আরবী রেনেসাঁস: মুসলিম ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় অজানা অধ্যায়

সংস্কৃতি Contributor
ফিচার
আরবী রেনেসাঁস

আরবী রেনেসাঁস বা আল-নাহদা শুরু হয়েছিল উনবিংশ শতকে এবং মিশরে তা শুরু হয় বিংশ শতকের প্রথম দিকে, এবং তারপরে তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে উসমানীয় শাসনের অন্তর্ভুক্ত আরব এলাকাগুলিতে, যেমন- লেবানন, সিরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশে। আল-নাহদা শব্দের অর্থ হল রেনেসাঁস বা বিশেষ কোনও কিছু যেমন, শিল্প, সাহিত্য, বা সঙ্গীতের প্রতি আগ্রহ। কীভাবে, কখন এবং কেন আরব জগতে এই রেনেসাঁসের জন্ম হয়েছিল এবং এর পিছিনে কোন পরিস্থিতি দায়ী, তা-ই মূলত এখানে আলোচনা করা হবে।

আরব এলাকাগুলির ইতিহাসে এই সময়টি ছিল সংস্কার এবং আধুনিকীকরণের সময়কাল। যদিও কিছু সমালোচক মনে করেন যে, নেপোলিয়ানের মিশর অভিযান (১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দ)-এর ফলে যে সাংস্কৃতিক অভিঘাত তৈরি হয়েছিল, তারই ফলশ্রুতি ছিল এই রেনেসাঁস।

ঐতিহ্যবাহী স্কলারশিপের ক্ষেত্রে নাহদা-কে দেখা হয় পশ্চিমী প্রভাবের ফলে ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং এর সাথে যোগসূত্র রয়েছে তানজিমাতের, যে সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সংস্কার হয়েছিল এবং মিশর ও সাইরো-লেবাননে রাজনৈতিক অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও সাম্প্রদায়িক সংস্কার করা হয়েছিল। আরবী রেনেসাঁস বা আল-নাহদা প্রায় একই সময় মিশর এবং গ্রেটার সিরিয়াতে শুরু হয়েছিল ও দুইটি দেশকেই ভিন্ন ভাবে প্রভাবিত করেছিল, যেহেতু এই দুইটি দেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। মিশরে রেনেসাঁসের মূল কেন্দ্র ছিল রাজনৈতিক, কিন্তু গ্রেটার সিরিয়ার ক্ষেত্রে এর কেন্দ্র ছিল মূলত সংস্কৃতি।

আরবী রেনেসাঁস বা নাহদা-র মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন আরব সমাজকে ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ, নগরায়ন, বিজ্ঞান মনস্কতা এবং স্বতন্ত্রীকরণ। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন সেই আমলের নেতারা। তাঁরা চেয়েছিলেন যাতে আরব দুনিয়া পশ্চিমী দেশগুলির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতি ও ইসলামের অনুশাসনে চলা শাসকরা রেনেসাঁসের প্রভাবে নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেই, তাঁদের এই লক্ষ্য সফল হওয়া সম্ভব ছিল।

আরবী রেনেসাঁস ও রিফা’আ রফি’ এল-তাহতায়ি (১৮০১-১৮৭৩)

ইনি ছিলেন একজন মিশরীয় বিদ্বান এবং তাঁকেই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের রেনেসাঁসের জনক বলা হয়। পশ্চিমী বিজ্ঞান ও জনগণকে শিক্ষিত করার জন্য পশ্চিমী দেশগুলির কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন সেই বিষয়ে জ্ঞানলাভ করার জন্য মুহাম্মদ আলি পাশার সরকার তাঁকে প্যারিসে পাঠিয়েছিল। যদিও প্রকৃতপক্ষে তাঁকে প্যারিস মিলিয়ারি অ্যাকাডেমির মিশরীয় ক্যাডেটদের জন্য ইমাম হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি ফরাসী সমাজ এবং সরকার সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি ফরাসী ভাষা শিখেছিলেন এবং বহু ফরাসী বইয়ের আরবী অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর বই তখলিস আল-ইবরিজ ফি তলখিস বারিজ (অনুবাদ করলে মানে হবে দ্য কুইন্টএসেন্স অফ প্যারিস), এটি হল মূলত একজন মিশরীয় মুসলমানের নজরে ফ্রান্স ও ইউরোপের বর্ণনা। তাঁর মুক্ত চিন্তাভাবনাই মূলত আল-নাহদার বীজ বপন করেছিল।

আরবী রেনেসাঁস ও বুতরুস আল-বুস্তানি (১৮১৯-১৮৯৩)

লেবানিজ ম্যারোনাইট ক্রিশ্চান পরিবারে ১৮১৯ সালে তাঁর জন্ম হয়েছিল। বুতরুস আল-বুস্তানি ছিলেন একজন বহুভাষী, শিক্ষাবিদ, আন্দোলনকারী এবং বেইরুটে উনবিংশ শতকের মধ্যভাগে রেনেসাঁসের প্রাণবিন্দু। আমেরিকান মিশনারী এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তিনি প্রোটেস্ট্যান্ট হিসেবে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং স্থানীয় প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের নেতার পদে আসীন হয়েছিলেন। আমেরিকান মিশনারীদের সাথে বাইবেলের আরবী অনুবাদের কাজ প্রধানত তিনিই করতেন।

১৮৬০ সালে যখন ড্রুজ-ম্যারোনাইট সংঘর্ষ শেষ হয়, তখন এর প্রভাবে কনফেশনালিজমের উদ্ভব হয় এবং এই পরিস্থিতিতে বুতরুস আল-বুস্তানি একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যার নাম ছিল আল-মাদ্রাসা আল-ওয়াতানিয়া বা দ্য ন্যাশনাল স্কুল, এর মূল ভিত্তি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। এই স্কুলগুলিই ভবিষ্যতের সেই নেতাদের শিক্ষাদান করেছিল, যাঁরা পরবর্তী কালে নাহদা-তে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বহু স্কুলের একাধিক পাঠ্যবই ও অভিধানের সংকলন এবং প্রকাশনা করেছিলেন, যে কারণে তাঁকে আরবী রেনেসাঁসের মাস্টার উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি একজন নির্ভীক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন এবং তাঁর আদর্শের উপরে ভিত্তি করেই সিরিয়ার জাতীয়তাবাদ তৈরি হয়েছিল।

ধর্মের উপরে প্রভাব

জামাল আল-দিন আল-আফগানি (১৮৩৯-১৮৯৭) ছিলেন একজন ইসলামী আদর্শবাদী ও রাজনৈতিক কর্মী, তিনি ইসলামের আধুনিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন, যা মূলত উপনিবেশ-বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল এবং ইউরোপীয় শক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছিল। আরব রেনেসাঁসে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। জামাল আল-দিন আল-আফগানির শিক্ষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন মুহাম্মদ আবদুহ (১৮৬৫-১৯৩৫), এবং আরবী রেনেসাঁসে তাঁর ভূমিকাও অনবদ্য।

রাজনীতিতে প্রভাব

রেনেসাঁসের ফলে সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছিল সেই আমলের শাসকদের উপরে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনে এই প্রথম সংবিধান রচিত হয়েছিল এবং একে তানজানিয়াত সংস্কার আন্দোলনের সাফল্য বলেই মনে করা হয়। ১৮৭৬ সালে উসমানীয় শাসকরা সেই সময় সংবিধান রচনা করতে সম্মতি প্রদান করেছিলেন কারণ তাঁরা ইউরোপীয় শক্তিগুলির চেয়ে পিছিয়ে থাকতে চাননি। এবং এই সংবিধানের মূল ভিত্তি ছিল পশ্চিমী ধাঁচের শাসনরীতি। যদিও তৎকালীন উসমানীয় সম্রাট সেই সংবিধান কার্যকর করার সম্মতি দেননি, কিন্তু তা-ও এই সংবিধানের প্রভাব অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। পরবর্তী কালের এই এলাকার রাজনীতিতে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।