আদর্শ সমাজ গড়তে ভরসা আজকের মুসলমান যুবসম্প্রদায়

Muslim businessman and businesswoman partner discussing work load, outdoor setting collaboration
© Ahmad Hafiz Ismail | Dreamstime.com

মুসলিম যুবসমাজের ভুমিকা অনেক। যুবসমাজকেই সব দায়িত্ব নিতে হবে। শিকড় আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। দেশ, জাতি ও সমাজ গঠনে যুবসমাজের ভূমিকা অপরিসীম। থেমে থাকলে চলবে না। মুসলিম জাতির ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ।
বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মাদ (সা.) বিশ্বমানবতার কল্যাণে তরুণদের নিয়েই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংগঠন ‘হিলফুল ফুযুল যুব সংঘ’ গঠন করেছিলেন। হজরত মোহাম্মাদ (সা.) যখন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে মাঠে নেমেছেন সর্বাগ্রে তরুণরাই এগিয়ে এসেছেন। হজরত আবু বকর (রা.), হজরত উমর (রা.) তরুণ বয়সে ইসলাম কবুল করেন।
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল (রা.) ছিলেন তরুণ। হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পাষন্ড নমরুদের তৈরিকৃত আগুনে নিক্ষিপ্তি হয়ে ছিলেন তিনি ছিলেন তরুণ। হজরত ইউসুফ (আ.) যখন কারাগারে ছিলেন তখন তিনি তরুণ ছিলেন। হজরত ইউনুস-কে (আ.) যখন সমুদ্রের মাছ গিলে ফেলে তখন তিনি ছিলেন তরুণ। হজরত দাউদ (আ.) যখন জালিম শাসক জালুতকে হত্যা করেন তখন তিনিও ছিলেন তরুণ।

দেশ গঠনে ছাত্র বা যুবসমাজের ভূমিকা

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ বিশ্বের মানচিত্রে সার্বভৌম বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তার মূলে কাজ করেছে জাগ্রত ছাত্র সমাজের গৌরবদীপ্ত সংগ্রাম। তাই দেশ গঠনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারাই দেশ গঠনের সুকঠিন পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে পারে। ছাত্র জীবন মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। কারণ, ছাত্রজীবনই ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত রচনা করে। ইমারতের ভিত্তি সুগঠিত না হলে যেমন ইমারত শক্ত হয় না। তেমনি বাল্যকালে উপযুক্ত শিক্ষা লাভ না করলে মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনও সুগঠিত হয় না। এ দিকটার প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রেখেই ছাত্রদের অগ্রসর হতে হবে। তবে লেখা-পড়ার সাথে সাথে ছাত্রদের দেশ গঠনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করা বাঞ্ছনীয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “তরুণ বয়সের ইবাদতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। একজন বৃদ্ধের ইবাদতের চেয়ে আল্লাহ বেশী খুশি হন, সে তরুণ ও যুবকদের ইবাদতে, যারা যৌবন বয়সে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে”। -আবু দাউদ

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, “হাশরের ময়দানে মানুষকে পাঁচটি বিষয়ের হিসাব দিতে হবে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, যৌবন কাল কিভাবে ব্যয় করেছে”। – মিশকাত
যৌবনকালটি অত্যন্ত মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে রয়েছে তরুণ সমাজের আত্মত্যাগ। তরুণদের রক্তের বিনিময়ে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে অসংখ্য রাজ্যপালের রাজ্য সীমা। আজও ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে তরুণদের আত্মত্যাগের বহু স্মৃতি। যুদ্ধের ময়দানে তো তরুণদের ভূমিকা অনস্বীকার্যই। বদরের যুদ্ধে হযরত ‘মুআয ও মুআওয়িয’ নামক দু’জন তরুণ সাহাবীই ইসলামের ঘোর দুশমন আবু জাহিলকে হত্যা করেছিলেন।
খায়বার বিজয়ী বীর সেনানী শে’রে খোদা হযরত আলী (রা.) যিনি কামূছ দুর্গের লৌহ কপাট উপড়িয়ে ফেলে এক হাতে নিয়ে এটাকে যুদ্ধের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেন, তখন তিনিও ছিলেন তারুণ্যদীপ্ত যুবক। মু’তার যুদ্ধে সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ তিনিও ছিলেন তরুণ। স্পেন বিজয়ী সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ তিনিও ছিলেন তরুণ। এ ছাড়া অন্যান্য যুদ্ধের সেনাপতি হযরত আবু বকর (রা.), আলী (রা.), হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত জাফর (রা.), হযরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) হযরত তাইয়ার (রা.), হযরত যুবায়ের (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.), হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)সহ প্রায় সাহাবায়ে কেরামই ছিলেন তরুণ ও যুবক।
এমনিভাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে তরুণদের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের কথা। ভারত বিজয়ী সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসেম যখন ভারতে ইসলাম প্রচার করেন তখন তিনিও ছিলেন তারুণ্যদীপ্ত যুবক। কুতাইবা বিন মুসলিম যিনি এশিয়ার মধ্যে ইসলামের বিস্তার ঘটান, তখন তিনিও ছিলেন স্বল্প বয়সী। বাংলাদেশেও যে সকল আলেম-উলামা, ওলী-আওলীয়া ইসলামের প্রচার-প্রসার করেন, তাদের প্রায়ই ছিলেন স্বল্প বয়সী যুবক।
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তরুণদের পদচারণায় আজ মুখরিত। বিশ্বজুড়ে চলছে আজ তরুণদের জয়-জয়কার। তরুণরা ইচ্ছে করলেই তাগুতি সমাজ ভেঙ্গে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ করতে পারেন। কাজেই তরুণ সমাজের কাছে প্রত্যাশা, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করতে আপনারা ঈমানী চেতনা নিয়ে আরও নির্ভীকভাবে এগিয়ে আসুন।
যোগ্য নেতৃত্ব ও কর্মতৎপরতার মাধ্যমে উন্নত দেশ গঠন এবং দেশের উন্নতি-অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে তরুণদের ভূমিকা অপরিসীম। এটা সর্বজন বিদিত যে, কেবল তরুণরাই পারবে সুন্দর, সুখী ও সমৃদ্ধশালী আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ করতে। ইসলামে তারুণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তারুণ্য মানবজীবনের অমূল্য এক সম্পদ। এটা জীবন মহীরুহের বিকশিত চারাগাছ। তারুণ্য কাঁচা বয়সের একটি উদ্দীপনার নাম। তারুণ্য অর্থ হচ্ছে বাঁধা না মানা। তীব্র স্রোতে উজান সাঁতারে পাড়ি দেয়াই তারুণ্যের ধর্ম। চেতানাদৃপ্ত তরুণরা যখন জেগে ওঠে তখন সকল প্রতিবন্ধকতার সকল চড়াই-উৎরাই মাড়িয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে আনে। বিজয়ের পুষ্পমালা তাদের পদচুম্বন করে। ইতিবাচক অর্জনসহ সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাদের অবদান। তারুণ্য তথা যৌবনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ইহকালে কল্যাণ ও পরকালীন জীবনে মুক্তির বিশাল বাগিচায় উপনীত হওয়া যাবে।