আপনার চেহারাকে হাস্যোজ্জ্বল রাখুন

আমরা অনেকভাবেই একে অন্যের মুখোমুখি হই। নিজের প্রয়োজন নিয়ে অন্যের কাছে যাই। আবার অন্যের প্রয়োজন পূরণে তার পাশে দাঁড়াই। নিরেট সৌজন্য সাক্ষাতের জন্যও আমরা একে-অন্যের কাছে যাই। সমাজের স্বাভাবিক বাস্তবতায় এগুলোর কোনোটিকেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় আমাদের উচিৎ হাসি মুখে কথা বলা। সবার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক প্রিয় সাহাবী হযরত আবু যর রাযিঃ-কে বলেছিলেন, “কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না, এমনকি তা যদি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার বিষয়ও হয়।” (সহীহ মুসলিম)

কেই বা এটা পছন্দ করে, তার সাথে কেউ গোমড়া মুখে কথা বলুক? কেউই পছন্দ করে না। আমি নিজে যেমন পছন্দ করি না- আমার সাথে কেউ গোমড়া মুখে কথা বলুক, তেমনি আমারও উচিত অন্যের সাথে হাসিমুখে কথা বলা। এর দ্বারা অন্তরিকতা ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। একটু মুচকি হাসি দু’জনের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। অপরদিকে গোমড়ামুখে থাকলে দুরত্ব তৈরি হয়। তাই পরিচিত-অপরিচিত সকলের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করব, হাসিমুখে কথা বলব এবং বিনয়ের আচরণ করব। আমার মুখে যেন সবসময় লেগে থাকে হাসির ঝিলিক।

পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতে হাসিমুখে কথা বলা, মুখ ভার করে গোমড়ামুখে না থাকা-এগুলো ভদ্রতা, সামাজিকতা ও মানবিকতার দাবি। তবে আমাদের জন্যে তা এখানেই শেষ নয়। কাজটি সওয়াবের এবং পরকালে তা আমাদের মুক্তির অবলম্বনও হতে পারে। সাধারণ দৃষ্টিতে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। কিন্তু কারও আচরণে যখন কেউ আঘাত পায়, কাঙ্ক্ষিত সৌজন্যমূলক আচরণ না পেয়ে হতাশ হয়, তখন অনুভূত হয় এর অপরিহার্যতা।

হাসিমুখে পারস্পরিক সাক্ষাৎ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন আমাদেরকে উৎসাহিত করেছেন, তেমনি তিনি নিজেও ছিলেন এর এক সার্থক দৃষ্টান্ত। আবদুল্লাহ ইবনে হারেস রাযিঃ বলেন, “মুচকি হাসিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অগ্রগামী আমি আর কাউকে দেখিনি” (শামায়েলে তিরমিযী)

এছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, “তোমার কোনো মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও সাওয়াবের কাজ।” (তিরমিযী, মুসনাদে আহমদ)

এক মুসলমানের সঙ্গে অন্য মুসলমানের আন্তরিকতা পূর্ণ সম্পর্ক, সৌজন্যতাবোধ ও হাসিমুখে সাক্ষাৎ তার উত্তম চরিত্রের পরিচয় বহন করে। উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিই পরিপূর্ণ ঈমানদার। আর ঈমানদার ব্যক্তির প্রতিটি কাজই হবে সাওয়াবের এবং কল্যাণের।

এ কারণেই প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “পরিপূর্ণ ঈমানদার হলো ঐ ব্যক্তি, যার চরিত্র সর্বোত্তম।” (আবু দাউদ, মিশকাত)

ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন যে কীভাবে মুসলমানদেরকে মাটি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে আকাশের উচ্চতায়, এর প্রমাণও আমাদের চোখের সামনেই। ইসলামের আগমনের পর মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে তারা জয় করে নিয়েছিলেন অর্ধপৃথিবী। যারা পৃথিবীজুড়ে পরিচিত ছিলেন বর্বর, অসভ্য আর হিংস্র জাতি হিসেবে, দিকে দিকে তারাই এবার ছড়িয়ে দিলেন শান্তির বাণী। এ তো দুনিয়ার ইতিহাস। পরকালেও যে কতটা আলো ছড়াবে মুমিনদের এই ভ্রাতৃত্ব তার নমুনা লক্ষ করুন প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র বাণী থেকেই- “কেয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, আমার জন্যে যারা একে অন্যকে ভালোবেসেছিল, তারা কোথায়? আমি আজ তাদেরকে আমার ছায়ায় আশ্রয় দেব, আজকের এই দিনে আমার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই।” (সহীহ মুসলিম)

পারস্পরিক এই যে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্বের এই যে বন্ধন, তা অর্জন করার জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই হাদীসে দুটি পদ্ধতির কথা বলেছেন- সালাম ও উপহার প্রদান। আরও কোনো পথও বেরিয়ে আসতে পারে এ বন্ধন সৃষ্টির। কিন্তু যে পদ্ধতির কথাই বলি না কেন, তা প্রয়োগে সফল হতে হলে প্রধান শর্ত হচ্ছে- হাসিমুখে সাক্ষাৎ। এর কোনো বিকল্প নেই। সালাম এবং উপহারের আদানপ্রদান সাধারণত হাসিমুখেই হয়ে থাকে। কেউ যখন কারও বিপদে পাশে দাঁড়ায় তখনো তাদের মধ্যে একটা আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়। এই আন্তরিকতাকে টিকিয়ে রাখতে হলেও হাসিমুখের এ সাক্ষাৎ অপরিহার্য।

পরিশেষে, মুসলিম উম্মাহর উচিত প্রিয়নবির আমলগুলো যথাযথ বাস্তবায়ন করা। ইসলামের বিধান বাস্তবায়নে নিঃস্ব ব্যক্তিও যাতে সাওয়াব থেকে মাহরুম না হয়, সে বিষয়ে প্রিয়নবির নসিহতের ওপর আমল করতে পরস্পরের সঙ্গে হাসিমুখে কথাবার্তা বলা এবং সাক্ষাৎ করা।

আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে সাওয়াব ও কল্যাণ লাভে পরস্পরের সঙ্গে ভাব বিনিময়ে, কথাবার্তায় ও সৌজন্যতাবোধে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।