SalamWebToday নিউজলেটার
সালামওয়েবটুডে থেকে সাপ্তাহিক নিবন্ধ পাওয়ার জন্য সাইন আপ করুন
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

আওরঙ্গজেব- খলনায়ক নাকি নায়ক?

ইতিহাস ২৪ ডিসে. ২০২০
মতামত
আওরঙ্গজেব
Portrait Sultan Aurangzeb https://en.wikipedia.org/wiki/Aurangzeb

বাদশাহ আওরঙ্গজেব, সপ্তদশ শতকে ভারতবর্ষের ষষ্ঠ মুঘল শাসক হিসেবে দিল্লির মসনদে বসেছিলেন। ইতিহাসে তাঁকে প্রায় সর্বত্রই একজন দুষ্ট, ধর্মীয় অসহিষ্ণু, সংখ্যালঘু-নির্যাতনকারী ধর্মান্ধ হিসাবে তুলে ধরা হয়। এই ইতিহাস অনুযায়ী বাদশাহ আওরঙ্গজেবের স্মরণীয় কীর্তিগুলি হল, মসজিদ নির্মাণের জন্য বিভিন্ন মন্দির ভেঙে ফেলা, তাঁর পিতাকে বন্দি এবং ভাইদের হত্যা করে দিল্লির মসনদ দখল করা এবং একার দায়িত্বে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব কী ছিল তা, কোনও ইতিহাসেই সম্পূর্ণ তুলে ধরা হয়নি।

আওরঙ্গজেবের শাসনকালে সেখানে উপস্থিত ইতালির ইতিহাসবিদ মানুচি, বাদশাহ হিসেবে আওরঙ্গজেবকে অপছন্দ করতেন এবং দারা শিকোই মসনদের যোগ্য অধিকারী ছিলেন বলে মনে করতেন। কিন্তু এই ইতিহাসবিদ-ও লিখে গিয়েছেন যে, আওরঙ্গজেব

“… সবসময় মহান নম্র মনোভাবের পরিচয় দেন।”

আওরঙ্গজেব ও মানবিকতার পরিচয়

জানা যায়, একবার আওরঙ্গজেবের সাথে তাঁর এক ভৃত্যের ধাক্কা লেগেছিল এবং দুর্ঘটনাক্রমে বাদশাহ পড়ে গিয়েছিলেন, এই দুর্ঘটনার সম্ভাব্য পরিণতি কল্পনা করে সেই ভৃত্য যখন ভীত হয়ে পড়েছে, তখন এই মুঘল সম্রাট তাঁর সাথে সদয়ভাবে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন,

“কেন তুমি আমার মতো একজন সাধারণ জীবকে ভয় পাচ্ছ? […] ওঠো এবং ভয় পেয়ো না।”

যদিও আধুনিক ইতিহাসবিদরা আওরঙ্গজেবকে খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সব রকম চেষ্টা করেছেন। তার একটি বড় কারণ হল, সময়ের সাথে সাথে তাঁর প্রতিদিনের করুণার অগণিত ছোট ছোট উদাহরণগুলির স্মৃতি ম্লান হয়ে গিয়েছে। তবে তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অপকর্ম- যেমন তাঁর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, একজন বিজয়ী হিসাবে তার নির্মম আচরণ, তাঁর বাবা, ভাই ও ছেলের সাথে কঠোর আচরণ ইত্যাদি অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

অথচ তাঁর পূর্বসূরীরাও সেই একই অপরাধে দুষ্ট ছিলেন, যেমন – জাহাঙ্গীর এবং শাহ জাহান, উভয়েই তাঁদের পিতাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। জাহাঙ্গীর তাঁর এক পুত্রকে কারাবন্দি এবং অন্ধ করেছিলেন এবং এমনকি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। শাহ জাহানও ক্ষমতা দখলের জন্য নিজের ভাইকে খুন করেছিলেন এবং আকবরের উদার ধর্মীয় নীতির বিরোধিতা করেছিলেন।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতা

অবশ্যই এই ধরনের তুলনামূলক আলোচনার ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার সাথে আকবরের “ধর্মীয় সহনশীলতার” সাথে তুলনা করা হয়। অথচ আকবরের আমলে মুসলমানদের দাঁড়ি রাখা নিষিদ্ধ ছিল, মুসলমানদের জন্য গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, বিদ্বান ব্যক্তিদের উপরে অত্যাচার হত।

এমন আরও বহু উদাহরণ রয়েছে। অর্থাৎ আকবরের ধর্মীয় উদারতার অর্থ ছিল মুসলমানদের ধর্মাচরণের উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করা। অপরপক্ষে, আওরঙ্গজেব মুসলমানদের নিখরচায় তাঁদের ধর্ম পালন করার স্বাধীনতা প্রদান করেছিলেন।

সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের যে উদাহরণগুলি তুলে ধরা হয়, সেগুলি বাস্তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল ছিল। যেমন, দাবি করা হয় যে আওরঙ্গজেব শিখ এবং তাঁদের গুরুদের উপরে অত্যাচার করতেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, সেই সময় শিখ সম্প্রদায় আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। ফলে তিনি একজন শাসক হিসাবে, দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসে তা নথিভুক্ত হয়েছে আওরঙ্গজেব দ্বারা অমুসলিমদের উপর নিপীড়নের উদাহরণ হিসেবে।

তাঁর পিতা, ভাই এবং পুত্রদের প্রতি কঠোর আচরণের প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে – শাহ জাহান চেয়েছিলেন পরবর্তী বাদশাহ হবেন আওরঙ্গজেবের বড় ভাই, দারা শিকো। দারা শিকো আকবরের আমলের মুসলমানদের উপরে অত্যাচারমূলক আইনগুলি ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।

শাসন ও কর্তব্য

আওরঙ্গজেব তাঁর পূর্বসূরীদের চেয়ে অনেকাংশে আলাদা ছিলেন, সেই কারণে তিনি দেশের শাসনভারকে উপভোগ করার মতো জিনিস বলে মনে করতেন না, বরং পবিত্র কর্তব্য হিসাবে দেখতেন। তাই তিনি যত ক্ষণ জেগে থাকতেন তত ক্ষণ নিজের দায়িত্ব পালন করতেন, কারণ তিনি মনে করতেন এই গুরুদায়িত্ব সুচারু ভাবে পালন না করলে তাঁকে কায়ামতের দিন দোষী সাব্যস্ত করা হবে। তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাঁকে বহু বার বিশ্রাম নেওয়ার কথা বলতেন, কিন্তু তিনি সেই উপদেশ একদিনের জন্যও গ্রহণ করেননি।

আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী উজবেগদের প্রধান আবদুল আজিজের একটি বর্ণনা থেকে জানা যায়- তাঁদের যুদ্ধ চলার সময়েও আওরঙ্গজেব নামাজের সময় শান্তভাবে তাঁর নামাজের মাদুরটি বিছিয়ে, তার উপরে হাঁটু মুড়ে বসে নামাজ পড়তেন। এই বিদ্রোহী নেতা বলেছিলেন, “এমন একজন ব্যক্তির সাথে যুদ্ধ করার অর্থ হল নিজের ধ্বংস ডেকে আনা।”

এমনকী এই বাদশাহের আয়ের একমাত্র উৎস ছিল কুরআন।

তিনি সমসাময়িক বিশ্বের সবচেয়ে ধনী সাম্রাজ্যের বাদশাহ ছিলেন, সবচেয়ে দামি মসনদে বসতেন (শাহ জাহানের আমলে খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনের মূল্য বর্তমানে ৮০৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি), অথচ রাজ তিনি কোষাগার থেকে নিজের জন্য কোনও অর্থ ব্যয় করেননি।

পরিবর্তে, তিনি ছোটবেলায় আয়ত্ত করা সুন্দর ক্যালিগ্রাফি শিল্প ব্যবহার করে কুরআনের অনুলিপি তৈরি করে আয় করতেন। সেই আয়ের অর্থ দিয়েই তিনি নিজের সমাধির বন্দোবস্ত করে গিয়েছিলেন।