আজানের শব্দ পরিবর্তন, শরিয়তের দৃষ্টিতে কয়েকটি মাসআলা

Four muslim men praying at dawn
© Viktoriia Panchenko | Dreamstime.com

সম্প্রতি কুয়েতের একটি আজান সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এক মুআজ্জিন তার আজানে হাইয়া আলাস সালাহ-এর স্থানে আলা সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম বলে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আজানের শব্দ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে পাকিস্তান, কুয়েত, আবর আমিরাতে। সে তালিকায় নাম লিখিয়েছে পবিত্র নগরী মক্কাও। এ ঘটনাগুলো সারা বিশ্বের মুসলমানকে হতাশ করে দিয়েছে। গোটা বিশ্বের মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন করছেন, এভাবে আজানের শব্দ পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ ইসলামে আছে কি না? রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এর কোনো নজির পাওয়া যায় কি না?

করোনা ভাইরাসের ভয়ে অনেক স্থানেই মসজিদে নামায পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ প্রশ্নও উঠেছে, হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সময় থেকে হযরত বেলাল রা. যে আজানের সূচনা করেছিলেন, তাতে শব্দাবলি না পাল্টিয়ে অন্যভাবেও মানুষকে ঘরে নামায পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা যেত। তুরস্ক ও ইরানে আজানকে পাল্টানো হয়নি। কারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ সাধনের জন্য বর্তমানে আধুনিক নানা উন্নত উপায় রয়েছে। সেগুলি ব্যবহার করেও মুসল্লিদের কিছুদিনের জন্য মসজিদে নামায আদায় না করার জন্য আবেদন করা যায়। ইসলাম কোনও সময়ই বাস্তবকে অগ্রাহ্য করে না। এমনকী প্রয়োজন হলে প্রাণ বাঁচাবার জন্য নিষিদ্ধ বস্তু ভক্ষণ করলেও কোনও গুনাহ হবে না বলে ইসলামে নির্দেশ রয়েছে।

আজান বিকৃত করা হয়েছে বলে মাতম করার আগে জানুন বুখারী, মুসনাদু আহমাদ ও সুনান নাসাই প্রভৃতি গ্রন্থে সহি হাদীসেই এভাবে আজান দেয়ার কথা এসেছে। নাফে’ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যাজনান নামক স্থানে এক শীতের রাতে ইবনে ওমর রা. আজান দিলেন। এরপর তিনি ঘোষণা করলেন, ‘তোমরা আবাসস্থলেই নামায আদায় করে নাও!’ পরে তিনি আমাদের জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বৃষ্টি বা শীতের রাতে মুয়াযযিনকে আজান দিতে বলতেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একথাও ঘোষণা করতে বলতেন যে, ‘তোমরা আবাসস্থলেই নামায আদায় করে নাও!’ (সহিহ বুখারী, মুসলিম)

অঝোর বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় রাসূল সা. বেলালকে নির্দেশ দিতেন এভাবে আজান দিতে। অবশ্য সাল্লু ফি রিহালিকুম বাক্যটি আজানের কোথায় উচ্চারণ করবে এ নিয়ে চার ইমামের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতে সবভাবেই বলার অবকাশ রয়েছে। আজানের শেষে বা মাঝে যেমন, তেমনই পরিবর্তিত আজানে বলারও অবকাশ রয়েছে বিভিন্ন মাজহাবে। দুর্যোগের কারণে জামাতে নামাজ ত্যাগের অবকাশ যেমন আছে প্রয়োজনে মসজিদে জুমা বন্ধ করার নির্দেশ আসলে সেটাও শরীয়তের দৃষ্টিতে অসম্ভব নয়। বিশেষত হানাফি মাজহাবে জুমার নামাজের জন্য মসজিদ শর্ত নয়। বড় জামাতও শর্ত নয়। ইমাম আবু ইউসুফ রহ.-এর মতে ইমাম ছাড়া মাত্র দু’জন থাকলেই জুমা আদায় করা যায়। এর অর্থ হচ্ছে প্রত্যেকে যার যার বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের নিয়েও জুমা আদায় করতে পারে ফিকহে ইসলামীর দৃষ্টিতে।

আলেম সমাজ ও পাঠকের কাছে পেশ করা হচ্ছে  বিশেষজ্ঞদের উল্লিখিত হাদীসের একটি পটভূমি।  আবদুল্লাহ ইবন্‌ হারিস এবং ইমাম মুহাম্মদ ইবন্‌ সিরিন বলেছেন যে, সাইয়েদেনা আবদুল্লাহ ইবন্‌ আব্বাস (রা.) প্রবল এক বর্ষণের দিনে মুয়াজ্জিন যখন আজান দিতে যাচ্ছেন তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আশহাদু আনা মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ’ পর ‘হাইয়্যা আল সালাহ’ বা ‘নামাযের জন্য এসো’ বলো না। বরং বলো ‘বাড়িতেই নামায আদায় করো’।
অনেকেই জুম্মার নামাযের জন্য আবদুল্লাহ ইবন্‌ আব্বাস-এর এই সিদ্ধান্তের মেনে নিতে পারলেন না। ফলে তিনি বললেন, একজন যিনি আমার থেকেও অনেক অনেক গুণ উচ্চস্তরের তিনি স্বয়ং এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘জুম্মার নামায আদায় করা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম। কিন্তু আমি এটা পছন্দ করব না যে তোমরা বৃষ্টি এবং কর্দমাক্ত পথে বেরিয়ে আসবে’। (বুখারি) সাইয়েদেনা আবদুল্লাহ ইবন্‌ আব্বাস সেই সব সাহাবিদের অন্যতম যিনি পবিত্র কুরআন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন। আল্লাহর নবী তাঁর জন্য এ বিষয়ে দোয়া করেছিলেন। সেই তিনি লোকেদের বললেন, ‘তোমরা ঘরেই যোহরের নামায আদায় করো ।’
সাইয়েদেনা আবদুল্লাহ ইবন্‌ আব্বাসের ছিল অতুলনীয় তাকওয়া এবং তাওয়াকুল (আল্লাহর ওপর পরম নির্ভরতা) যা হয়তো আমাদের পক্ষে কখনই অর্জন করা সম্ভব নয়।
আল্লাহর নবীর (অপার শান্তি বর্ষিত হোক তার ওপর) সাহাবারা বলেন, রাসূল মুহাম্মদ সা. কখনই ২টো বিষয়ের মধ্যে কোনও একটিকে অনুমোদন করতেন না, যদি না তা এই দুয়ের মধ্যে যেটি মানুষের জন্য পালন করা সহজসাধ্য হতো। আল্লাহর নবী কখনই মানুষকে কষ্ট বা তকলিফের মধ্যে ফেলা পছন্দ করতেন না।
অনেকে বলছেন কুয়েত বা অন্য আরব রাষ্ট্রগুলি সহি বুখারির এই হাদিসের সূত্র ধরেই আযানের শব্দ ‘হাইয়্যা আলাস সালাহ’ (নামাযের জন্য এসো) পরিবর্তন করে বলছেন, ‘আল সালাত ফি বুইউতিকুম’ অর্থাৎ ‘তোমাদের বাড়িতেই নামায পড়ো’।
অপরদিকে অনেক আলেম ও মুফতি এবিষয়ে যুক্তি দিয়েছেন যে ‘উপরোক্ত হাদিসটি ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা -তুফান প্রভৃতি বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । তবে করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে আজানে এই হাদিসটি প্রয়োগ করা হয়তো সঠিক হবে না।’