আমাদের জীবনে দু’আর গুরুত্ব

Prayer
ID 183901510 © Batuhan Toker | Dreamstime.com

দু’আ হল এক প্রকার স্বেচ্ছাসেবী প্রার্থনা যার মাধ্যমে ঈমানদাররা সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে অনুনয়-বিনয় করে থাকে যাতে তাকে কষ্টের সময়ে সাহায্য করা হয়, তার পাপগুলি ক্ষমা করা হয়, তার দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। এটি আধ্যাত্মিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং সমস্ত একেশ্বরবাদী ধর্মেই এর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহর কাছে দু’আ করার সময় এই বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে স্মরণ রাখতে হবে যে, আমরা আল্লাহর কাছে সকল দিক থেকে মুখাপেক্ষী; কিন্তু আল্লাহ সকল কিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। সুতরাং এটিই হল আল্লাহর কাছে আমাদের দু’আ করার প্রেরণা যার মাধ্যমে আমরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি।

আল্লাহর প্রতি ভয় এবং আবেগকে সামনে রেখে হৃদয় থেকে আসা যে কোনো আন্তরিক মৌখিক অভিব্যক্তি দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যায়। যদিও অনেক সময় আল্লাহর কাছে দু’আ করার সময় আমাদের মন থেকে হয়ত দু’আ আসে না। কিন্তু এটা স্মরণ রাখা দরকার যে, আল্লাহ সে দু’আকেই কবুল করে থাকেন যেটি তাঁর প্রতি মনোযোগী হয়ে চাওয়া হয়, যেমনটি আহলুল বাইত রাযিঃ থেকে বর্ণিত আছে।

সুতরাং, দু’আর অর্থ এটা নয় যে, মুখ থেকে কিছু সুন্দর কথা উচ্চারিত হল কিন্তু মনোযোগ সেদিকে নেই; বরং দু’আ তো সেটা যা সাধারণ কিছু কথা দিয়ে হয়ত চাওয়া হয়, কিন্তু মন সেই কথার প্রতি নিবদ্ধ থাকে। এটি এমন একটি অভিব্যক্তি যা ঈমানদারেরা তাঁর রবকে ভালোবেসে শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে সর্বদা তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। এটি এমন একটি মুহূর্ত যা বান্দাকে তাঁর রবের নিকটবর্তী করে।

মুমিন যখন সকল অবস্থার মধ্যে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে থাকে তখন আল্লাহ ও তার মধ্যকার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতে থাকে।

দু’আ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা আমাকে ডাক, আমি (তোমাদের ডাকে) সাড়া দেব” (আল কুরআন-৪০:৬০) এখানে আল্লাহ আহ্বায়ক হয়ে আমাদেরকে ডাকতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।

দু’আকারীর জন্য কিছু ভাল শিষ্টাচার কুরআনে বর্ণিত হয়েছে যেমন আন্তরিকতা (৪০:১৪), ভয় ও আশা (৭:৫৬), ভয়, আশা ও বিনয় (২১:৯০) ইত্যাদি। আরেকটি অনুপ্রেরণামূলক বৈশিষ্ট্য যা উল্লেখ করা হয়েছে, “বল তো কে নিরূপায়ের ডাকে সাড়া দেন যখন সে ডাকে এবং কে কষ্ট দূরীভূত করেন?…”(আল কুরআন-২৭:৬২)। এই আয়াত বোঝা যায় যে, দুর্ভোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ডাকে সহজেই আল্লাহ সাড়া দেন। প্রকৃতপক্ষে দু’আ হল আল্লাহর কাছে প্রার্থনার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাধ্যম। এটি ঈমানের শুদ্ধতম ধারণাটি প্রকাশ করে, ঈমানকে জীবিত রাখে এবং প্রতিটি মুহুর্তে এটি ঈমানকে শক্তিশালী করে।

কিছু মুমিন বান্দা আছেন যারা মুখস্ত কিছু দু’আ পরে যান, কিন্তু তারা যে কি বলছেন তা তারা উপলব্ধিও করেন না। প্রকৃতপক্ষে এটিকে দু’আ বলে না। দু’আ সেটি যা বুঝে শুনে উপলব্ধি করে আল্লাহর নিকট চাওয়া হয়, যেমনটি আহলুল বাইত রাযিঃ আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন।

হ্যাঁ এটা অবশ্য ঠিক যে, কুরআনের ভাষা যেহেতু আরবি তাই আরবীতে দু’আ করলে সেটিই বেশি ভাল হবে এবং কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিসে অনেক দু’আ বর্ণিত আছে যেগুলি সবই আরবীতে। তাই আরবীতে দু’আ করা অবশ্যই ভাল, কিন্তু এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আর এটি আমাদের রবের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি পুরষ্কার যে, আমরা যে ভাষাতেই দু’আ করি না কেন আল্লাহ তা শুনে থাকেন এবং তার উত্তরও দেন।

আজ কোনো মুসলিমের অন্তরেই এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। এটা সত্য যে, কুরআন আরবী ব্যকরণ শাস্ত্রের অনেক উচ্চ পর্যায়ের ভাবভঙ্গীতে রচিত যেটির সমপর্যায়ের কোনো লেখক বা কবি কোনোদিনও কিছু রচনা করতে পারেনি। আর এটি হল কুরআনের একটি অনন্য মু’জিযা। কিন্তু সকল মানুষের পক্ষে যেহেতু এরকম ব্যকরণ শাস্ত্রে পন্ডিত হওয়া সম্ভব নয় তাই ইসলামও এই দাবি করেনি। বরং আল্লাহর নিকট বান্দা যে ভাষাতেই দু’আ করুক না কেন আল্লাহ তার জবাব দিয়ে থাকেন। তাই আরবী ভাষা পরিপুর্ণ রপ্ত না করতে পারলে যে আমরা দু’আ করতে পারব না বিষয়টি মোটেও এমন নয়। তবে এটি সত্য যে, যে ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম দু’আ করেছেন, আহলুল বাইত রাযিঃ দু’আ করেছেন নিঃসন্দেহে সেটিই শ্রেষ্ঠ ভাষা।