আমাদের কৃতকর্মের ফল

© Sonyasgar | Dreamstime.com

জেনে বা না জেনে আমরা সকলেই গুনাহ করি। মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃতি থেকে এটি কখনই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। আমরা সকলেই হয়ত মাঝে মাঝে মিথ্যা বলে ফেলি বা সালাত মিস করি। তবে এগুলোই আমাদের জীবনে অনেকসময় মন্দ প্রভাব ফেলে।  

এটি আল্লাহর সুন্নাহ(ঐতিহ্য) যে, তিনি ভারসাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। আর গুনাহ করে আমরা নিজেরাই নিজেরদের উপর জুলুম করি। কিন্তু আল্লাহ এরপরও আমাদেরকে নিরাশ না হয়ে তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলেন। আল্লাহ বলেন, “বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (আল কুরআন-৩৯:৫৩) এ আয়াতের দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে বুঝাতে চান যে, গুনাহ মূলত নিজের উপরই জুলুম।

গুনাহের কারণেই মানুষের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। যেমনটি আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “তোমাদের উপর যেসব বিপদ-আপদ পতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক গোনাহ ক্ষমা করে দেন।“(আল কুরআন-৪২:৩০) 

গুনাহ এবং আমাদের জীবনে সমস্যাগুলির মধ্যে এই সম্পর্কটি উপলব্ধি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক সময় গুনাহের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আমরা ভুলে যাই এবং গুনাহের কারণে কোনো বিপদে পড়লে আমরা আল্লাহকে দোষারোপ করি। কিন্তু এটা যে আরও ভয়াবহ তা আমরা ভুলে যাই। আমরা যদি আমাদের সালাফ ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, সকল বিপদে তারা নিজেদের আমলকেই দোষারোপ করতেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁর দিকে ফিরে যেতেন।

এই বিষয়টি তাদের বিবৃতি এবং কর্মের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম শাফিয়ি(রহঃ) তাঁর বিখ্যাত কবিতা উল্লেখ করেছেন যেখানে তিনি জ্ঞান অন্বেষণে তাঁর দুর্বল স্মৃতি সম্পর্কে তাঁর শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তখন তাঁর শিক্ষক তাঁকে গুনাহ বন্ধ করার পরামর্শ দেন। ইমাম আবু হানীফা(রহঃ) যখন ফিকহের কোনো বিষয় সমাধান করতে পারতেন না,তখন তিনি তাঁর গুনাহকে দোষারোপ করতেন এবং উঠে ২ রাকাআত তওবার নামাজ আদায় করতেন। প্রকৃতপক্ষে, এই বাস্তবতাটির উপলব্ধি প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের কাছে এতটা গভীর ছিল যে, তাদের স্ত্রী অবাধ্য হলেও তারা নিজেদের গুনাহকেই দোষারোপ করতেন।  গুনাহের এই ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আব্দুলাহ ইবনে আব্বাস(রাযিঃ) বলেছেন,

“সৎকর্ম চেহারাকে আলোকিত করে, অন্তরকে আলোকিত করে, দেহ ও মনকে শক্তিশালী করে তোলে এবং মানুষের অন্তরে তাঁর জন্য ভালবাসা সৃষ্টি করে। অপরদিকে মন্দকর্ম চেহারাকে অন্ধকার করে দেয়, অন্তরকে অন্ধকার দেয়, শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা সৃষ্টি করে, এবং মানুষের অন্তরে তার জন্য ঘৃণা সৃষ্টি করে।”

সুতরাং, সৎকর্ম ফলস্বরূপ ভাল কিছু নিয়ে আসে এবং মন্দকর্ম ফলস্বরূপ মন্দ কিছু নিয়ে আসে। এটি কুরআনেরও নীতি যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার, পুরুষ হোক কিংবা নারী আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেব যা তারা করত” (আল কুরআন-১৬:৯৭) এবং তিনি আরও বলেছেন, “এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব” (আল কুরআন-২০:১২৪)

অনুরূপভাবে আমাদের মন্দ কর্মের প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন,

স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে” (আল কুরআন-৩০:৪১)

সুতরাং, আমাদের গুনাহের কারণে আমাদের উপর যেসকল ক্ষতিকর বিষয় আসে তা মূলত আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের জন্য রহমতস্বরূপ। কেন? কারণ এগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েও আমরা যেন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে পারি। আরও বড় বিষয় হচ্ছে এসকল ক্ষতির মাধ্যমে আল্লাহ মুমিনের গুনাহ মাফ করতে থাকেন। এতকিছুর পরও আমরা যদি ফিরে না আসি তাহলে আখিরাতে আমাদের জন্য শাস্তি অপেক্ষা করছে। আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“মুমিনের পায়ে যদি কোন কাটাও বিদ্ধ হয়, এর দ্বারাও তাঁর গুনাহ মাফ করা হয়” [মুসলিম]

এসকল বিষয়কে সামনে রেখে আমাদের উচিত বাস্তবতাকে উপলব্ধি করা, গুনাহের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন থাকা, আল্লাহর কাছে তওবা করতে থাকা এবং নেককাজ সমূহকে বৃদ্ধি করা। সুতরাং, কোনো গুনাহ করার আগে তার ফলাফল ও ভয়াবহতা সম্পর্কে কয়েকবার চিন্তা করুন। এতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অনেকটা সহজ হবে।