আপনার বন্ধুত্বই আপনার পরিচয়

harli-marten-M9jrKDXOQoU-unsplash
Fotoğraf: Harli Marten-Unsplash

কথায় বলে, মুখ হল মনের আয়না। আর এই আয়নাই একজন মানুষকে আরেক মানুষের কাছে আনতে সাহায্য করে। আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ আল্লাহর প্রকৃত খিদমতগার আসলে একে অপরের আয়না।’  আল্লাহ তা’তালার অনুপম সৃষ্টি মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, এই সমাজে বাস করার জন্য তাই ভীষণভাবে বন্ধুত্বের প্রয়োজন। কিন্তু বন্ধু ডাকলেই কি আসলে বন্ধুত্ব হয়?

আমাদের জীবনে কোনও-কোনও মানুষের প্রভাব সদর্থক হয়। বিপদে তারা পাশে থাকে, অন্ধকার সময় আল্লাহর সঙ্গে তারাও আমাদের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যায়। আবার কিছু মানুষ থাকে যাদের আমরা বন্ধু ভাবি, আকর্ষিত হই, কিন্তু আদতে তারা ঋণাত্মক প্রভাব ছাড়া কিছুই দিতে পারে না আমাদের। 

বন্ধুত্বের মূল অনুভূতিটি সদর্থক, সে কারোর ছেলেবেলার বন্ধু হোক কি বড় বয়সে পাওয়া বন্ধু হোক। যে মানুষ আপনার জীবনে ইবাদত নিয়ে আসবে, সেই প্রকৃত বন্ধু। 

কিন্তু প্রকৃত বন্ধু কে?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন, ‘ যখন এক মানুষের সত্ত্বা অপর মানুষকে ছুঁতে পারে, তখনই সৎ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা না হলে একসময় একে অপরের জীবনের রাস্তা আলাদা হয়ে যাবে।'(সহীহ মুসলিম)

প্রকৃত মুসলমানের সবসময় ভাবা উচিৎ সে তার বন্ধুবৃত্তের থেকে সদর্থক কী কী জানতে পারছে। এক এক জন মানুষ থাকেন, যাদের ব্যবহার ও উসুল আমাদের সঙ্গে মেলে না। সময় কাটানোর পর আমাদের এক অস্বস্তি হয়, কিন্তু কেন জানিনা তাদের আমরা জীবন থেকে বাদ দিতে পারি না। আল্লাহ কিন্তু আমাদের একের পর এক ইঙ্গিত দিতে থাকেন, এই ইঙ্গিত যদি আমরা খেয়াল করে সরে আসতে পারি তাহলে আমাদের উপকার বই অপকার হয় না। 

আল্লাহর অনুগামী হিসেবে আমাদের সবসময় খেয়াল রাখা উচিৎ কী ধরনের মানুষকে আমরা জীবনে দখল দিচ্ছি। সঠিক সম্পর্ক আমাদের আল্লাহের নিকটে নিয়ে যায়, অপরাপর বন্ধু যদি টক্সিক বা বিষাক্ত হয় তাহলে জীবনে অশান্তি ছাড়া কিছুই আসে না। উপরন্তু আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস টলে যেতে পারে। 

আমরা যে ধরনের মানুষ হতে চাই, সবসময় সেই ধরনের মানুষই আমরা আকৃষ্ট করি, তাই নিজের নিয়ত সম্পর্কে খুব সচেতন থাকা প্রয়োজন।

কোন নীতি মেনে চলব?

সহজ ও সৎ সম্পর্কের জন্য কতগুলো উসুল আল্লাহ আমাদের দিয়ে রেখেছেন, 

প্রথমতঃ আপনি হাই স্কুল স্টুডেন্ট হোন কিংবা কর্পোরেটের উচ্চপদস্থ কর্মচারী, পিয়ার প্রেশার বা সাহচর্য থেকে আগত চাপের মতো জিনিস আপনাকে সামলাতে হবেই। এই পিয়ার প্রেশারের ঋণাত্মক প্রভাব আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহের নীতি অনুসারে এই অবস্থায় মাথা শান্ত রাখাই কাম্য। 

আদতে আমরা সকলে সামাজিক ভাবে স্বীকৃতি পেতে চাই। পিয়ার প্রেশারের প্রভাব এই ইচ্ছের রূপ ধরেই আমাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা অসহায়তা নিয়ে আসে। তাই, এমন সম্পর্ক আমাদের সবসময় গ্রহণ করা উচিৎ যা আমাদের এই অসহায়তা থেকে রেহাই দেবে। প্রকৃত বন্ধু কখনও আপনাকে পিয়ার প্রেশারের মধ্যে ফেলবে না। 

পবিত্র কুরআন শরীফেও তাই বলা আছে, 

‘আপনি নিজেকে তাদের সংসর্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার অনুগত্য করবেন না। (আল-কুরআন ১৮.২৮) 

অসৎ বন্ধুত্ব আমাদের জীবনের লক্ষ্যভ্রষ্ট করে দিতে পারে। তবে অসৎ বন্ধুর পাল্লায় পড়লেই সৎ বন্ধুত্বের মূল্য বোঝা যায়। জানা যায় কে বিপদে আমার পাশে দাঁড়াবে, কে আসলে আমার সঙ্গে ভালবেসে কোনও স্বার্থ ছাড়াই যুক্ত রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভারী সুন্দর এক বাণীর মাধ্যমে এর পার্থক্য বুঝিয়েছেন। আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ মিস্ক বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতাদের থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না। হয় তুমি আতর খরিদ করবে, না হয় তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কর্মকারের হাপর হয় তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে।’ (বুখারী) (৫৫৩৪)

তাহলে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা কী?

আল্লাহের মতে প্রকৃত উসুল ওয়ালা ব্যক্তিই আরেক ব্যক্তির বন্ধু হতে পারে। লক্ষ্য করে দেখবেন যে মানুষ আপনাকে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখতে উৎসাহিত করছে। বন্ধু সেই ব্যক্তিই , যার মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত ভালবাসা্, করুণা, সততা, ধৈর্য্য, সদর্থক মনোভাব এবং ইসলাম ধর্মের সমস্ত উসুল রয়েছে। যে আপনার প্রকৃত সমালোচনা করবে, যার চিন্তাধারায় আপনি আল্লাহর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন। 

অসৎ বন্ধুত্বের মধ্যে সন্দেহ, ঈর্ষা, জটিলতা প্রভৃতি থাকে, যা থেকে সহজেই সৎ ও অসৎ আলাদা করা যায়।

যদি আপনি ‘টক্সিক বন্ধুত্বে’ আবদ্ধ থাকেন, তাহলে প্রথমে চেষ্টা করুন সেই ব্যক্তিতে আল্লাহর পথে নিইয়ে আসতে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তার সংস্রব ত্যাগ করুন। 

মনে রাখবেন, আল্লাহর কৃপায়, আমাদের বন্ধুরাই কিন্তু আমাদের চরিত্রের প্রকৃত পরিচায়ক।