SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

আমেরিকায় ইসলাম: অনৈক্য ও ঐক্যের অদ্ভুত মেলবন্ধন

আমেরিকা ০২ ফেব্রু. ২০২১
জানা-অজানা
আমেরিকায় ইসলাম
BOCA RATON, FLORIDA, USA: DECEMBER: Assalam Center mosque with a beautiful golden dome. A mosque is a place of worship for Muslims as seen on December 10, 2019. © Jillian Cain | Dreamstime.com

আমেরিকা ও ইসলাম ধর্মের সম্পর্কের সঙ্গে বিরিয়ানি ও এলাচের খানিক মিল রয়েছে। অথচ তথ্যের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম ধর্ম ইসলাম। আমেরিকায় ইসলাম ধর্মের লক্ষাধিক মানুষ বাস করেন। ২০১৭ সালের এক সমীক্ষা অনুসারে দেখা গিয়েছে ৩.৪৫ মিলিয়ন ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষ বাস করেন এ দেশে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুসারে এঁদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ সুন্নি, ১১ শতাংশ শিয়া এবং ২৪ শতাংশ এই আহমেদিয়া ও অন্যান্য মুসলমান।

আমেরিকায় ইসলামের প্রবেশ

ঠিক কবে কীভাবে এই দেশে শান্তিপূর্ণ ইসলাম ধর্মের প্রবেশ ঘটে তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বেশ মতানৈক্য রয়েছে। কারোর মতে, বর্তমানের নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনা যে অঞ্চল, সেখানে ষোড়শ শতকে ইসলাম প্রথম পা রাখে। আফ্রিকা থেকে যে সমস্ত মানুষদের দাসব্যবসার জন্য আনা হয়েছিল, তাঁদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে হজরত মহম্মদ (সাঃ)-এর বাণী। যদিও তাঁদের জোর করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল।

এরপর সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগে তুরস্কের কিছু শরণার্থী অন্যান্য ইউরোপীয় শরণার্থীর সঙ্গে আমেরিকায় ইসলাম প্রবেশ করে। এরপর ক্রমশ অন্যান্য ইসলাম প্রধান দেশের সঙ্গে এই দেশের কিছু কিছু অঞ্চলের বাণিজ্য শুরু হয়।

আমেরিকায় ইসলাম-এর প্রবেশ নিয়ে বলতে গেলে বলা যায়, শেষ পর্যন্ত ১৮৭৮ সাল থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে বলকান অঞ্চল ও সিরিয়া থেকে অনেক ইসলাম ধর্মের মানুষ এ দেশে বসবাস করতে শুরু করেন। কথিত আছে, বিখ্যাত ফোর্ড কোম্পানি তখন তাঁদের কারখানায় অনেক ইসলাম ধর্মের মানুষকে চাকরি দিতেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে ইসলাম আমেরিকার জন সমুদ্রের সঙ্গে মিশে যায়। মসজিদ ও ইসলাম কমিউনিটি সেন্টার গঠন করেন আঞ্চলিক মুসলমানরা। ইসলাম একটি নতুন ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় এ দেশে। কেউ কেউ বলেন, মহোমেতান শব্দটি তখন ব্যবহার করা হত মুসলমান বোঝাতে।

ইসলাম ও আমেরিকার সম্পর্কের টানাপোড়েন

ইসলামী দেশ থেকে যে সমস্ত বণিকরা এদেশে আসতেন তাঁরা প্রথমে এদেশে থেকে যাওয়ার কথা ভাবেননি। বাণিজ্য করে নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়াই ছিল তাঁদের মুল লক্ষ্য। কিন্তু ক্রমশ এদেশের সাফল্যের আকর্ষণ ও নানাবিধ সুযোগ সুবিধার ফলে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

যদিও আমেরিকার সংবিধানে বড় বড় করে লেখা আছে দেশটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। তবুও, আমেরিকার সামাজিক গঠনে ধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ছয়ের দশকের শুরুতে নতুন শরনার্থী আইন সূচিত হয়, এর সঙ্গে সমাজে প্রভাব ফেলে নাগরিক অধিকারের আন্দোলন। এর ফলে তৎকালীন আফ্রো-আমেরিকান মুসলমানরা একটু স্বাচ্ছন্দ্য পেয়েছিলেন। নয়তো খুব সহজেই বলা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় আমেরিকার মুসলমানদের পক্ষে নিজেদের আলাদা পরিচয় স্থাপন করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ, নিজেদের দেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ অন্য একটি দেশে অন্য পরিবেশে ও অভ্যাসে মানিয়ে নিতে হয়েছিল তাঁদের।

কোথাও গিয়ে এখনও এই মানিয়ে নেওয়ার বেশ খানিকটা রয়েছে গিয়েছে আমেরিকার মুসলমানদের মধ্যে। এদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষদের এটা বুঝতে হবে যে আমেরিকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তাঁদের অধিকার নিয়ে জোর গলায় সোচ্চার হওয়া তাঁদের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১১ সেপ্টেম্বরের ঐ ধ্বংসাত্মক ঘটনার পর আমেরিকার মুসলমানদের অবস্থান দুইরকম হয়ে গিয়েছে। একদিকে মুসলমানদের প্রতি রাষ্ট্রের বিশ্বাস অবিশ্বাসের একটা দোলাচলের জায়গা তৈরি হয়েছে। নানা জায়গায় ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষদের নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠেছে। এর ফলে, মুসলমানদের অনেক অধিকার সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে অন্যধর্মের মানুষ ইসলামের প্রতি কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। ইসলাম নিয়ে পড়াশুনোর হার বেড়েছে। মানুষ বুঝতে পারছে জিহাদ মানেই সন্তাসবাদ নয়। ইসলাম যে আসলে শান্তির বানী প্রচার করে তা জানার পর অনেক মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হচ্ছেন। এছাড়া আমাদের ধর্মের ‘মিনিমালিস্টিক অ্যাপ্রোচ’ অন্য ধর্মের মানুষকে শান্তির পথ দেখাচ্ছে।

সুতরাং সমস্যা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকায় ইসলাম ক্রমশ দৃঢ় ভাবে নিজের স্থান করে নিচ্ছে। আমাদের ইসলামী জ্ঞান, নিয়ম নীতি প্রতি মুহূর্তে আমাদের উন্নত মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়। সেই শিক্ষার মাধ্যমেই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পার করতে পারে একজন সহিহ ঈমানদার মুসলমান।

কোন কোন ক্ষেত্রে আমেরিকান মুসলমানদের সোচ্চার হওয়া উচিত

প্রথমত,

ইসলাম সম্পর্কে আমেরিকানদের মধ্যে যা যা ভুল ধারণা রয়েছে তার বিনাশ প্রয়োজন। শান্তির ধর্ম ইসলামকে কেউ কেউ ভুল করে সন্ত্রাসবাদ ভাবেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমেরিকার সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে মুসলমানদের প্রভাব অত্যন্ত কম। আমাদের হয়ে সোচ্চারে বক্তব্য রাখার মানুষ আরেকটু বেশি হলে ভাল হয়। এ দেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষদের অবস্থান, সমস্যা ও তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যেকটি ঈমানদার মুসলমান ভাইয়ের চিন্তা করা উচিত। এ আমাদের উম্মাহর প্রতি আমাদের জিম্মাদারি।

দ্বিতীয়ত,

আমেরিকার অন্য ধর্মের মানুষদের বোঝাতে হবে যে পৃথিবীর সমস্ত কিছু একই নিয়মে চলে না। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির নানা অন্য নিয়ম রয়েছে বা অন্য পন্থা রয়েছে। সমাজের নানা আঙ্গিকে ইসলামের পন্থা সম্পর্কে মানুষকে সম্যক অবহিত করতে হবে। ইসলামের প্রাচীন ও প্রয়োগিক নীতি সকলের জানা উচিত।

এর ফলে অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে ইসলামের ফারাক কমে আসবে। মুসলমান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সুযোগ আমেরিকার অন্য ধর্মের মানুষের বিবেকের কাছে ন্যায় বিচারের আবেদন করা।

তৃতীয়ত,

এই দেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষদের মধ্যেও অনেক সময় বিভেদ দেখা যায়। এটি ত্যাগ করতে হবে। আমাদের প্রিয় নবী সবসময় একজোট হয়ে উম্মাহর উন্নতির কথা ভাবতে বলেছেন। আজ আমেরিকার রাজনীতিতে ইসলামের গুরুত্ব কম হওয়ার কারণ এই বিভেদ। বিভিন্ন ইসলামী সংস্থাগুলির একে অপরের সঙ্গে সংযোগ ঠিক রাখা শ্রেয়।

এছাড়া উম্মাহর জন্য অর্থ সংগ্রহ, সঠিক রাজনৈতিক জ্ঞান সংগ্রহ এগুলি মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য। আমেরিকা অন্যদের মতো মুসলমানদেরও দেশ, সেখানে যাতে কিছুতেই কোণঠাসা হয়ে বাঁচতে না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা আমাদের কর্তব্য।

ইসলাম সংখ্যালঘু অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকায় ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ কিন্তু আদতে বেশ কম। কমে আসছে অনলাইন বিদ্বেষের প্রকোপ। এরপরে শুধুমাত্র আমাদের সৎ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারবে পয়গম্বরের এই পবিত্র ধর্ম।