আবু বকর সিদ্দিক (রাযিঃ)-সকল নেককাজে যিনি ছিলেন অগ্রগণ্য

ইসলামে রূপান্তর ১২ জানু. ২০২১ Contributor
ফিচার
আবু বকর(রাযিঃ)
Katerina Kerdi-Unsplash

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর(রাযিঃ) সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেছিলেন, “আমি যদি কাউকে আমার নিকটতম বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তবে আবু বকরকেই গ্রহণ করতাম, তবে সে আমার ভাই ও সহচর।” আবু বকর(রাযিঃ) যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কতটা বিশ্বস্ত ও নিকটবর্তী ছিলেন তা এই একটি উক্তির মাধ্যমেই পরিপূর্ণভাবে ফুটে ওঠে। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূলের পার্থিব সহচর। তাঁর নাম আবদুল্লাহ (মতান্তরে, আতিক) হলেও তিনি আবু বকর সিদ্দিক নামেই পরিচিত ছিলেন। আরবিতে ‘সিদ্দিক’ চূড়ান্ত সত্যবাদী কাউকে বলা হয়। যে সত্যকে স্বীকৃতি দেয় এবং নিজেও তা মেনেও চলে। আবু বকর(রাযিঃ) প্রকৃতপক্ষে এমনই একজন মানুষ ছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর(রাযিঃ)-কে ‘নিকটতম বন্ধু’ বলে তাঁর প্রতি ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। আরবিতে ব্যবহৃত শব্দটি হল ‘খলিল’; যা বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু বোঝায়। হযরত ইব্রাহিম(আঃ) ‘খলিলুল্লাহ’ (আল্লাহর খলিল) হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং এই একই শব্দ রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর(রাযিঃ) এর জন্য ব্যবহৃত করে তাঁর মর্যাদা তুলে ধরেছেন।

রাসূলের গুণে গুণান্বিত ছিলেন

ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, আবু বকর(রাযিঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের দু’বছর পরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং উভয়েই কুরাইশ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; যদিও তাদের গোষ্ঠী ভিন্ন ছিল। আবু বকর(রাযিঃ) বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

আবু বকর(রাযিঃ) আশেপাশের সকলের সাথে কথা বলতে এবং যোগাযোগ রাখতে পছন্দ করতেন এবং এ কারণে তিনি আরব বংশ সম্পর্কেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি সমস্ত আরব উপজাতির নাম ও অবস্থান সম্পর্কে জানতেন এবং তাদের ভাল ও খারাপ গুণাবলি সম্পর্কেও ধারনা রাখতেন। এই জ্ঞানই তাঁকে বহু বিচিত্র মানুষের সাথে সহজে মিশতে সাহায্য করেছিল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন খাদিজা(রাযিঃ)-কে বিবাহ করেন, তখন তিনি আবু বকর(রাযিঃ) এর প্রতিবেশী হয়ে যান এবং এটি বুঝতে পারেন যে, তারা দুজন প্রায় একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। দু’জনেই ব্যবসায়ী ছিলেন এবং দুজনেই অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর(রাযিঃ) উভয়ই ইসলাম-পূর্ব আরবে প্রচলিত দুর্নীতি ও জাহিলিয়্যাত এড়িয়ে চলতেন এবং উভয়েই মূর্তিপূজা অপছন্দ করতেন। এভাবে একই গুণের অধিকারী হওয়ার কারণে তাঁরা একে অপরকে আত্মীয়তার স্বীকৃতি দেন এবং আজীবনের জন্য বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন।

ইসলাম গ্রহণে তিনি ছিলেন প্রথম

আবু বকর হিসাবে সিদ্দিক(রাযিঃ) হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়্যাতকে স্বীকার করে ইসলামে প্রবেশ করেন। আবু বকর(রাযিঃ) যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোনেন যে, “আল্লাহ ব্যতীত উপাসনার যোগ্য কেউ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল” তখন তিনি বিনাদ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করেন। এক মুহুর্তও চিন্তা না করে আল্লাহর রাসূলের কথাকে বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া ছিল তাঁর সিদ্দিক গুণেরই বহিঃপ্রকাশ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন তখন তিনি প্রথম গোপনে তাঁর বিশ্বস্ত ও নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন। কারণ তিনি জানতেন যে, মক্কাবাসীরা তাঁর এই দাওয়াতকে এতটা সহজে গ্রহণ করবে না। মহিলাদের মধ্যে তিনি সর্বপ্রথম দাওয়াত দেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা(রাযিঃ)-কে এবং নিকটদের মধ্যে সর্বপ্রথম দাওয়াত দেন আবু বকর(রাযিঃ)-কে। তাঁরা দুজনই নির্দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকর(রাযিঃ)-কে প্রথম দাওয়াতের জন্য বেছে নেওয়া প্রমাণ করে যে, তিনি রাসুলের কতটা নিকটবর্তী ও বিশ্বস্ত ছিলেন।

ইসলামের দিকে আহ্বানে তিনি ছিলেন প্রথম

এরপর আবু বকর(রাযিঃ) ২ দিনে ৯ জনকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে আসেন এবং তাদের প্রত্যেকে ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকর(রাযিঃ) এর বিভিন্ন গোত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা ইসলামের দাওয়াতের ক্ষেত্রে খুব ফলপ্রসূ হয়। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিয়ে যান এবং তাদের ভাল-মন্দ দিকগুলি তুলে ধরে রাসূলকে দাওয়াতের কাজে সাহায্য করেন।

যখন প্রকাশ্যে দাওয়াত আরম্ভ হয়, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর(রাযিঃ)-কে বলেন যে, তিনি যেন মানুষের সামনে উচ্চস্বরে কালিমা পাঠ করেন। তখন রাসূলকে সাথে নিয়ে আবু বকর(রাযিঃ) কাবাঘর পর্যন্ত যাত্রা করেন এবং সেখানে উঠে দাঁড়িয়ে সকলের সামনে উচ্চস্বরে ঘোষণা করেন, “আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ উপাসনার যোগ্য নেই, এবং মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল”। এভাবে, আবু বকর(রাযিঃ)-ই হয়ে যান ইসলামের পক্ষে প্রথম প্রকাশ্যে আহ্বানকারী।

মিরাজের ঘটনায় বিশ্বাস স্থাপনে তিনি ছিলেন প্রথম

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মিরাজ থেকে আগমন করে তাঁর ভ্রমণের কথা সকলের সামনে তুলে ধরেন তখন তাঁর কথা শুনে মক্কার কাফেররা হাসিঠাট্টা শুরু করে দেয়। এবং আবু বকর(রাযিঃ)-কে ডেকে বলে যে, “দেখো, তোমার সঙ্গী এগুলা কি বলছে?”। তখন আবু বকর(রাযিঃ) বলেন, “যদি সত্যিই তিনি তা বলে থাকেন তবে বিনা দ্বিধায় আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম।” তাঁর এই উক্তির পর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ‘সিদ্দিক’ উপাধি দেন।

এভাবে, তাঁর জীবনের আরও অনেক ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, সকল নেককাজেই তিনি ছিলেন প্রথম বা অগ্রগণ্য। অন্যান্য সাহাবীরাও নেকির কাজের প্রতিযোগিতা দিয়ে কখনও আবু বকর(রাযিঃ)-কে হারাতে পারেননি।