আমরা কীভাবে আমাদের বাবা মায়ের বন্ধু হয়ে উঠব?

একটি শিশুর চোখে তার পিতা-মাতাই আদর্শ। শিশু চেষ্টা করে পিতা মাতার অনুকরণ করতে, তাদের প্রত্যেকটা কথা অনুসরণ করতে। সেই কারণেই ছোটবেলায় নিজেদের খেলাঘরে আমরা রান্নাবাটি কিংবা বাজার করতে যাওয়া খেলে থাকি। আমরা তখন পিতা ও মাতার সমস্ত বাক্যই সঠিক বলে মনে করি এবং মুগ্ধ হই। মনে মনে হয়ে উঠতে চাই তাদের মতো। তাই জন্যই একটি ছেলে বা মেয়ে বাবার ব্রিফকেস হাতে নিয়ে বলে অফিস যাচ্ছি, অথবা একটি মেয়ে তোয়ালে মাথায় জড়িয়ে মায়ের মতো লম্বা চুল কল্পনা করে।  

কিন্তু যত বড় হতে থাকি আমাদের সেই ভাবনাটা পাল্টাতে থাকে। বাবা-মার গুরুত্ব ক্রমশ কমতে থাকে আমাদের জীবনে, বাইরের প্রভাব বাড়তে থাকে। বন্ধু বান্ধব, বহির্জগত আমাদের কাছে তখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় মনে হয় সেগুলোর সবকিছুই ঠিক। আমাদের পোষাক পরিচ্ছদ, চুল কাটার ধরন, আদব কায়দা তখন সব নিয়ন্ত্রণ করে বাইরের মানুষের প্রশংসা। বাবা-মা তখন যদি তাতে হস্তক্ষেপ করতে যায়, আমরা তাদের সঙ্গে উগ্র ব্যবহার করি। তাদের দূরে ঠেলে দিই। বন্ধুবান্ধবের হদিশ দিই না তাদের, এমনকি মিথ্যাকথা বলি প্রয়োজনে। ক্রমশ বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। একসময় আমরা চেষ্টা করি বাবা-মায়ের জীবনধারার থেকে আলাদা হয়ে যেতে। নিজেরা প্রতিজ্ঞা করি যে যখন আমাদের সন্তান হবে, সেই সন্তানকে নিজের মতো করে বড় করে তুলব। 

জেনারেশন গ্যাপ

১৯৮০-এর বিখ্যাত পপ গানটা মনে আছে? 

‘পেরেন্টস জাস্ট ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড’ এর সুরে নিজেদের জীবনের গল্প খুঁজে পেয়েছিল আপামর জনতা। সমস্ত প্রজন্মেরই এই অভিযোগ ছিল, আছে আর থাকবে। নিজের বাবা মাকে জিজ্ঞাসা করতে জানতে পারব তাঁরাও তাঁদের বাবা মা-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে খুশি ছিলেন না। 

এই যে জেনেরেশন গ্যাপ এটা পূর্ব প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। এমন ব্যাপার না যে আমাদের প্রজন্মই এর সঙ্গে লড়াই করছে। আমাদের আগের প্রজন্মও এর সঙ্গে লড়াই করেছে। আবার আমাদের পরের প্রজন্মও যে, কে বলতে পারে, একই লড়াই করবে না?

পরিবর্তন শাশ্বত

সমাজ পরিবর্তন হয়, প্রযুক্তি পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় মূল্যবোধেরও। ভাষা ও সংস্কৃতির  পরিবর্তনের কথা তো ছেড়েই দিলাম। একটা প্রবহমান নানাবিধ সংস্কৃতি সমন্বিত সমাজে জেনেরেশান গ্যাপ থাকবেই।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, এককালে যে ক্যাসেটে গান শোনা ছিল অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম। এখনকার আমরা কানে ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনি। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বাবা মা এতে অভ্যস্ত হতে পারবেন না। 

তবে এই পরিবর্তন মানেই এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে এমন নয়। বিশেষ করে আদর্শ মুসলমান পরিবারে এটা কখনোই হয় না। আমাদের বুজুর্গদের থেকে অনেককিছু শেখার আছে। পিতা মাতাকে সম্মান করলে আল্লাহ সেই শিক্ষা আমাদের পেতে সাহায্য করেন।

হাদিসে উল্লেখ

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার? তিনি বললেনঃ তোমার মা। লোকটি বললঃ অতঃপর কে? নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার মা। সে বললঃ অতঃপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললঃ অতঃপর কে? তিনি বললেনঃ অতঃপর তোমার বাপ।

ইবনু শুবরুমাহ বলেন, ইয়াহইয়া ইবনু আইউব আবূ যুর‘আ থেকে এ রকমই বর্ণনা করেছেন। [মুসলিম ৪৫/১, হাঃ ২৫৪৮] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৩৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৩৩)

সত্যি কথা ভেবে দেখলে আমরা ভাবি যে বয়সকালে পিতা মাতার খেয়াল রাখতে হবে, কিন্তু কতজন পিতা মাতার বন্ধু হয়ে উঠতে চাই? এই কথাটা ভাবলেই আমাদের মধ্যেকার দূরত্ব কমে আসবে। 

পিতা মাতাই আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। তাঁরা তাঁদের যৌবন কাটিয়েছেন আমাদের বড় করে তুলতে। তাঁরা আমাদের ভালবেসে সব দিয়েছেন, জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন, উপরন্তু তাঁরা আমাদের জন্য প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন। আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে আমাদের হয়তো খুব ভাল লাগে, কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বেশি চেনে কিন্তু আমাদের পিতা মাতাই।

আমরা যতই বলি আমরা আমাদের পিতা মাতার মতো হতে চাই না, কিন্তু যত বড় হই আমরা হয়ে উঠি তাঁদের মতোই। তাঁদের অভ্যাসের ছাপ পড়ে যায় আমাদের উপর। আমাদের উচিৎ তাকে অবহেলা না করে নিজের মতো করে গড়ে তোলা। আমি আমার মায়ের মতো, তবে মায়ের থেকে একটু বেশি যুক্তিবাদী। সবমিলিয়ে আমি আমার মতো, তবে তাতে আমার মায়ের প্রভাব প্রকট। এটা মাথায় রাখলেই মুশকিল আসান। 

পিতা মাতার সঙ্গে অশান্তি না করে খোলাখুলি কথা বললে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। যেমন তাঁদের ভাল দিক শেখা যায়, অনেক অচেনা দিকও প্রকাশিত হয়।

তাই পরেরবার, খাওয়ার টেবিলে আলোচনা করুন, বাবা মায়ের সঙ্গে দেশ ও সমাজ নিয়ে কথা বলুন। দেখুন, হয়তো জানতে পারবেন, বিরিয়ানি বানানোর পাশে পাশে আপনার মা হয়তো বাল্টিক তাতারদের গ্রামের মসজিদ নিয়েও অনেককিছু জানেন।