আমাদের অতীত: ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান গড়েছিল সত্যিকারের এক বৈশ্বিক সভ্যতা

history

সময়টি ছিল অষ্টম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী। গোটা ইউরোপ তখন অন্ধকারে ডুবে ছিল। আমেরিকা তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। বিশ্বের পরাশক্তিরা, যেমনটি আজ আমরা জানি, সেগুলি আজকের তৃতীয় বিশ্বের সাথে তুলনীয় ছিল, অঞ্চলগুলি ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ। এবং ইতিহাস যেটি আমরা জানি বা অধ্যয়ন করি তা থেকে এটিই বুঝে আসে যে, আজকের তৃতীয় বিশ্ব তখনকার দিনের প্রথম বিশ্বের সাথে তুলনীয় ছিল। অষ্টম শতাব্দীর মধ্য থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্য পর্যন্ত যখন চারিদিকে ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল তখনকার দেশগুলি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশের এক চূড়ান্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল।

ইসলামী স্বর্ণযুগ

এই যুগকে ‘ইসলামী স্বর্ণযুগ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, এর ফলে পাবলিক হাসপাতাল, পাবলিক গ্রন্থাগার, জোতির্বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কফি, সাবান বার, টুথপেস্ট, শ্যাম্পু, ইনোকুলেশন (ভ্যাকসিন তৈরীর জন্য একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া), এবং এমন অনেক প্রযুক্তির আবিষ্কার ও ব্যবহার হয়েছিল যা অদ্যবধি অব্যহত আছে। এ সময়ে মুসলিমরা সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে এতটা উন্নতি করেছিল যে সেটি অধ্যয়ন করলে যে কেউই অবাক হতে বাধ্য হবে। এ সময় ইসলামী খেলাফতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পদের সুষম বন্টন ও সাম্রাজ্যে ন্যয়বিচার প্রতিষ্টা।

এ সময়ে কবি-সাহাত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, পন্ডিত, চিত্রকর, বণিক, দার্শনিক, ভূতত্ত্ববিদ, পর্যটক প্রমুখের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তারা সকলেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ পান্ডিত্য প্রদর্শন করে সমাজ ও মানবজাতির শিল্প-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, আইনশাস্ত্র, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে নিজেদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রেখে গেছেন। সেই সাথে স্থায়ী করে গেছেন ইসলামী খেলাফতের সুনামও।

তখনকার দিনে প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার একক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো আজকের দিনের দুর্বল এই মুসলিম সমাজ। বাগদাদ সহ ইসলামী খেলাফতের অনেক স্থানে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র। যেখানে এসে জড়ো হতেন বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলিম-অমুসলিম পন্ডিতরা। তারা যেমন একদিকে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে সমৃদ্ধ করতেন, তেমনি প্রাচীন বিভিন্ন শাখার জ্ঞানকে অনুবাদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করতেন। তাদের এ সকল কাজ যে আসলে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

সভ্যতার মিলনস্থল

কারণ শুধুমাত্র  সেসময়কার এসব স্কলারদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের জন্যই মানবজাতি অতীতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক অজানা অথ্য জানতে পেরেছে। প্রথমে সেগুলোকে আরবিতে অনুবাদ করা হলেও কালক্রমে তুর্কী, সিন্ধী, ল্যাটিন, ফার্সি, হিব্রু ইত্যাদি সহ বিশ্বের অন্যান্য ভাষাতেও অনুবাদ করা হয়। এর ফলে জ্ঞানের যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিলো তা আজ আমদের চোখের সামনে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, রোম, ভারত, চীন, গ্রীস, পারস্য, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, বাইজান্টাইন প্রভৃতি সাম্রাজ্যে এসকল জ্ঞানের অবাধ চর্চা হত।

তখনকার দিনের মুসলিম সমাজকে বলা হয়ে থাকে বিশ্বের ইতিহাসের প্রথম ‘সত্যিকারের এক বৈশ্বিক সভ্যতা’, যা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য বিশ্বের বহু প্রান্ত, ধর্ম, বর্ণ, মানসিকতা ও অভিজ্ঞতার মানুষের মিলন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। 

সে সময়ের মত আনন্দের উৎস হিসেবে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে যেন আজ আমরা আর দেখতেই পারছি না। এখন যারা জ্ঞান অর্জন ও চর্চা করে তাদের বেশিরভাগেরই উদ্দেশ্য থাকে জ্ঞান অর্জন করে উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করা আর তার মাধ্যমে সমাজে ভাল চাকরি পেয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। বর্তমানে, আমরা জ্ঞানকে  জাগতিক সুখের আশায় অর্জন করছি ও অনুসন্ধান করছি এবং এটি আমাদের জন্য চরম দুর্ভাগ্যজনক। আরও দুঃখজনক যে বিষয়টি সেটি হল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য আজ আমরা পশ্চিমাদের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর হয়ে পড়েছি। যে বিজ্ঞান চর্চায় একসময় আমাদের একচেটিয়া অধিকার ছিল আর আমরা নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে সে বিজ্ঞান চর্চায় অপরের উপর নির্ভর করে আছি। বিজ্ঞান চর্চাকে আজ আমরা আলাদা একটি সেক্টর হিসেবে কল্পনা করছি। যার কারণে জাগতিক বিষয়ে আজ আমাদের এই অধঃপতন। আমাদের অতীতকে স্মরণ করে আমরা যেন পুনরায় উজ্জীবিত হতে পারি সেই আশা নিয়েই এই নিবন্ধটি লেখা। আল্লাহ যেন আমাদের এই নিবন্ধ থেকে সঠিক বুঝ অর্জন করে আমাদের অতীতের প্রেরণাকে পুনরায় আমাদের নিকট ফিরিয়ে দেন।