাকে। সুতরাং, আল্লাহর দেখানো পথে সুস্থ থাকা আমাদের আশু কর্তব্য।