আমরা কেন ঈদ উদযাপন করি?

Giving to your neighbours as generosity
© Stockillustration | Dreamstime.com

আসন্ন ঈদ  উৎসব সম্পর্কিত লেখাটির শুরুতেই জানাতে চাই, এটি শুকরিয়াজ্ঞাপন মূলক একটি উৎসব ।

রমজান সম্পর্কে নাযিলকৃত আয়াতটি দ্বারা আমি এর ব্যাখ্যা করছি-

“…এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর”। (আল কুরআন-২:১৮৫)

আল্লাহ তা’আলা চান যেন আপনার এই রোযার সময়টি পূর্ণ হয় এবং তাকবীর দ্বারা তাঁর নাম মহিমান্বিত হয়। একারণেই ঈদের দিন যখন আমরা শুনতে পাই তখন আমরা বলি, “ আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার” তিনি আমাদের হেদায়াত দান করেছেন এই জন্য আমরা আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি।

তিনি আমাদেরকে হেদায়াত দান করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য, রোজা রাখার জন্য, সালাত আদায় করার জন্য, সদকা করার জন্য এবং সমস্ত হুকুম পালন করার জন্য যা তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট এসেছে।

শুকরিয়া জ্ঞাপন করুন যাতে আমরা রমজানের পরে আরও বেশি নেক আমল বাড়াতে পারি। কারণ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:

“তুমি যদি কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি তোমার প্রতি আমার নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দেব”।

এটি কি উদযাপনের সময়?

এখন কেউ এখানে একটি প্রশ্ন করতে পারেঃ

“এটা কি উদযাপনের, খুশি হওয়ার এবং আনন্দে মেতে ওঠার উপযুক্ত সময় যখন আশেপাশে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে এবং সারা বিশ্বব্যপি একটা মহামারী লেগে আছে; বিশেষত আমাদের অন্যন্য মুসলিম ভাই বোনেরা যখন যুদ্ধে, দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত?”

এর উত্তর হলো

“হ্যাঁ, আমাদের অবশ্যই এটি উদযাপন করতে হবে। তবে যারা কষ্ট ভোগ করছেন তাদের কথা ভুলে গিয়ে নয়। বরং আমরা হৃদয়ের উপর ভিত্তি করে এমন কিছু উদযাপন করি, যা আমাদের হৃদয় থেকে আসে আল্লাহর প্রতি আমাদের বিশ্বাস, তাঁর প্রতি আমাদের আশা এবং তাঁর প্রতি আমাদের ভরসার কারণে যে, এই বিষয়গুলি অবশ্যই ভাল হয়ে যাবে”।

এবং এটি একটি নিরর্থক আশা নয় বরং আমাদের সেই বিশ্বাস রয়েছে এবং আমরা সেই বিশ্বাসের উপর কাজও করি; আমাদের সেই আশা আছে এবং আমরা তাদেরকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি যারা এর সমাধান নিয়ে আসতে পারবে।

তাছাড়াও, আমরা উদযাপন করব কারণ আমাদের উপর সর্বদা আল্লাহর অবিরত একটি নিয়ামত রয়েছে এবং এই নেয়ামতটি হলো কুরআন এবং এতে রয়েছে হেদায়াত। আল্লাহ বলেনঃ

“বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহে এবং তাঁর রহমতে – যাতে তারা আনন্দিত হয়, এটা তার থেকে উত্তম যা তারা জমা করে”।

রমজান শেষ হয়ে গেছে বিষয়টি এমন নয়, বরং এটি পরিবর্তনের একটি নতুন সূচনা।

ঈদের দিন নতুন একটি মাসের সূচনা ঘটে, আমরা যে পথে এগিয়ে চলেছি তার পথে একটি নতুন সুযোগ তৈরি করে।

আমি এমন একটি সূরার প্রতিচ্ছবি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই যা আমরা প্রায়শই পাঠ করি। রমজানের আগে, রমজানের ভিতরে এবং রমজানের পরের প্রতিটি নামাজের মধ্যে আমরা এটি তেলাওয়াত করি। এটি হলো সূরা আল-ফাতিহা।

আমাদেরকে এই সূরায় বলতে শেখানো হয়েছে: {আমরা কেবল আপনারই ইবাদত করি এবং কেবল আপনার নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করি} সুতরাং আমরা কেবলমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করি, আমরা রমজানের ইবাদত করি না, আমরা এই মাসে যে আধ্যাত্মিকতা উপভোগ করি তারও ইবাদত করি না ; বরং আমরা রমজানের রব, শাওয়াল এবং সারা বছরের রব আল্লাহর ইবাদত করি।

সুতরাং, রমজানে আমরা যে ইবাদত করেছি এবং সওয়াবের ভাগিদার হয়েছি, রমজান চলে গেলে তখন এই ইবাদত গুলো আমদের ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না।

এবং আমরা আমাদের ইবাদতের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি, এ কারণেই সাযায্য প্রার্থনার কথাটি ইবাদত করার পরে এসেছে।

এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এটিই শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমাদের নিয়মিত করা ইবাদত বা নেক কাজগুলোই আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়, কাজগুলো যত ছোটই হোক না কেন।

এরপর এই সূরাতে বলে হয়েছে, আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন।

কেন আমাদেরকে হেদায়াতের পথ প্রদর্শন করতে হবে?

সঙ্গবদ্ধভাবে পথ প্রদর্শন করার দু’আ আমদেররকে স্মরণ করিয়ে দেয় একত্রে থাকার গুরুত্ব কতটুকু। যেমনভাবে আমরা রমজানে বা অন্যসময় মসজিদে সঙ্গবদ্ধভাবে একত্রিত হই এবং আমাদের ঈমানদার ভাইদের সাথে সময় কাটায় যারা আমাদের মত একই পথের পথিক যাতে করে তারা আমাদেরকে সরল পথে চলতে সাহায্য করতে পারে।

তাহলে কেন আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শনের জন্য দু’আ করতে হবে যখন একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের এই বিশ্বাস আছে যে, আমরা ইতিমধ্যে সরল পথেই আছি, আমাদের কাছে কুরআনের মত হেদায়াতের গ্রন্থও আছে, আমদের কাছে নবীজীর সকল সুন্নাতও আছে? তাহলে কেন বারবার আমাদেরকে এই দু’আ করতে হবে, “(হে আল্লাহ!) আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন”?

হেদায়াতের(সরল পথের) ৪ টি ধাপ

ওলামায়ে কেরামগণ হেদায়াতের(সরল পথের) বা সীরাতে মুস্তাক্বিমের ৪টি ধাপের কথা বলেছেনঃ

১। ইলম (জ্ঞান)

এই ৪ টি ধাপের প্রথম ধাপ হলো, ঐ সকল বিষয়ের ইলম(জ্ঞান) অর্জন করা যেগুলো আপনাকে আবশ্যকীয়ভাবে পালন করতে হবে। আমরা কেন ইবাদত করি তা জানতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষেরই এই বিষয়ে পর্যাপ্ত ইলম(জ্ঞান) নেই।

২। আগ্রহ

এরপর হেদায়াতের এমন একটি স্তর আছে যেটি কোনো আমল করার প্রেরণা যোগায়। এটি আমাকে জানায় যে, আমাকে ইবাদত করতে হবে এবং এজন্য আমি ইবাদত করতে আগ্রহী হই। কত মানুষই তো আছে যাদের মনে আমলের এই আগ্রহটুকুও জাগ্রত হয় না।

৩। সামর্থ্য

৩য় স্তরটি হলো সামর্থ্য। কারণ, অনেক মানুষই এমন আছে যাদের পর্যাপ্ত ইলম(জ্ঞান) আছে, অন্তরে প্রেরণাও আছে কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো আমল করার মত শারীরিক সামর্থ্য হয়ত তাদের নেই অথবা তারা হয়ত এমন কোনো পরিস্থিতির শিকার যার কারণে আমলটি ঠিক মত আঞ্জাম দিতে তারা অক্ষম।

৪। ধারাবাহিকতা

সুতরাং আমাদেরকে এই সকল স্তরের হেদায়াত চাইতে বলা হয়েছে এবং এর ৪র্থ স্তরটি হল কোনো আমল শুরু করলে সেই আমলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা। কারণ, এতেই আল্লাহর প্রকৃত সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব হয়।

আমরা এই চারটি স্তরের হেদায়াত আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, সরল পথের হেদায়েত প্রার্থনা করি। কারণ জীবন একটি পথ, জীবন একটি যাত্রা।

আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছি এবং আমদের অভিমুখ হলো আল্লাহর দিকে, আমরা প্রতিনিয়ত যাত্রা করছি আখিরাতের দিকে এবং এই পথটি খুবই কষ্টসাধ্য। এ কারণেই আমরা সরল পথে চলতে, সরল সোজা পথে নিজেরদের যাত্রাকে অব্যহত রাখতে আল্লাহর নিকট সীরাতে মুস্তাক্বিম বা সরল পথের চলার হেদায়াতের জন্য দু’আ করি।