আপনার শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম জরুরি কেন?

শিশু Contributor
ফিচার
শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম
Photo by Ivone De Melo from Pexels

সুস্থ থাকার জন্য শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম জরুরি, একথা তাঁর সন্তানের জন্মের পর থেকেই বাড়ির বড়দের থেকে শুনে আসছিলেন সদ্য মা হওয়া রুবিয়া বেগম। কিন্তু নিজের সন্তানকে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম মেনে ঘুম পাড়াতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। কখনও সকালে দুধ খাওয়ার পরেই ঘুমিয়ে পড়ছিল তাঁর পাঁচ মাসের পুঁচকে রেহান, আবার কখনও রাতের বেলা তাকে ঘুম পাড়াতেই নাজেহাল হচ্ছিলেন বাড়িশুদ্ধু সবাই! তাই একেবারে ছোট বাচ্চাকে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম মেনে ঘুমের অভ্যেস করা যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই এই কাজটি কষ্টসাপেক্ষও বটে। শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম জরুরি কেন, এই নিয়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। আজ আমরা এই নিয়ে আলোচনা করব।

শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম জরুরি কেন?

ইউনিভার্সিটি অফ ডেলাওয়্যারের স্কুল অফ নার্সিংয়ের অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর লরেন কোভিংটন এবং তাঁর সহযোগীদের করা গবেষণালব্ধ ফল অনুযায়ী, যে-সমস্ত শিশুদের ঘুমের নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই, তাদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই)-এর হার বেশি থাকে। এবং দারিদ্র ও বিএমআই-এর মধ্যে সম্পর্কে নির্ধারণে এই ঘুমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণার প্রাপ্ত সিদ্ধান্তগুলি ‘অ্যানালস অফ বিহেভোরিয়াল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

এই লেখার প্রধান লেখক কোভিংটন জানালেন, “অনেকদিন ধরেই আমরা জানি যে, ওজন ও বিএমআই নির্ধারণে শারীরিক সক্রিয়তা এবং খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সমীক্ষা থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা আগে যা ভাবতাম, এবং ঘুম সম্পর্কে আমাদের যা পূর্ব ধারণা ছিল, তার চেয়েও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়।”

সমীক্ষার ফলাফল

এই গবেষণায় বাল্টিমোরে বসবাসকারী মা ও তাঁদের সন্তানদের জন্য করা ওবেসিটি প্রতিরোধক এক ট্রায়াল থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি ব্যবহার করা হয়েছে। এই ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী সমস্ত পরিবারই মহিলা, সদ্যোজাত সন্তান এবং শিশুদের জন্য ‘স্পেশাল সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন প্রোগ্রাম ফর ওয়োমেন, ইনফ্যান্টস অ্যান্ড চিলড্রেন’ (ডবলুআইসি) সুবিধার অন্তর্গত। এঁদের মধ্যে ৭০% পরিবারই দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। এই ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী ২০৭ জন শিশুর ক্ষেত্রে একসপ্তাহ পর্যন্ত অ্যাক্সেলেরোমিটার ব্যবহার করে তাদের ঘুম ও শারীরবৃত্তিয় ক্রিয়াকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। মায়েদের ক্ষেত্রে তাঁদের খাদ্যতালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়, এবং সেটিকে ‘হেলদি ইটিং ইনডেক্স’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আমেরিকানরা কীরকম খাদ্য গ্রহণ করছেন, এবং তাঁদের কীরকম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত, তা মাপার জন্য এই ইনডেক্স কাজ করে।

এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, দারিদ্রের সঙ্গে বিএমআই-র কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা, এবং এক্ষেত্রে বিশেষ করে শিশুদের নির্দিষ্ট ঘুমের সময়, তাদের শারীরিক ক্রিয়া ও খাদ্যাভ্যাসের কোনও সংযোগ রয়েছে কিনা তা দেখা। দেখা যায়, যে-সমস্ত পরিবারে দারিদ্র বেশি, তাদের শিশুদের ঘুমের নির্দিষ্ট কোনও সময় নেই। এবং যাদের ঘুমের নির্দিষ্ট সময় নেই, তাদের বিএমআই-এর হার বেশি।

কোভিংটনের মতে, এটি একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক। “এখানে সমস্ত বিষয়গুলি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত যে, কার সঙ্গে কী সম্পর্ক, সেটা বের করা বেশ কঠিন,” জানালেন তিনি।

শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম-এর রুটিন মানুন

সাধারণত, প্রতিরাতে শিশুরা যে-সময়ে ঘুমতে যায়, তার অন্তত একঘণ্টার মধ্যে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু দরিদ্র পরিবারগুলিকে এইসমস্ত নিয়ম মেনে চলা স্বাভাবিকভাবেই সহজ নয়। কোভিংটনের কথায়, সেখানে বাবা-মাই কেবল সন্তানের খেয়াল রাখেন, তার যত্ন করেন। আবার তিনি সংসার সহ অন্য একগাদা কাজ সামলান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সময় মাপা সম্ভব হয় না।

“এতরকম সমস্যা এক্ষেত্রে রয়েছে, আর পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলির পক্ষে সবগুলিকে সবসময় নিয়ন্ত্রণও করা সম্ভব নয়,” তবে একথা মেনে নিয়েও কোভিংটন আশা রাখেন যে, ভবিষ্যতে হয়তো সত্যিই একদিন পরিবারগুলি যাতে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর রুটিন মেনে চলতে পারে, তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে!

২০১৮ সালে ইউডি ফ্যাকাল্টিতে যোগদান করার পর কোভিংটন ‘পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার নার্স’ হিসেবে কাজ করাকালীন সময়েই ঘুম নিয়ে গবেষণা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। এইসময়েই তিনি এমন কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হন, যারা ঘুমের সমস্যার জন্য ‘সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম’ (সিআইডিএস)-এ তাঁদের শিশুকে হারিয়েছেন।

“আসলে এমন কিছু গতে বাঁধা ধারণা এবং বিশ্বাস রয়েছে, যে মানুষ সহজেই ভাল-মন্দ বিচার করতে শুরু করে দেয়। এই পরিবারগুলির প্রত্যেকেই তাঁদের শিশুদের জন্য ঠিক বিষয়টি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুশকিল এটাই যে, তাঁরা কেউই জানতেন না এক্ষেত্রে কী করা উচিত!” মন্তব্য কোভিংটনের।

কোভিংটন বর্তমানে শিশু ও তাদের যিনি খেয়াল রাখেন, সেই ধাত্রী, আয়া বা মা-বাবার ঘুমের ধরনের মধ্যে মিল-অমিল নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি এবং অন্যান্য গবেষক, যেমন, বিহেভোরিয়াল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট অধ্যাপক ফ্রেডা প্যাটারসন, স্কুল অফ নার্সিংয়ের অধ্যাপক এমিলি হউয়েনস্টাইন, ইউডি স্নাতকের ছাত্র অ্যানজেনি কর্ডোভা ও শ্যানন মেবেরি মিলে ইতোমধ্যেই পূর্বের গবেষণাগুলি থেকে পারিবারিক প্রেক্ষিত কীভাবে ছেলেবেলায় শিশুদের ঘুমের উপর প্রভাব ফেলে, তার একটি পর্যালোচনা করে ফেলেছেন।

শিশুর ঘুমের উপকারিতা 

এই গবেষণালব্ধ ফলাফল ‘স্লিপ হেলথ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণা অনুযায়ী, ঘুমের ঠিক পরিবেশ না থাকা, দৈনন্দিন ঝামেলা, বৈবাহিক জীবনে অশান্তি ইত্যাদি শিশুদের ঘুমের সমস্যা ও নির্দিষ্ট সময়ে না ঘুমনোর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত।

করোনা ভাইরাসের কারণে অনেকেই মানসিক নানা সমস্যায় পড়েছেন। সেই সমস্ত পরিবার এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাঁদের একটি সান্ধ্যকালীন রুটিন তৈরি করা উচিত এবং সেটি নিয়ম করে মেনে চলা প্রয়োজন। তাহলে হয়তো তাঁরা তাঁদের পরিবারে থাকা শিশুটির ঘুম ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে খানিক উপকার পেতে পারেন।

“নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমতে যাওয়ার অভ্যেস খুব গুরুত্বপূর্ণ, এবং পরিবারগুলির সেদিকে নজর রাখা উচিত। নিয়ম করে পুষ্টিকর খাওয়াদাওয়া বা রোজ মাঠে গিয়ে খেলাধুলো করার চেয়ে এই অভ্যেস করা অপেক্ষাকৃত সোজা ও ঝামেলাহীন। তাছাড়া রোজ নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমলেই যদি সুস্থ থাকা যায়, বিএমআই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে সেটা করাই তো ভাল!” বলছেন কোভিংটন।

তাই আপনার বাড়িতে বাচ্চা থাকলে তাকে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম অভ্যেস করান। মনে রাখবেন, সুস্থ থাকার জন্য আপনার শিশুর নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম জরুরি।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.