আরবদের কনস্ট্যান্টিনোপল দখল: ইসলামী ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

ইতিহাস Contributor
ফোকাস
আরবদের কনস্ট্যান্টিনোপল দখল
© Evgenii Kazantsev | Dreamstime.com

ঐতিহাসিকরা বলেন, বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল-এর বহু রাজনৈতিক শক্তির নজর থাকলেও সর্বপ্রথম আরবরাই এই শহর দখল করতে সক্ষম হয়। সপ্তম শতকে ঘটে যাওয়া এই আক্রমণ আসলে আরব- বাইজান্টিয়াম সংঘর্ষের অন্যতম এক উদাহরণ। এর ফলেই আরব সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। অন্যদিকে, বাইজান্টিয়াম সভ্যতা অস্তাচলে যায়।

আরবদের কনস্ট্যান্টিনোপল দখল ও তার ইতিহাস

সালটা ৬৩৬ অব্দ, ঈয়ারমুক নদীর ধারে রশিদুন সাম্রাজ্যের মুসলমান সৈন্যদের হাতে হেরে গেল শক্তিশালী বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের এক বাহিনী। কনস্ট্যান্টিনোপলের তৎকালীন শাসক ছিলেন সম্রাট হারকিউলিস। আরবদের শহর দখল অবসম্ভাবি জেনে তিনি তড়িঘড়ি লেভান্ত শহর খালি করে দেওয়ার নির্দেশ দেন। শহরের বেশিরভাগ মানুষ এশিয়া মাইনরের দিকে যাত্রা শুরু করেন। আর ইতিমধ্যে, রশিদুন সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে প্রবেশ করে শহরে। এর ফলে, আরবদের পক্ষে সিরিয়া ও মিশর দখল সম্ভব হয়।

আরব সৈন্যরা ছিল যুদ্ধে কুশলী। তাদের আক্রমণের পন্থা ছিল ভিন্ন। তারা প্রথমে আক্রমণ করে মরুভূমিতে গা ঢাক দিত। শত্রুসৈন্য ধন্দে পড়ে মরুভূমিতে পা রাখলে সেখানেই যুদ্ধের ফয়সালা হয়ে যেত। তাছাড়া, আরব সৈন্যরা খুব সহজেই স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিশে যেতে পারত। আমাদের প্রিয় নবীর বাণী ও ইসলামী আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয়েই আরবরা কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করতে সক্ষম হয়।

সেনাধ্যক্ষ প্রথম মুয়াবিয়ার যুদ্ধ কৌশল

সেনাধ্যক্ষ প্রথম মুয়াবিয়ার কাছে কনস্ট্যান্টিনোপল দখল করা ছিল দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষা। তিনি নিখুঁত পরিকল্পনা করে যুদ্ধজয় করেছিলেন।

আরবরা তার নির্দেশে খুব ধীরে এই অভিযান চালায়। কনস্ট্যান্টিনোপল বৃহৎ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। প্রতি বসন্ত ও শরতে আরব সৈন্যরা এই পাঁচিল ঘেরাও করত। এছাড়া মুসলমান নৌ বাহিনী বাইজান্টিয়াম নৌ বাহিনীর সঙ্গে পাল্লা দিত। মূলত নৌ যুদ্ধের মাধ্যমেই মুয়াবিয়া জয়লাভ করে। ৬৫৫ অব্দে বিখ্যাত ফিনিক্সের যুদ্ধে বাইজান্টিয়াম নৌ বহরকে ধ্বংস করে আরবীয় বাহিনী।

কিন্তু তৎকালীন রশিদুন খিলাফতের খলিফা উথমানের গুপ্তহত্যার পর খিলাফতের অবস্থা খানিক টালমাটাল হয়ে পড়ে। সাম্রাজ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে মুয়াবিয়াকে বাহিনী সমেত ফেরত যেতে হয়। শুধু তাই নয়,৬৫৯ অব্দে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্যের সঙ্গে শান্তিচুক্তিও স্বাক্ষর করেন তিনি।

আরবদের কনস্ট্যান্টিনোপল পুনরায় আক্রমণ

৬৬১ অব্দে, ইসলামে গৃহযুদ্ধ শেষ হলে মুয়াবিয়া আবার বাইজান্টিয়াম দখলের জন্য বাহিনী পাঠান। ততদিনে রশিদুন খিলাফতের স্থান নিয়েছে উম্মাইয়া খিলাফত। স্বয়ং মুয়াবিয়া তার প্রতিষ্ঠাতা। ৬৭০ অব্দে, আরব সেনা কনস্ট্যান্টিনোপলের বিপরীতে এশিয়ান তীর দখল করে। ঠিক তার পরের বছর প্রায় ৫০০ জাহাজের এক বহর দারদানেলিস দিয়ে যাত্রা শুরু করে। এই বহর সাইজিকাস উপদ্বীপে একটি নৌবাহিনীর ঘাঁটি তৈরি করে।

এরপরেই মুয়াবিয়া তাঁর সর্বেশেষ আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করতে থাকেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল উপকূলীয় অঞ্চল থেকে কনস্ট্যান্টিনোপলকে আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করে দেওয়া। সাইজিকাস উপদ্বীপে ইসলামী নৌ ঘাঁটি থাকায় এমনিতেই শহরের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছতে সমস্যা হচ্ছিল।

৬৭২ অব্দে, মুয়াবিয়া তিনটি বিশাল নৌ বাহিনী পাঠান। এই নৌ বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়া ও ঈজিয়ন সমুদ্রে ঘাঁটি তৈরি করা। তৎকালীন কনস্ট্যান্টিনোপলের শাসক সম্রাট চতুর্থ কনস্ট্যান্টাইন নব্য আবিষ্কৃত অস্ত্র ‘গ্রিক আগুন’-এর মাধ্যমে মুসলমান নৌ বহরকে আটকাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর প্রয়াস ব্যর্থ হয়। ৬৭৩ অব্দে, সিলিসিয়া প্রদেশের তারসুস ও রোডস দ্বীপ আরবদের দখলে আসে।

আরবদের কনস্ট্যান্টিনোপল দখল

শেষ পর্যন্ত, ৬৭৪ অব্দে পূর্ব ঈজিয়ন সাগর থেকে আরব বাহিনী মর্মর সাগরে প্রবেশ করে। তাদের প্রথম ঘাঁটি হয় হেবডোমন প্রদেশের থ্রাশিয়ান উপকূল। তারপরেই শুরু হয় বাইজান্টিয়াম বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমর। বাইজান্টিয়াম বাহিনী একসময় ধীরে ধীরে পিছু হটতে থাকলে কনস্ট্যান্টিনোপল শহরে পা রাখে আরব সেনাবাহিনী।

যদিও ৬৭৭ অব্দে সম্রাট চতুর্থ কনস্টান্টাইন আবার আরবদের থেকে শহর দখল করে নেন, তাও বলা যায় যেটুকু সময় এই প্রাচীন শহর ইসলামের ছায়ায় ছিল সেটুকু সময় এখানে পবিত্র ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়েছিল মানুষের মধ্যে। আরবদের কনস্ট্যান্টিনোপল দখল ইসলামী ইতিহাসে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখে গিয়েছে।