আত্মত্যাগের এক অনন্য ইবাদত কোরবানি

Homme Musulman lève ses main dans le désert
© motortion | Dreamstime.com

কোরবানি, প্রতিবছর মুসলিম ধর্মাবলম্বী পালনকারীরা আত্মত্যাগের বিনিময়ে পালন করে থাকে। প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোরবানি পালন হয়ে থাকে। আসলে কোরবানির মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মত্যাগ করা। সকল নেতিবাচকতা বা খারাপ বিষয় গুলোকে বর্জন করা, ত্যাগ করা। এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে মানুষের ভেতরের যে পশু রয়েছে মূলত সেটাকেই কোরবানি দাও। অর্থাৎ মনের পশুকে জবাই দেওয়ার মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে ভেতরের মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করাই হচ্ছে কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য।

কোরবানির আত্মত্যাগের পরীক্ষা অত্যন্ত সফলভাবে সফল হয়েছিলেন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম। তাকে খলিলুল্লাহ বা আল্লাহর প্রিয় বন্ধু উপাধিতে উপাধিত করা হয়েছিল।

আসলে আত্মত্যাগের নামই হচ্ছে কোরবানি, মহান আল্লাহ তাআলার কাছে অনেক বেশী মর্যাদাকর। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাকে কোরবানির আত্মত্যাগের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলেন। এবং সেই পরীক্ষায় তিনি শতভাগ পাস করেছে। যুগে যুগে কালে কালে এই পরীক্ষায় যারা পাস করেছেন তারাই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন।

পবিত্র কোরআন শরীফে মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন: ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ কারার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। অতএব তোমাদের আল্লাহ তো একমাত্র আল্লাহ সুতরাং তাঁরই আজ্ঞাধীন থাক এবং বিনয়ীগণকে সুসংবাদ দাও।’ (সূরা: হজ, আয়াত ৩৪)।

আল্লাহ আরও বলেন: ‘হে রাসূল! আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না।

সে (কাবিল) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন (হাবিল) বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।

সে (হাবিল) বলল, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হাত বাড়াও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হাত বাড়াবো না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ (সূরা: মায়েদা, আয়াত ২৭-২৮)।

আসলে মূল বিষয়টি কি? মূল বিষয়টি হচ্ছে, মানুষের মনের সর্বোচ্চ ত্যাগই হচ্ছে কোরবানি। কারণ আপনার কোরবানিকৃত পশুর রক্ত, পশম, হার, মাংস কোনকিছুই আল্লাহতালার কাছে পৌঁছায় না। তার কোন কিছুরই প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা মানুষের অন্তরকে মনকে পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি দেখেন মানুষের অন্তর। যার দৃষ্টান্ত হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। তিনি ‘কোরবানি’র নির্দেশকে হৃদয় দিয়ে উপলব্দি করেছিলেন বলেই তা বাস্তবে সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর কোরবানিকে কবুল করেছিলেন।

এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা বলেন: ইব্রাহিম বলল, ‘নিশ্চয়ই আমি এ স্থান ছেড়ে প্রতিপালকের পথে যাব। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।’ এরপর ইব্রাহিম প্রার্থনা করল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করো!’ আমি তাকে এক ধীরস্থির বুদ্ধিমান পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।

ছেলে যখন পিতার কাজকর্মে অংশগ্রহণ করার মতো বড় হলো, তখন ইব্রাহিম একদিন তাকে বলল, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে কোরবানি দিতে হবে। এখন বলো, এ ব্যাপারে তোমার মত কী? ইসমাইল জবাবে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। ইনশাল্লাহ! (আল্লাহর ইচ্ছায়) আপনি আমাকে বিপদে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবেই পাবেন।’

পিতাপুত্র উভয়েই নিজেদের সমর্পিত করল এবং ইব্রাহিম পুত্রকে জবাই করার জন্যে কাত করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে বললাম, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যি সত্যি পালন করলে!’ এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি।

মনে রেখো, এ ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে সুযোগ দিলাম এক মহান কোরবানির। পুরো বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখলাম প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ইব্রাহিমের প্রতি সালাম। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি।(সূরা: সাফফাত, আয়াত ৯৯-১১০)।

হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের এই আত্মত্যাগের নিদর্শন মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর জিলহজ্ব মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখে তিন দিনের যেকোনো একদিন কোরবানি পালন করে থাকেন। কোরবানির সময় সুন্দর স্বাস্থ্যবান পশুকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি দেয়া হলেও মূলত মনের পশুত্বকে কোরবানি হলো এই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য।

পরিশেষে আমরা এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে শুধুমাত্র কোন পশুকে জবাই করার মাধ্যমেই কোরবানি পালিত হয় না। কোরবানির কবুলিয়াতের জন্য অন্তরের পশুত্বকে কোরবানির দেওয়াই হচ্ছে এর মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য অন্তরের ভেতর এর সকল নেতিবাচকতা বা খারাপ দিক গুলো কে বর্জন করাই হচ্ছে কোরবানি। মহান রাব্বুল

আলামিন আমাদের অন্তরের ভেতরের পশুত্ব তাকে বর্জন করে ত্যাগ করে কোরবানি দিয়ে রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের পথকে সুগম করে দিক, এ দোয়াই আমরা করি।