আপনার কিশোর ছেলেটির বন্ধু হয়ে উঠবেন কীভাবে? 

dreamstime_s_139865833

বছর পনেরোর মুস্তাফা সবসময় বিছানায় শুয়ে থাকে, সেভাবে বিছানা থেকে নামে না কখনোই। কারোর সঙ্গে বিশেষ বাক্যালাপ নেই। তার উদ্বিগ্ন বাবা মা শুধু ভাবেন, ক’দিন আগেও তো ছেলেটা আমাদের হাসিখুশি ছিল। সকলের সঙ্গে মিশত, খেলে বেড়াত, তাহলে হঠাত কী হল। বাবা মা চেষ্টা করেন ছেলের নীরবতা ভাঙার, জানতে চেষ্টা করেন ছেলের মনের মধ্যে কী চলছে। কিন্তু কিছুতেই যেন দাগ কাটতে পারেন না। মুস্তাফা যেন তার চারপাশে একটা দেওয়াল তুলে রেখেছে, বাবা মায়ের কাছে সেই দেওয়াল অত্যন্ত ভয়ের। মুস্তাফা কিন্তু কোনও বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়, অজস্র মুসলমান কিশোর কিশোরী রয়েছে যারা ঠিক এই একই সমস্যার সম্মুখীন হয়, আর তাদের বাবা মায়ের চিন্তার শেষ থাকে না। 

কৈশোরের সমস্যা

ইসলামে বলা হয় আমাদের জীবন দর্শন, ধর্ম, বিশ্বাস ও উসুলের পরীক্ষা নেওয়ার জন্যই আল্লাহ আমাদের সন্তান উপহার দেন। সমস্ত সন্তান-পিতামাতার সম্পর্ক এই পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যায়। সেই জন্যই সন্তান মানুষ করতে গেলে প্রথমেই এই পরীক্ষার কথা মাথায় রাখা ভাল। বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে। একটা বয়সের পর বাবা মায়ের ভূমিকা পরিবর্তন করে ছেলের বন্ধু হয়ে উঠুন, জানতে চান তার মনের মধ্যে কী চলছে। হাসিখুশি ছেলেটা হঠাত চুপ হয়ে গেল কেন? কোথায় আঘাত লেগেছে তার? বিশ্বাস ভেঙেছে কেউ?

আপনার ভরসার হাত আপনার ছেলেকে  উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক , নিজেকে দোষারোপ আর অপরাধবোধের হাত থেকে রক্ষা করবে।
এটা অনস্বীকার্য যে কৈশোরে পৌঁছনোর পর ছেলে ও মেয়েরা একটু পার্সোন্যাল স্পেস চায়। সেটা ভয়ের কিছু না, কিন্তু ভয়ের হল সঠিক সাহচর্য না পেলে এই পার্সোন্যাল স্পেস মরণফাঁদ হয়ে ওঠে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের নিয়ে এই ভয়টা বেশি। মেয়েরা সাধারণত খুব বেপরোয়া কোনও কাজ করতে চায় না, অন্যদিকে ছেলেরা একটু বেশি দুঃসাহস দেখায়। সমীক্ষায় বলছে ৭৭ শতাংশ ট্রাফিক দুর্ঘটনার শিকার ২৫ বছরের নীচের যুবকেরা।

শুধুই কি হরমোনের পরিবর্তন?

আমরা আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে চাই, কিন্তু ছেলেরা এমন একটা ধারণা নিয়ে বড় হয়ে ওঠে যে মাচোইজম বা হিরোইজমই সেরা। মাচো না হলে পুরুষ হয়ে ওঠা যাবে না। সেই ধারণা হেকেই বেপরোয়া মনোভাব, বা নিজেকে আলাদা করে নেওয়ার একটা প্রবণতা। যা একসময় বেশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। 

কৈশোরে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ছেলে ও মেয়েদের শরীরে হর্মোনাল পরিবর্তন হয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে সমস্যা হয় যেটা, সেটা হল হঠাত করে বড় হয়ে যাওয়ার! পরিবারের ব্যবহার তাদের প্রতি পরিবর্তন হতে শুরু করে। হঠাত করে একরাশ দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। ছেলেটা হয়তো সেই দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক ভাবে দৃঢ় নয়। তাও সামাজিক নিয়ম অনুসারে তাকে হঠাত করে হয়ে উঠতে হয় পরিবারের কাঁধ। এই বিষয়টি অনেকসমই মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। মানসিক ও স্নায়বিক চাপে কিশোরটি তখন গুটিয়ে যেতে থাকে, বাবা মায়ের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে। আল্লাহর পথ থেকে সে সরে আসে। আল্লাহর শেখানো বাণী তখন তার কাছে কোনও অর্থই বহন করে না। কিন্তু সঠিক দিশা দেখাতে এই সময় কুর-আনের ভূমিকা প্রকৃতপক্ষেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যদি আমাদের নবীর উদাহরণ দেখি তাহলেই তার প্রমাণ পাব। নবীজি একজন যোদ্ধা, একজন ধর্ম প্রবর্তক, একজন পরিবারের কর্তা ও ধার্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কুর-আনে বলা আছে,


আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী। [কুর-আন ৬৮:৪]

আপনার ভূমিকা

ছেলের বড় ও প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার পিছনে বাবা ভূমিকা কখনও কখনও মায়ের থেকেও বেশি। বাবা যদি ছেলের চারপাশে নিরাপত্তা ও সৎ চিন্তার একটা বাতাবরণ তৈরি করতে পারে তাহলেই ছেলে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। নিজের ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে বার হয়ে এসে পরিবারের সঙ্গে মিশতে পারবে। বাবা যদি ছেলেকে নিজের হাতে উপাসনা, নমাজ ইত্যাদি শেখায় তাহলে ছেলে আর বাবার বন্ধন হয়ে উঠবে অটুট। প্রার্থনা জেদ নয়, ভালবাসার শিক্ষা দেয়। 

বাবা মা যদি ছেলেকে অনুভব করাতে পারে যে তারা ছেলে মেয়েকে ঘিরে রেখেছে।  ভালবাসা ও নিরাপত্তায় আগলে রেখেছে তাহলেই ছেলে নিজের মনের কথা খুলে বলবে। সমালোচনা নয়, উৎসাহ। তুলনা নয়, সহমর্মিতা। শাসন নয়, বন্ধুত্ব। এই তিনটে বিষয় মাথায় রাখলেই ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে উঠবে সুমধুর। 

বাবার ছেলেকে একমাত্র কুর-আনের যে বাণী বলে উৎসাহিত করা উচিৎ,
হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে সবর কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ। [কুর-আন ৩১:১৭]