আমরাহ বিনতে আবদুর রহমান: সোনালী যুগের বিদগ্ধ আলেমা

বিখ্যাত Contributor
ফিচার
আমরাহ বিনতে
Photo by Valeria Boltneva from Pexels

আমরাহ বিনতে আব্দুর রহমান (রহঃ) ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাযিঃ) এর খুব কাছের ছাত্রী। তিনি আয়েশা (রাযিঃ)-এর সান্নিধ্যেই বড় হয়েছিলেন। আমরাহ (রহঃ)-এর দাদা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী।

বিখ্যাত এ নারী তাবেয়ি ফিকহ ও হাদিস বর্ণনায় খ্যাতি লাভ করেছিলেন। আয়েশা (রাযিঃ)-এর সঙ্গে তার চমৎকার সম্পর্ক ছিল। ফলে ইলম ও জ্ঞানচর্চায় তিনি দারুণভাবে উপকৃত হয়েছিলেন। তার সম্পর্কে বড় বড় মুসলিম মনীষী বলেছেন, তিনি ছিলেন আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানসম্পন্ন মহিলা। ইসলামের সোনালী যুগে জ্ঞানী আলেমরা তার ইলম ও জ্ঞান-গরিমাকে খুবই গুরুত্ব দিতেন।

আমরাহ বিনতে আব্দুর রহমান (রহঃ)-এর জন্ম ও প্রতিপালন

আমরাহ বিনতে আবদুর রহমান (রহঃ) ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রাযিঃ)-এর খেলাফতকালে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম ২৮ হিজরি কিংবা মতান্তরে ২৯ হিজরি। আয়েশা (রাযিঃ)-এর কোলে-পিঠে যারা বড় হয়েছেন এবং তার থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস শিক্ষা করেছেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম।

জানা যায়, আমরাহ (রহঃ)-এর পিতার নাম আবদুর রহমান ইবনে জারারাহ। তার দাদার নাম সা’দ ইবনে জারারাহ (রাযিঃ)। তিনি আনসার সাহাবিদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন। তার মাতার নাম সালেমা বিনতে হাকিম। আমরাহ (রহঃ)-এর বিবাহ হয় আবদুর রহমান ইবনে হারেসা ইবনে নোমানের সঙ্গে। সে সংসারে মুহাম্মদ নামে তাদের এক পুত্রসন্তান জন্ম নেয়; তার উপাধি ছিল ‘আবুর রিজাল’।

আয়েশা (রাযিঃ)-এর নৈকট্য ও সান্নিধ্য

আমরাহ (রহঃ)-এর জন্য আয়েশা (রাযিঃ)-এর নৈকট্য ও সান্নিধ্য বড় আশীর্বাদ ছিল। তাঁর জীবনে এটি দীপ্তিময় প্রভাব ফেলেছে। পিতার মৃত্যুর পর ভাই-বোনদের সাথে তিনি আয়েশা (রাযিঃ)-এর কাছেই বড় হন। এতে তিনি সুযোগ পান পুণ্যময় পরিবেশ এবং ইলম ও আল্লাহভীতির আবৃত আবহে বড় হওয়ার।

বলা হয়, আমরাহ (রহঃ)-এর মেধাশক্তি ছিল অত্যন্ত তুখোড়। স্মৃতিশক্তির প্রখরতার কারণে তিনি অধিক হাদিস মুখস্থকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁর থেকে বর্ণিত অধিকাংশ হাদিসই ছিল উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। ইমাম ইবনে ইসহাক আল-ফাজারি তার কিতাব ‘সিয়ার’-এ এবং ইবনে সাদ তার তবকাতে উল্লেখ করেন, ‘”তিনি অত্যন্ত ধী-শক্তিসম্পন্ন ও বুদ্ধিমতী ছিলেন। ফলে উম্মুল মু’মিনিন আয়েশা (রাযিঃ) থেকে প্রচুর পরিমাণে জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হন।”

আমরাহ বিনতে (রহঃ)-এর মর্যাদা ও সম্মান

অত্যন্ত বিদ্বান আমরাহ (রহঃ)-এর মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে তৎকালীন যুগের বড় বড় ইমামগণ সাক্ষ্য দিয়েছেন। ইমাম ও মুহাদ্দিস সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ তাঁর সম্পর্কে বলেন, “তিন ব্যক্তি আয়েশা (রাযিঃ) কর্র্তৃক বর্ণিত হাদিসগুলো সম্পর্কে সর্বাধিক জানতেন। কাসিম ইবনে আবু বকর, উরওয়া ইবনে জুবাইর ও আমরাহ বিনতে আবদুর রহমান।”

ইমাম যাহাবি (রহঃ) বলেন, “আমরাহ (রহঃ) ছিলেন জ্ঞানপ্রদীপ, ফিকাহবিশারদ ও হাদিসের ক্ষেত্রে প্রামাণ্যতার ভিত্তি। তার হাদিসগুলো ইসলামের বড় বড় গ্রন্থাদিতে আছে।”

ইমাম বুখারি (রহঃ) বলেন, “ইয়াহইয়া ইবনে সাইদ আমরাহ (রহঃ)-এর হাদিসগুলো কাসিম ইবনে মুহাম্মদের কাছে বর্ণনা করতেন (যিনি বিখ্যাত সাত ফকিহ-এর মধ্যে একজন ছিলেন)। আমরাহ (রহঃ) বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে ইয়াহইয়া (রহঃ) কাসিম (রহঃ)-কে বলতেন, “পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ ব্যক্তির নিকট থেকে তোমার কাছে এই হাদিস পৌঁছেছে।”

একবার এক খ্রীস্টান চোর লোহার কিছু আংটি চুরি করল। চুরি প্রমাণিত হওয়ার পর মদীনার বিচারক তার শাস্তি স্বরুপ হাত কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন। এই রায়ের কথা যখন আমরাহ (রহঃ) জানতে পারলেন, তখন তিনি জলদি করে তার এক ছাত্রীকে কাজীর নিকট পাঠালেন। এবং জানাতে বললেন যে, তার হাত কাটা যাবেনা। কারণ কেউ যদি এমন কোনো বস্তু চুরি করে যার মূল্য এক-চতুর্থাংশ দিনারের চাইতে কম তাহলে চুরির জন্য তার কোনো শাস্তি নেই।

এই কথা শোনার সাথে সাথে কাজী সেই চোরকে মুক্তি দিয়ে দিলেন। কাজী দ্বিতীয়বার এই তথ্যের সঠিকতা যাচাইয়ের প্রয়োজনবোধ করলেন না। কারণ, আমরাহ (রহঃ) ছিলেন সবার নিকট অত্যন্ত বিশ্বস্ত একজন ফকীহ এবং আলেমা।

তৎকালীন যুগের বড় আলেমরা তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন

আমরা প্রায়শই যেসব বড় বড় আলিমদের নাম হাদিসগ্রন্থে দেখি তাদের অনেকেই আমরাহ (রহঃ)-এর ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন। হাদিস সংকলনকারী সকল ইমাম আমরাহ(রহঃ)-কে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ফকীহ, মুহাদ্দিস এবং হাদিস বর্ণনাকারী রাবী হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

একবার ইমাম যুহরী (রহঃ)-কে তার উস্তায কাসিম ইবন মুহাম্মাদ (রহঃ) পরামর্শ দিলেন আমরাহ বিনতে আব্দুর রহমান (রহঃ)-এর দরসে বসতে। ইমাম যুহরী তাঁর দরস থেকে ফিরে এসে বললেন– “আমরাহ (রহঃ) তো একজন সীমাহীন জ্ঞানের সাগর।”

এভাবে তৎকালীন যুগের অনেক বড় আলেম আমরাহর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। বর্ণনায় রয়েছে, কাসিম ইবনে মুহাম্মদ (রহঃ) ইমাম জুহরি (রহঃ)-কে বলেন,”‘আপনাকে ইলমের প্রতি খুব আগ্রহী দেখা যাচ্ছে। তাহলে আপনাকে কি আমি ইলমের ভাণ্ডারের পরিচয় দেব?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” কাসিম (রহঃ) তখন বললেন, “আপনি আমরাহ বিনতে আবদুর রহমানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করুন।” জুহরি(রহঃ) এরপর বলেন, “আমি আমরাহ (রহঃ)-এর কাছে এসে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করলাম। তখন তাকে ইলমের সুগভীর সমুদ্র রূপে পেলাম।”

ইলমে দ্বীনের সমুদ্র মহিয়সী এই নারী ১০৬ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৭৭ বছর।