আত্মার অক্সিজেন হল ইবাদত

© Elmar84 | Dreamstime.com

“ইবাদত অন্তরের অক্সিজেন”। উস্তাদ ইয়াসমিন মোগাহেদ  বিভিন্ন আত্মিক বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় বেশ কয়েকবার এই উক্তি করেছেন । আমাদের শরীর বেঁচে থাকার জন্য যেমন অক্সিজেনের প্রয়োজন, তেমনি আমাদের অন্তর বেঁচে থাকার জন্য সালাতের প্রয়োজন যাতে আমাদের ঈমান বেঁচে থাকতে পারে।

আপনার সালাত আপনার অক্সিজেন

এটি কিছুক্ষণের জন্য আপনি চিন্তা করুন।

আপনি কতক্ষণ আপনার নিঃশ্বাস বন্ধ রাখতে পারবেন?

ইন্টারনেটে একটি অনুসন্ধানের দ্বারা খুব দ্রুতই আমরা জানতে পারব যে, মানুষ ৩০ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিটের মধ্যে যে কোনো কিছুর জন্য তাদের শ্বাস ধরে রাখতে পারে। এর চেয়ে বেশিক্ষণ ধরে রাখলে কারও কারও মৃত্যু আসন্ন হওয়ার সম্ভবনা আছে।

আমাদের ঈমানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত দৈনিক ৫ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করা। আমরা যারা নিয়মিত সালাত আদায় এড়িয়ে যাচ্ছি, এটি রীতিমত আমাদের দম আটকে যাওয়ার মতো একটি বিষয়।

যখন আমরা কোনো সমস্যায় পড়ি, তখন অক্সিজেন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

আপনার হয়ে কেউ এটি করে দিতে পারবে না

আপনি আপনার বাবা-মাকে এটি করার জন্য বলতে পারবেন না। আপনি আপনার বন্ধুদেরকে এটি করার জন্য বলতে পারবেন না। এটি করে দেওয়ার জন্য আপনি কাউকে অর্থ প্রদানও করতে পারবেন না। আপনাকে নিজেকেই এটি করতে হবে। এটি শ্বাস-প্রশ্বাস এবং ইবাদত উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের বেঁচে থাকার নিমিত্তে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি একটি স্বতঃ প্রনোদিত কাজ। এটা করার জন্য আপনাকে চিন্তাও করতে হয় না এবং এটা করতে আপনি কখনও ভুলেও যান না। আমাদের ইবাদতের ক্ষেত্রেও একই কথা হওয়া উচিত। এটি আমাদের জীবনের এমন অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হওয়া উচিত যা আমাদের অভ্যাসের মত হয়ে যায় এবং এটির প্রতি আমাদের অন্তরের টান অনুভুত হয়। অলস হয়ে উঠলে আমাদের অস্বস্তি বোধ করা উচিত। ইবাদত আল্লাহর সাথে আমাদের সংযোগের মাধ্যম। ইবাদত নেই তো কোনো সংযোগ নেই। অক্সিজেন নেই তো কোনো জীবন নেই।

ডুবে যাওয়া

জীবন একটি পরীক্ষা। আমাদের মধ্যে কিছু লোককে হালকাভাবে পরীক্ষা করা হয়, আর বাকিদের আরও বেশি সমস্যা দিয়ে পরীক্ষা করা হয় । এগুলো সব আল্লাহর পরিকল্পনারই একটি অংশ। যেমন সুরা বাকারার ১৫৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ প্রদান করো সবরকারীদের।”

আপনি কি কখনোও এই কথাগুলো শুনেছেন, “অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হওয়া” অথবা “সাঁতার কাটো নয়ত ডুবে মরো”?

যখন কেউ অপ্রত্যাশিত কোনো কষ্টের সম্মুখীন হয় তখন আমরা এই কথাগুলি ব্যবহার করি। উভয় কথাটিই এইদিকে ইঙ্গিত করে যে, পারে পৌঁছিয়ে তবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে হবে। অন্য কথায়, আপনার অসুবিধা কাটিয়ে উঠুন এবং টিকে থাকুন।। ব্যর্থতা মানেই ডুবে যাওয়া।

ডুবে যাবেন নাকি সাঁতার কাটবেন?

এমন সময়ও হয়ত আসবে যখন আল্লাহ আমাদের ঈমানকে পরীক্ষা করার জন্য আমাদেরকে  অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত করবেন। তখন কি আমরা ডুবে যাব নাকি সাঁতার কাটব? জীবন যখন কঠিন হয়ে ওঠে তখন কি আপনি সালাতকে অবহেলা করেন নাকি আপনি আরও বেশি বিশ্বাসের সহিত সালাত আদায় করেন এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যান?যদি আপনি আপনার সালাতকে অবহেলা করার দিকটি বেছে নেন তবে আপনি আপনার অক্সিজেন সরবরাহের পথ বন্ধ করে দিচ্ছেন। স্পষ্টতই, তখন বিষয়গুলি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।আপনার সংগ্রাম আরও তীব্র হবে। কিন্তু আপনি যদি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করার দিকটি বেছে নেন, সমস্যার সময়ে তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন, তাহলে অবশেষে আপনি অতল গহ্বর থেকে উঠবেন এবং সেই বাতাসের বয়ে যাওয়াকে উপভোগ করবেন যা স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে।

দীর্ঘঃশ্বাস নিন

তাদের ব্যপারে কি হবে যারা প্রত্যহ ৫ ওয়াক্ত সালাত বিশ্বস্ততার সাথে আদায় করেন? যদি তারা ইতিমধ্যে নিঃশ্বাস নিয়েই থাকেন তবে জীবনের অসুবিধাকে তাদের কীভাবে গ্রহণ করা উচিত? আপনি যদি কখনও শ্বাসকষ্ট বা প্যানিক আক্রমণ (বা এমনকি সাধারণ সর্দি) ইত্যাদির সম্মুখীন হন তবে এটি কিন্তু শ্বাস না নেওয়ার কারণে নয়। কখনও কখনও জীবন আমাদের এমন বিপর্যয়ের সম্মুখীন করে যা রীতিমত আমাদের শ্বাসরুদ্ধ করে দেয়। সেক্ষেত্রে আমাদের কী পরামর্শ দেওয়া হয়েছে? “সুন্দরভাবে দীর্ঘঃশ্বাস নিন। আপনার নাক দিয়ে, আপনার মুখ দিয়ে”। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমরা কীভাবে শ্বাস নিই তার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিই। জীবনের ক্ষেত্রেও এটি একই রকম। যখন জীবনধারণ অনেক কঠিন হয়ে পড়ে তখন আপনার ইবাদতের দিকে বিশেষ মনোযোগ দিন। বিশেষত, কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আমাদের সমস্যাগুলির সমাধান করতে বলেছেন।

যেমনটি বলা হয়েছে, “ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে (আল্লাহর নিকট) সাহায্য প্রার্থনা করো। অবশ্য তা যথেষ্ট কঠিন। তবে কেবলমাত্র বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সহজ”। [ আল কুরআন-২:৪৫ ]

আরও বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে (আল্লাহর নিকট) সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন”। [ আল কুরআন- ২:১৫৩ ]

একটি আধ্যাত্মিক অক্সিজেন মাস্ক

ব্যক্তিগতভাবে, আমি কয়েকবার আতঙ্ক এবং উদ্বেগের সম্মুখীন হয়েছি। এতে আমার নিঃশ্বাস ত্রুটিযুক্ত হয়ে গেছিল এবং আমি শ্বাসকষ্ট অনুভব করছিলাম। এই সঙ্কটময় মুহূর্তে আমি আল্লাহকে স্মরণ করি, ধীরে ধীরে তাঁর নামগুলি উচ্চারণ করি অথবা কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করি। এটি আমার মনোযোগ আকৃষ্ট করে এবং আমার শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। আমি এটিকে একটি ‘আধ্যাত্মিক অক্সিজেন মাস্ক’ হিসাবে ভাবতে পছন্দ করি। এক্ষেত্রে, ইবাদত আমাকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়; আমার শরীর শান্ত হতে শুরু করে এবং আমার হৃদয় থেকে এটি অনুভূত হয় যে, আমার যতই উদ্বেগ হোক না কেন, আল্লাহ আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করবেন এবং স্বস্তি দিবেন।

সালাতের মিষ্টতা

আমাদের প্রতিদিনের রুটিন থেকে সালাত আদায় একটি নির্ধারিত সময়ে হয়। আমরা অজু করি, আমাদের বেশভূষাকে পরিপাটি করি, অতঃপর সালাত আদায়ের জন্য নীরবে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ি। ইবাদত সর্বদাই থাকবে, এটি সর্বদাই আমাদের আশ্রয়স্থল স্বরূপ, আল্লাহর সাথে আমাদের সময়টি কেবল (আত্মিক) শ্বাস নেওয়ার জন্য। যখন আমরা দুঃখিত হই, ভীত হই ও উদ্বিগ্ন হই তখন ইবাদত আমাদের ঐ মুহূর্তের মত প্রশান্তি দান করে,  যেমন পানিতে ডুবে যাওয়া কেউ পারে ফিরে আসতে পেরে বাতাসের স্নিগ্ধ বয়ে যাওয়াকে উপভোগ করে। আপনাকে আল্লাহর চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না, আপনি যখন সালাতে তাঁর কাছে প্রার্থনা করেন, তখন আপনাকে এটা নিশ্চিত করা যেতে পারে যে, আপনার অনুভূতি প্রকাশের জন্য আপনাকে কোনো শব্দ প্রয়োগের প্রয়োজন নেই, কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশও এখানে নেই। তাই যখন আপনি সালাত আদায়ের জন্য জায়নামাজে দাঁড়াবেন, তখন আপনার সমস্ত উদ্বিগ্ননতাকে মুছে ফেলুন, আপনার সমস্ত বোঝাকে ঝেড়ে ফেলুন।

দিন বা রাতের যেকোনো সময় প্রার্থনা করুন:

“জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্তি খুঁজে পায়” (আল কুরআন-১৩:২৮)