আব্দুল সাত্তার ঈদি: পাকিস্তানের বুকে তিনি ছড়িয়েছিলে মানবতার বাণী

বিখ্যাত ২৩ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
ফিচার
আব্দুল সাত্তার ঈদি

স্থান, করাচীর এক মানসিক হাসপাতালের ফিমেল ওয়ার্ড। সাদা দাড়ি ও দেশীয় পোশাক পরিহিত ছোটখাটো কিন্তু শক্তিশালী মানুষটি অনবদ্য মমত্ব নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন। তাঁর বুদ্ধিমান বাদামি চোখ পরিপূর্ণ মায়ায়। তাঁর সামনে, হাসতাপালের বিছানায় এক তরুণী। আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে সে ডুকরে কাঁদছে, আর মানুষটিকে প্রশ্ন করছে নিজের সন্তানের সম্পর্কে। যে সন্তানকে তরুণীর স্বামী নিজের কাছে নিয়ে রেখেছে।

‘আমি জানি তুমি অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছ বেটি, কিন্তু এখন কিছুতেই তোমার কাছে তোমার সন্তানকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়।’ মমতার সঙ্গেই সত্যি কথাটা সহজ ভাবে বলে দিলেন মানুষটি। ‘তোমার তো কলেজের ডিগ্রি আছে, তুমি কিন্তু এই ওয়ার্ডের অন্যান্য মানুষদের জন্য অনেক কিছু করতে পার!’

জানলার বাইরে রৌদ্রোজ্জ্বল বাগানে তখন আরও অনেকেই তখন নিজের মত করে সময় কাটাচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেরই পরিবার আর ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি। আসলে, মানসিক সমস্যা এখনও আমাদের কাছে অচ্ছ্যুত।

‘নিজেকে চেনো, নিজেকে সাহায্য করো। এভাবে অপরকেও সাহায্য করতে পারবে। আর তাহলেই নিজের সমস্যাকে পরাস্ত করতে পারবে তুমি।’ ক্রন্দনরতা মেয়েটির মাথায় হাত রেখে সেদিন কথাগুলো বলেছিলেন আব্দুল সাত্তার ঈদি ।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলেছিলেন বোধহয়, কারণ একা হাতে এশিয়ার সর্ববৃহৎ ও কার্যকরী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার সময় তিনি নিজেও আগে আত্মপরিচিত হয়েছিলেন।

শুধু তাই নয়, মানুষকে সাহায্য করার জন্যও তিনি ছিলেন সবসময় সচেষ্ট। সে গৃহহিংসা থেকে কাউকে উদ্ধার করাই হোক, কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির শুশ্রূষাই হোক। ঈদি এবং তাঁর স্ত্রী বিলকিস বেগম কখনও না বলতে জানতেন না। কথিত আছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত অচেনা দেহেরও যাতে সঠিক জানাজা হয়, নিজের হাতে সেই ব্যবস্থা করেছিলেন ঈদি।

অথচ শুরুটা ছিল কিন্তু সাধারণভাবেই…

১৯৫১ সালে করাচীর মিঠাদার অঞ্চলে ছোট্ট একটি ডিসপেনসারি দিয়ে সেবাপরায়ণ যাত্রা শুরু আবদুল সাত্তার ঈদি-র। লেখাপড়ায় প্রাইমারির গণ্ডিটুকু পার করেছিলেন। তবে আব্বুর কাছ থেকে শিখেছিলেন প্রাকৃতিক কিছু চিকিৎসার উপায়। আর মনে ছিল মানুষকে সাহায্য করার অদম্য ইচ্ছে।

তারপর অবশ্য আর ফিরে তাকাতে হয়নি। সারা পাকিস্তান জুড়ে অজস্র ডিসপেনসারি, ক্লিনিক, অ্যাম্বুলেন্স সেন্টার, মাতৃসদন, ব্লাড ব্যাংক, অনাথ আশ্রম, মানসিক হাসপাতাল বানিয়ে গিয়েছেন একের পর এক। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে ২৫ বেডের ক্যানসার হাসপাতালও স্থাপন করেছেন তিনি। এছাড়া গরীব পথশিশুদের জন্য শেল্টার ও খাওয়ার ব্যবস্থাও করেছেন। শুধু তাই নয়, বসনিয়া, ইথিওপিয়া ও আফগানিস্তানে নিয়মিত অর্থ ও ঔষধ সাহায্যের বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন এই মহান মানুষ।

জানা গিয়েছে, কুখ্যাত ৯/১১ এর আক্রমণের পর, যে সমস্ত পাকিস্তানিরা কর্মহীন হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের জন্য ১০০০০০ ডলার সাহায্য প্রদান করেছিলেন আব্দুল সাত্তার ঈদি।

আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁর এই মানুষের জন্য কাজ করায় কোণও সরকারি প্রভাব নেই। বরং বারবার সরকারের সাহায্য বিনীত ভাবে প্রত্যাখ্যান করে গিয়েছেন তিনি। আট এর দশকে, পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়া উল হক ঈদিকে ৫০ লক্ষ টাকার চেক পাঠিয়েছিলেন। ঈদি কিন্তু বিনীত ভাবে তা ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন। ২০০৩ সালে ইতালি সরকার তাঁকে এক মিলিয়ন ডলার প্রদান করতে চেয়েছিলেন, ঈদি সেটিও গ্রহণ করেননি।

জানিয়েছিলেন যে সরকার যে সমস্ত শর্ত রাখছে তা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ঈদি ফাউন্ডেশনের সমস্ত খরচ কিন্তু মূলত ব্যক্তিগত সাহায্য ও ঈদির নিজস্ব সম্পত্তি থেকে চলে। প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের কাছে হাত পাততেও কুণ্ঠা ছিল না তাঁর।

এই মহান মানুষ পুরস্কৃতও হয়েছেন…

১৯৮৬ সালে বিখ্যাত র‍্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০০০ সালে আন্তর্জাতিক বালজান পুরস্কারও যুক্ত হয়েছে তাঁর ঝুলিতে। করাচী ডেভেলপমেন্ট অথরিটির জে এ নিজামির মতে, “ঈদি অত্যাশ্চর্য ঘটাতে পারেন মানুষের জীবনে।’

তবে মহান মানুষকেও একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হয়। ২০১৬ সালের ৮ জুলাই অষ্টআশি বছর বয়সে আল্লাহ তায়লার কাছে নিজেকে মেহফুজ করেছেন আব্দুল সাত্তার ঈদি। তবে, তাঁর দেখানো পথে তাঁর অনুগামীরা এখনও এগিয়ে চলেছেন।