আজকের প্রজন্মের জন্য হোমস্কুলিং উপকারী না অপকারী?

dreamstime_s_12247837

এমন দিন প্রায় আমাদের সবারই যায় যখন আমাদের সন্তান খেলতে খেলতে খারাপ একটা কথা উচ্চারণ করে ওঠে, বা আমাদের মেয়ে স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে ফেরে যে হিজাব পরার জন্য তার সহপাঠীরা তার সঙ্গে মিশতে চায়নি। ইমানদার মুসলমান বাবা মায়ের পক্ষে এই দিনগুলি যেন এক কঠিন পরীক্ষা। তখনই খুব বড় করে প্রশ্ন উঠে আসে, তাহলে কি বাড়িতে পড়ানো বা হোমস্কুলিং ভাল? দুনিয়ার নাপাক দ্রব্য ও অনৈতিক অবস্থার থেকে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করা তো একান্তই আমাদের কর্তব্য।

হোমস্কুলিং খুব সহজ বিষয় নয়

কিন্তু হোমস্কুলিং খুব সহজ বিষয় নয়। এটা মাথায় রাখতে হবে যে সন্তানকে সমাজে চলার মতো সবকিছুই শেখাতে হবে। আর সেটা সাধারণ স্কুলে যতটা শেখানো সহজ, হোমস্কুলিং-এ ততটা নয়। আমরা অনেকেই হোমস্কুলিং-এর সিদ্ধান্ত নিই, বিশেষ করে মুসলমান বাবা মায়েরা জীবনের ও ধর্মের শিক্ষা একসঙ্গে দেওয়ার জন্য হোমস্কুলিং এর কথা ভেবেই থাকেন। কিন্তু যে মুহূর্তে বিষয়টি শুরু করার কথা হয়, তখনই শুরু হয় নানাপ্রকার কনফিউশন। হোমস্কুলিং-এ তো আদত স্কুলের থেকে পড়ানোর সহায় বা উপায় অনেক কম থাকে। তাছাড়া শিশুকে পড়াতে হলে প্রবল ধৈর্য্যের প্রয়োজন হয়, সেই ধৈর্য্য অনেকসময়ই চাকুরিরত বাবা ও মায়ের থাকে না। এই সমস্ত ভাবনাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হোমস্কুলিং-এর সিদ্ধান্তকে পিছিয়ে দেয়। 

নিরপেক্ষভাবে দেখলে, হোমস্কুলিং-এর কতগুলো সদর্থক দিক রয়েছে, কতগুলো নেই। আগে সদর্থক দিকগুলোতে চোখ রাখা যাক…

দুর্দান্ত পাণ্ডিত্যঃ

হোমস্কুলিং এ আপনার শিশু যখন ইচ্ছে যতক্ষণ ইচ্ছে ও যেকোনও বই থেকে যা খুশি পড়তে পারবে। এর ফলে যা হয়, সাধারণ স্কুলের গতে বাঁধা সিলেবাসের বাইরে সে অনেককিছু শিখতে পারবে যা পরবর্তীকালে তার জীবনের পাথেয় হয়ে উঠবে। যেহেতু কোনও নিয়মের জালে আবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই, তাই শেখার সুযোগ অফুরন্ত। 

আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাধীনতার বিকাশঃ

হিজাব পরেছে বলে আপনার মেয়েকে হাসির খোরাক হতে হয়েছে, ফলে  একসময় সে নিজের বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করবে। মানসিকভাবে গুটিয়ে যাবে। এই ভয়টা কিন্তু হোমস্কুলিং-এ নেই। ভয়াবহ প্রতিযোগিতা বা হাসি তামাশার সম্মুখীন না হতে হওয়ায় আপনার সন্তান মানসিক শান্তিতে থাকবে। নিজের প্রশ্ন সাহসীভাবে করতে পারবে, নিজের মতামত উপস্থাপন করতে ভয় পাবে না। আত্মবিশ্বাসের এই পরিস্ফুটনে কাজ করে হোমস্কুলিং।

নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনঃ

সন্তানের স্কুল রয়েছে তাই জন্য ঘুরতে যাওয়া বাতিল করে দেওয়া তো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।  সন্তানের স্কুল, পরীক্ষা ইত্যাদির কথা ভেবে বহু বাবা মা-ই নিজেদের নানা প্রকার প্ল্যান বাতিল করেন। এর পর থাকে পরীক্ষার চাপ। এই সব বিষয়গুলি খুব সহজেই এড়িয়ে ফেলা যায় হোমস্কুলিং-এ। 

এবার আসা যাক, হোমস্কুলিং-এর কী কী ঋণাত্মক প্রভাব রয়েছে সেই কথায়,

প্রথমত, সন্তানের জন্য বাড়িতে হোমস্কুলিং চালু করা এক মস্ত বড় দায়িত্ব, নিজেদের জীবিকার চাপ সামলে সেই দায়িত্ব পালন করা অনেকসময়ই বেশ কঠিন হয়ে যায়। তাছাড়া সন্তানের জন্য সিলেবাস, বিষয়সূচি ইত্যাদি নির্ধারণ করা অভিজ্ঞতা না থাকলে অনেকসময়ই বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। একটা ভয় তো থেকেই যায় যে সঠিক শিক্ষা দেওয়া হল না। প্রথাগত শিক্ষার যে বিশ্বাসটা থাকে তা অনেকসময়ই হোমস্কুলিং এ পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত,
একাকীত্ব গ্রাস করতে পারে। প্রথাগত শিক্ষার ক্ষেত্রে বা স্কুলে বন্ধুবান্ধব, অনেক মানুষ,  শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের সঙ্গে আদানপ্রদাণের মাধ্যমে শিশু সামাজিক আচার আচরণ শেখে। তার খেলার সঙ্গী থাকে, একা লাগে না। কিন্তু হোমস্কুলিং এ এই উপায়টি নেই। বাবা মা ও শিশু, কোনও কোনও ক্ষেত্রে ভাই বোন। এতে সমস্যা যেটা হয় সেটা হল একাকীত্ব, শিশুর চিন্তাভাবনা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে মুক্তচিন্তার অভাব দেখা যায়। অনেকসময় ভাবনা চিন্তার ধরন একপেশে হয়ে ওঠে। এছাড়া খেলাধুলো ও শরীরচর্চার বিষয়টি বেশ অবহেলিত হয়।

আসলে, হোমস্কুলিং বিষয়টি সবসময় ১০০ শতাংশ কাজ করবেই, এমন কিন্তু না। কিন্তু যদি প্রচুর যত্ন নিয়ে চেষ্টা করা হয় তাহলে লাভ বই ক্ষতি হবে না।