SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

আধুনিক ভূগোলের যাত্রা শুরু হয়েছিল মধ্যযুগের ইসলামে

ইতিহাস ২২ এপ্রিল ২০২০
আধুনিক ভূগোলের যাত্রা
ID 123256998 © Ievgenii Tryfonov | Dreamstime.com

প্রাচীন ভূগোল ও মানচিত্রবিদ্যায় বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার তুলনায় চিত্রকলার চর্চা ছিল অধিক। যদিও জোর্তিবিজ্ঞানীগন তাদের অধ্যয়ন ও গবেষণার দ্বারা পৃথিবীর আকৃতি ও গঠন প্রভৃতি ভূগোলের সাধারণ ধারণাসমূহের তত্ত্ব প্রদানে সক্ষম হয়েছিলেন, প্রাচীন ভূগোলের অধিকাংশ আলোচনাই ছিল কাল্পনিক। রূপকথা ও বিচিত্র ধরনের ছেলেভুলানো গল্পে পরিপূর্ণ ছিল প্রাচীন ভূগোলের পাঠসমূহ।

বর্তমানে যে সাতটি মহাদেশে পৃথিবী বিভক্ত, তা এক মুসলমান ভূগোলবিদের নির্ভুল প্রচেষ্টার ফসল। মুহাম্মদ মুসা আল খাওয়ারিজমি। বাদশাহ মামুনের রাজত্বকালে আনুমানিক ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে এই প্রতিভাবান মনীষী পারস্যের খোরাসানে জন্মগ্রহণ করেন। তখন ছিল মুসলিম জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উত্কর্ষের যুগ। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর ছিল অনন্য প্রভাব। তাঁর সম্পর্কে বিশিষ্ট বীজগণিতবিদ লিওনার্দো ফি ফোন্সি বলেছেন, ‘তিনি আরবদের কাছে বড় রকমের ঋণী। তিনি মিসর, সিরিয়া, গ্রিস, সিসিলি ইত্যাদি ভ্রমণ করেছিলেন এবং সেখানে আরবদের কাছে ভূগোল ও জ্ঞানের অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।’ এই বিজ্ঞানী আরবদের পদ্ধতিকে পিথাগোরীয় পদ্ধতি অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

আধুনিক ভূগোলের সূচনাঃ

টলেমির ‘জিওগ্রাফি’র ওপর ভিত্তি করে মুসা আল খাওয়ারিজমি ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সুরত আল আরদ’ নামে ভূগোলবিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বইটিতে তিনি ভূমধ্যসাগর, আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগর সম্বন্ধীয় টলেমির ভুলগুলো সংশোধন করেন। ‘সুরত আল আরদ’-এর একটি কপি বর্তমানে ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

দ্বাদশ শতাব্দীতে, আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ আবদুল্লাহ বিন ইদরিস আল-হামুদি আল-হাসানি ভূগোলবিদ্যার ক্ষেত্রে প্রচলিত কাল্পনিক ধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ভূগোল চর্চার ক্ষেত্রে এক নতুনধারার জন্ম দেন। তার এই বৈপ্লবিক ধারাই শেষ পর্যন্ত আমাদের আধুনিক ভূগোল চর্চার ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শন করে। তথ্য-প্রযুক্তির আধুনিক এই যুগে আমাদের গন্তব্য ঠিকঠাক খুঁজে বের করার জন্য যেমন গুগল ম্যাপ বা জিপিএস ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে, তেমনি আগের দিনেও জাহাজ পরিচালনা, মরুভূমিতে পথ চলা, যুদ্ধের পরিকল্পনা গ্রহণ ইত্যাদি কাজে মানচিত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হতো। সেই সময় সিসিলের রাজা দ্বিতীয় রজার্স পৃথিবীর নিখুঁত মানচিত্র অঙ্কনের জন্য আল ইদ্রিসের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।

১১০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্পেনে জন্মগ্রহণ করেন। এই মহামনীষী শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে মাত্র ১৭ বছর বয়সে বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছিলেন। ব্যাপক ভ্রমণের ফলে তিনি সমসাময়িক পৃথিবী সম্পর্কে এত ব্যাপক জ্ঞানার্জন করেছিলেন। তার ভ্রমণে তিনি ইসলামের বিজয় অভিযানের পথসমূহে পুনরায় পদচারণ করেন; সেই যোদ্ধাদের পথ যে যোদ্ধারা ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেষে নতুন বিশ্বাসের প্রচার করেছিলেন। পশ্চিমের আটলান্টিক সাগরের পাড়ে সমুদ্র দ্বারা বাধা না পাওয়া পর্যন্ত যাদের ঘোড়া থামেনি। বলা হয়, পশ্চিমের মাদেইরা ও ক্যানারি দ্বীপ পর্যন্ত আল ইদ্রিস ভ্রমণ করেন। আটলান্টিক সাগরের বিশালতায়ই তিনি শেষ পর্যন্ত থামতে বাধ্য হন।

বিশ্বকোষ রচিত হয়…

আল-ইদ্রিসের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ও পর্যটক হিসেবে তার খ্যাতির কথা জেনে সিসিলি দ্বীপের নর্মান শাসক দ্বিতীয় রজার তাকে তার রাজ্যে আমন্ত্রণ জানান। ভূগোলের প্রতি রাজার অত্যাধিক আগ্রহ তাকে অধিকাংশ সময়ই ব্যস্ত রাখতো ভূগোলবিদ্যার চর্চায়। ফলে তিনি তার নিজ রাজ্য শাসনের সময়ই পেতেননা। ১১৫৪ সালে রাজা রজারের মৃত্যুর পূর্বে আল-ইদ্রিস তৎকালীন পরিচিত পৃথিবীর একটি মানচিত্র তৈরি করেন। এই মানচিত্রটি তিনি তার বিশ্বকোষীয় কর্ম ‘কিতাব নুজহাত আল-মুশতাক ফি ইলখতিরাক আল-আফক’ অনুসরণে তৈরি করেন। রাজা রজারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই বিশ্বকোষটি রচিত হওয়ায় একে অনেক সময় ‘কিতাব আর-রুজারি’ বলেও উল্লেখ করা হয়।

১৫৯২ সালে ইউরোপে প্রথম এই পুস্তকটি সংক্ষিপ্তরূপে রোম হতে প্রকাশিত হয়। ১৬১৯ সালে প্রথম এটির ল্যাটিন অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকে তিনি বিভিন্ন স্থানের ৭০টি মানচিত্র এবং দুই হাজার ৫৫৮টি প্রসিদ্ধ ভৌগোলিক স্থানের বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। তাতে মরুভূমি, বন, সমুদ্রপথ প্রভৃতিকে আলাদাভাবে বোঝানোর জন্য আলাদা বর্ণের ব্যবহার করেছিলেন। এই মানচিত্রে ডিগ্রি, ল্যাটিচিউড প্রভৃতি নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, যা আধুনিক যুগের মানচিত্রাবলির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে। এ সম্পর্কে ‘সাগর ও আমেরিকা বিজয়ে মুসলিম’ গ্রন্থে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ বাসার মঈনউদ্দীন বলেন, ‘আল ইদ্রিসের মানচিত্র এতটাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল যে সমগ্র ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা তাঁর মানচিত্রকে ওয়ালম্যাপ হিসেবে ব্যবহার করত।’ এ ছাড়া তিনি রাজা রজার্সের জন্য রৌপ্যের পাত্রে ভূমণ্ডলের একটি মানচিত্র অঙ্কন করে দিয়েছিলেন।