আপনার অন্তর সুস্থ, মৃত নাকি অসুস্থ, তা জানুন

anna-kolosyuk-4R6pg0Iq5IU-unsplash
Fotoğraf: Anna Kolosyuk-Unsplash

অন্তরকে যেমন জীবিত বা মৃত বলে বিবেচনা করা যেতে পারে, তেমনি এটিকে নিম্নলিখিত তিন প্রকারের একটি হিসাবেও বিবেচনা করা যেতে পারেঃ

সুস্থ অন্তর

কিয়ামতের দিন যারা সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে কেবল তারাই মুক্তি পাবে। আল্লাহ বলেনঃ

“যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন উপকারে আসবে না, কিন্তু সে ব্যতীত যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে” (আল কুরআন-২৬:৮৮-৮৯)

সুস্থ অন্তরের সংজ্ঞা নিম্নলিখিতভাবে দেওয়া হয়ে থাকেঃ

“এটা হলো এমন অন্তর যা আল্লাহর আদেশ মান্য করে প্রশান্তি পায় এবং আল্লাহর কোনো আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করলে উদ্বিগ্ন হয়। ফলস্বরূপ, সুস্থ অন্তরের অধিকারী ব্যক্তির জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সকল আদেশ মান্য করা সহজ হয় এবং অমান্য করা কষ্টকর হয়।

সুস্থ অন্তরের পরিসেবা একচেটিয়াভাবে স্বেচ্ছায় এবং ভালোবাসার সাথে, সম্পূর্ণ নির্ভরতার সাথে, সমস্ত বিষয় অর্পণের মাধ্যমে, ভয়, আশা এবং আন্তরিক উত্সর্গের সাথে আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত। যদি এটি কাউকে ভালোবাসে, তবে এই ভালোবাসা আল্লাহর জন্যই হয়। যদি এটি কাউকে ঘৃণা করে তবে এই ঘৃণা করা আল্লাহর জন্যই হয়। যদি এটি কাউকে প্রদান করে, তবে এই প্রদান করা আল্লাহর জন্যই হয়। যদি এটি কাউকে বাধা দেয় তবে এই বাধা দেওয়া আল্লাহর জন্যই হয়।

সুস্থ অন্তরের অধিকারী ব্যক্তির সকল কাজ, ভালো লাগা বা অপছন্দ হওয়া সবকিছুর ভিত্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আদেশের সাথে সম্পর্কিত। আল্লাহ বলেনঃ

“হে ঈমানদারগণ! তোমারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের হুকুমের আগে অগ্রণী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ” (আল কুরআন-৪৯:১)

মৃত অন্তর

এটি সুস্থ অন্তরের বিপরীত। এটি তার পালনকর্তাকে চেনে না এবং তাঁর আদেশ অনুসারে তাঁর ইবাদতও করে না, তাঁর পছন্দ বা সন্তুষ্টির প্রতি এর কোনো খেয়াল থাকে না। এটি তার নিজের অভিলাষ এবং আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ডুবে থাকে, এমনকি যদি এগুলি আল্লাহর অসন্তুষ্টি এবং ক্রোধের কারণ হয় তবুও।

এটি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর ইবাদত করে এবং এর ভালবাসা ও ঘৃণা, এবং দেওয়া ও বিরত থাকা সবকিছুই তার আবেগ থেকে উদ্ভূত হয়। এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বিবেকই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপন্ন হয়। আকাঙ্ক্ষা এবং লালসাই এটিকে পথ দেখায়। নিজের অজ্ঞতাকেই এটি পথপ্রদর্শক বানিয়ে নেয়।

পার্থিব উদ্দেশ্য নিয়েই মৃত অন্তর উদ্বেগের সাথে নিমগ্ন থাকে। এটি তার নিজস্ব কৌতূহল এবং ভালোবাসার মধ্যেই ডুবে থাকে। আল্লাহ এবং আখিরাতের দিকে দূর থেকে যখন এটিকে ডাকা হয় তখন এটি এই উপদেশে সাড়া দেয় না এবং এর পরিবর্তে তা শয়তানের চক্রান্তমূলক পদক্ষেপগুলির অনুসরণ করে।

এ জাতীয় অন্তরের মানুষের সাথে মেলামেশা করলে এবং সখ্যতা রাখলে তা আপনার অন্তরকেও অসুস্থ বানিয়ে দেবে। এদের সাথে বেঁচে থাকার অর্থ বিষ গ্রহণ করা এবং এদের সাথে বন্ধুত্ব করার অর্থ একেবারে ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

অসুস্থ অন্তর

এটি এমন অন্তর যেটি এখনও জীবিত আছে এবং ভালোর পাশাপাশি কিছু মন্দেরও সংমিশ্রণ ঘটেছে। এটি এক মুহুর্তে ভালোর দিকে আকৃষ্ট হয় এবং অপর মুহূর্তে মন্দের দিকে আকৃষ্ট হয় এবং এই দুটির মধ্যে যেটি তার অন্তরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি সেদিকে পরিচালিত হয়। আল্লাহর প্রতি ভালবাসা, তাঁর প্রতি ঈমান, তাঁর প্রতি আন্তরিকতা এবং তাঁর উপর নির্ভরতা এই অন্তরে বিদ্যমান থাকে এবং এগুলিই এটিকে বাঁচিয়ে রাখে।

এটির মধ্যে কামনা-বাসনা ও আনন্দেরও আকুল আকাক্ষা থাকে এবং এগুলিকে এটি পছন্দ করে এবং এগুলি অনুভব করারও চেষ্টা করে। এটি আত্ম-প্রশংসায় পূর্ণ থাকে, যা এটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এটি দু’জন আহ্বানকারীর ডাক শোনেঃ একটি এটিকে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের দিকে ডাকে; এবং অন্যটি এটিকে এই দুনিয়ার মায়াজালের দিকে ডাকে। এদুটির মধ্যে যেটি তার অন্তরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এটি সেদিকে পরিচালিত হয়।

প্রথম অন্তরটি জীবিত, এটি আল্লাহর হুকুমের সামনে নত, নম্র, সংবেদনশীল এবং সচেতন; দ্বিতীয়টি ভঙ্গুর এবং মৃত; এবং তৃতীয়টি নিরাপত্তা ও ধ্বংসের মধ্যে দোদুল্যমান।

ইমাম গাজালীর “আত্মার শুদ্ধি” থেকে এটি উদ্ধৃত করা হলো

 

আবু হামিদ আল-গাজালী সম্পর্কে…

আবু হামিদ আল-গাজালী (১০৫৮-১১১১) একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী ফিকাহবিদ, ধর্মতত্ত্ববিদ এবং দার্শনিক।

ইমাম গাজ্জালি ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের উপর অনেকগুলি রচনা লিখেছেন। যেমনঃ আল-ইকতিসাদ ফিল ই’তিকাদ (ধর্মতত্ত্বে মধ্যপন্থা), আর-রিসালা আল-কুদসিয়্যা (জেরুজালেম পত্রিকা), ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন ইত্যাদি।