আফাক খোয়াজা দরগা এবং এক মহান উইঘুর অধিনায়কের ইতিহাস

পর্যটন Rupsa Gupta
জানা-অজানা
আফাক খোয়াজা দরগা
© Aleksandar Pavlovic | Dreamstime.com

আফাক খোয়াজা দরগা হল চিনের শিনজিয়াঙ প্রদেশের বসবাসকারী উইঘুর মুসলিমদের কাছে অন্যতম পবিত্র স্থান। সপ্তদশ শতকে এই দরগা প্রকৃতপক্ষে আফাক খোয়াজার পিতার জন্য নির্মাণ করা হয়। যদিও আফাক খোয়াজা এবং তার বেশ কয়েক প্রজন্মের বংশধরদের এখানেই সমাধিস্থ করা হয়েছে। ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও এই স্থান অসাধারণ স্থাপত্যের জন্য প্রসিদ্ধ।

আফাক খোয়াজা দরগার অবস্থান এবং ইতিহাস

১৬৪০ সালে দক্ষিণ শিনজিয়াঙ প্রদেশের তারিম বেসিনে অবস্থিত এক মরুদ্যান শহর কাশগার থেকে ৫ কিমি উত্তর-পূর্বের হাওহান গ্রামে এই দরগাটি নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মীত হয়েছিল আফাক খোয়াজার পিতা মহম্মদ ইউসুফ খোয়াজার জন্য, যিনি মধ্য এশিয়ার নামকরা নকশবন্দি সুফি প্রচারক ছিলেন।

মহম্মদ ইউসুফ ছিলেন মাখদুম আজমের পুত্র। যাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়। একটি দল ইউসুফের সাথে যোগ দেন এবং বাকিরা তাঁর ভাইয়ের সাথে যোগদান করেন। আর একটি সূত্র থেকে জানা যায়, সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউসুফ পামির পেরিয়ে আল্টিশাহরে আসেন। সেই সময় তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নেতাদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউসুফের পরবর্তী কার্যকলাপ আরও অনির্দিষ্ট। কেউ মনে করেন, এরপর ইউসুফ পূর্ব দিকে গিয়েছিলেন। সেখানে মুসলিম সালার গোষ্ঠীর সাথে কিছু সময় কাটিয়ে তিনি পুনরায় আল্টিশাহরে ফিরে আসেন। সেখানে বিরোধীরা তাঁকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করেন। আবার অনেকে বলেন যে, তিনি পূর্বে যাননি। বরং তাঁর ছেলে আফাক খোয়াজা পূর্ব দিকে যাত্রা করেছিলেন।

কাশগর দখল 

আফাক খোয়াজা তাঁর পিতার মতোই একজন প্রভাবশালী সুফি প্রচারক ছিলেন। তিনি কোমুলে প্রতিপালিত হন এবং কাশগার, সারিক্কুল এবং ইয়ারখন্দের ধর্মীয় বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ধর্মীয় কর্তৃত্বের কারণ ছিল, তিনি ছিলেন সৈয়দ; অর্থাৎ মহানবী (সাঃ)-এর বংশধর ছিলেন। ধর্মীয় ভূমিকার সাথে সাথে আফাক খোয়াজা রাজনৈতিক ভাবেও সক্রিয় ছিলেন। ফলস্বরূপ স্থানীয় শাসক ইসমাইল খান তাঁকে কাশগর থেকে বিতাড়িত করেন।

কিন্তু, এই হারকে আফাক খোয়াজা কাশগরের ক্ষমতা দখলের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান। তিনি জুঙ্গর মোঙ্গলের সাহায্য নেন। ১৬৭৮ সালে ইসমাইল খানকে জুঙ্গর মোঙ্গলরা পরাজিত করেন এবং তাঁকে সপরিবার নির্বাসিত করেন। এর পরে তাঁরা বাৎসরিক খাজনার বিনিময়ে আফাক খোয়াজাকে গোটা তারিম বেসিনের শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন।

ক্ষমতা দখল সত্ত্বেও আফাকের রাজত্বকাল রাজনৈতিকভাবে অস্থির ছিল। ১৬৯৪ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে তাঁকে সকলেই শ্রদ্ধা করতেন। সেই কারণেই এই সমাধি ক্ষেত্রের নাম আফাক খোয়াজার নামেই পরিচিত। তার পাশাপাশি তীর্থস্থান হিসেবে একে সম্মান দেওয়া হয়।

আফাক খোয়াজা দরগার স্থাপত্য

আফাক খোয়াজা এই দরগাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন স্থানীয়রা তাঁর পরিবারের প্রতিপত্তির কথা এর মাধ্যমে মনে রাখুক। ১৬৪০ সালে দরগাটি নির্মীত হলেও, তিনি এর প্রসারণ কর্মসূচি নিজের জীবদ্দশাতেই চালু করেছিলেন।

দক্ষিণ শিনজিয়াঙ প্রদেশের প্রায় ২৩০০ একর জমি এই দরগার অধীনে রয়েছে, যা ধর্মীয় জমি হিসেবে চিহ্নিত। আফাক খোয়াজার বংশধর এবং দরগার জিম্মাদাররা এর দেখাশোনা করেন।

এই দরগা স্থাপত্য কারিগরির জন্য বিখ্যাত। শিনজিয়াঙ প্রদেশের ইসলামিক স্থাপত্যের এটি অন্যতম সেরা নিদর্শন। প্রধান সমাধিক্ষেত্রের প্রতিটি কোনায় মোট চারটি মিনার আছে। দরগার কেন্দ্রে অবস্থিত গম্বুজের উচ্চতা প্রায় ৫৫ ফুট। এই গম্বুজটিই সবচেয়ে উঁচু আর এর চারপাশে সবুজ চকচকে টালি দিয়ে সাজানো। সম্মুখভাগ এবং মিনারগুলোও হলুদ, নীল, বাদামী ইত্যাদি নানা রঙের টালি দিয়ে সুসজ্জিত। প্রধান সমাধির টালিগুলিই এই দরগার প্রধান সৌন্দর্য। তবে এর কাঠের কড়িকাঠগুলোও উল্লেখযোগ্য। হাতে তৈরি কাজের সাথে সুন্দরভাবে রঙ করা এই কড়িকাঠগুলি অবশ্য অর্থাভাবে, অযত্নে ধীরে ধীরে রঙ হারাচ্ছে।

সমাধিগুলো এই দরগার স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন, যেগুলো মাটির উপরে রঙিন সিল্ক দিয়ে ঢাকা। আফাক খোয়াজার পরিবারের পাঁচ প্রজন্মের ৭২টি সমাধি এখানে ছিল। তবে এখন মাত্র ৫৮ টির অস্তিত্ব আছে। বাকিগুলো ১৯৬০ সালের এক ভূমিকম্পে নষ্ট হয়ে যায়। ভূমিকম্পে সৌধটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা পরে মেরামত করা হয়। কিন্তু সমাধিগুলি আর পুনর্নির্মীত হয়নি।

আফাক খোয়াজা দরগা বর্তমানে পর্যটন কেন্দ্র

বর্তমানে এই দরগাকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। একটি চিনা কোম্পানি এর রক্ষণাবেক্ষণ করে। বর্তমানে তারা এখানে প্রবেশ করার জন্য প্রবেশ মূল্যও নিয়ে থাকে। যদিও এই দরগার পবিত্রতা রক্ষায় কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.