SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

আরাকানী বৌদ্ধদের হাত থেকে হিন্দুস্থানকে রক্ষা করেছিল মুঘল বাহিনী

এশিয়া ০৮ ফেব্রু. ২০২১
মতামত
আরাকানী বৌদ্ধদের
The Rohingya flag is the cultural and ethnic flag of the Rohingya people. isolated on sky background, Arakan State, Myanmar Burma, July 29, 2019 Photo 154473067 © - Dreamstime.com

আরাকান অঞ্চল এক সময় একটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল যা আরাকানী বৌদ্ধদের দ্বারা শাসিত হত। তাঁদের বলা হত থেরাভাদা বৌদ্ধ। তাদের প্রথমে বেষ্টন করেছিল বাংলার সুলতানেরা এবং পরে মুঘল সাম্রাজ্য। রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাসস্থান হল মূলত মায়ানমার, বরমার একটি বিশেষ অঞ্চল, যার নাম হল আরাকান। এই অঞ্চল রাখাইন রাজ্য নামেও খ্যাত, যা মধ্যযুগের সময় থেকে আধুনিক বাংলাদেশের দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্বাংশে যথেষ্ট রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই এলাকায় বিস্তীর্ণ পর্বতমালা বর্মার অবশিষ্ট অংশের থেকে আরাকানকে পৃথক করে রেখেছে, আর তার অপর প্রান্তে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এই অঞ্চলেই মুসলমিদের বসবাসের ইতিহাস জানা যায় অষ্টম শতক থেকে, যখন তাঁদের পূর্বপুরুষ আরব থেকে এখানে এসেছিলেন এবং রাজা মহা তাইং চন্দ্র (৭ ৮৮-৮১০ খ্রিস্টাব্দ) তাঁদের আরাকানে বসবসার করার অনুমতি প্রদান করেছিলেন।

আরাকানী বৌদ্ধদের সমৃদ্ধি 

সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে, আরাকান তার উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল রাজা সান্দা থুধাম্মা রাজত্বকালে। এর ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল চট্টগ্রামের উপকূল অঞ্চল থেকে শুরু করে সিরিয়াম পর্যন্ত। তার আগের শতকে, আরাকানীরা চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে তাঁদের বাণিজ্য শুরু করেছিল পর্তুগীজদের সাহায্যে। বাণিজ্যের ফলে এই প্রদেশের সম্পদ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, এই বাণিজ্যের মধ্যে দাস ব্যবসাও ছিল।

আরাকানী বৌদ্ধরা বিখ্যাত ছিল তাদের নৌচালনা এবং নৌযুদ্ধে দক্ষতার জন্য, এবং আরাকানের রাজারা কোনও সময়েই প্রতিবেশী মুঘল সম্রাটদের নিশ্চিন্ত থাকতে দেয়নি। বিভিন্ন সময়ে তাঁরা নিজেদের নৌসেনা বঙ্গদেশে পাঠাত এবং তাঁদের পথে যে সমস্ত জনপদ পড়ত সেগুলিতে তারা নির্দয় ভাবে লুঠপাট চালাত। আরাকানীরা ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাতেও লুঠপাট করেছিল এবং অনেককে বন্দি বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, এমনকী তাঁদের মধ্যে এক মুঘল সেনাপতির স্ত্রী-ও ছিলেন।

বারবার এই পথে আরাকানীরা আক্রমণ চালাতে থাকে এবং সেই সময় এদের ভয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত জনবিরল হয়ে পড়ে। এরা শুধু লুঠপাট চালিয়েই ক্ষান্ত হত না, পাশাপাশি বাসিন্দাদের বন্দি বানিয়ে নিয়ে যেত। এই হামলা চালাত মূলত আরাকানী এবং তাঁদের সঙ্গী পর্তুগীজরা (যাদের সেই আমলে ফিরিঙ্গি বলা হত), এখান থেকে বহু হিন্দু এবং মুসলিম পুরুষ, মহিলা এবং শিশুকে বন্দি বানিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের সর্বস্ব লুঠ করা হত। এই বন্দিদের মোটা টাকার বিনিময়ে ইউরোপে দাস হিসেবে বিক্রি করা হত।

আরাকানী বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবের প্রতিক্রিয়া

১৬৬৫ সালে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব শেষ পর্যন্ত এই আরাকানী বৌদ্ধ এবং পর্তুগীজ খ্রিস্টান দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং চট্টগ্রামে মুঘল অভিযান শুরু করেন। সেই সময় মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল আফগান-উজবেক-ইরান সীমান্তের বল্ক প্রদেশ থেকে বর্তমান যুগের জাভা পর্যন্ত।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা, শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৪ থেকে ১৬৮৮ পর্যন্ত বঙ্গদেশের মুঘল গভর্নর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন এবং ভাগ্নের সাম্রাজ্যের তাঁর যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। আওরঙ্গজেব জানতেন যে, আরাকান রাজ্য তাদের সেনাবাহিনী নতুন করে সাজাচ্ছে এবং প্রতি বছর তাদের নৌসেনাও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্রাট তাঁর মামা শায়েস্তাকে নির্দেশ দেন দ্রুত নৌবাহিনীর পুনর্বিন্যাস করার জন্য। সেই মতো পুরোনো নৌকাগুলি মেরামত করা হয় এবং বহু নতুন নৌকা তৈরি করা হয়, ঢাকা-যশোর এবং বঙ্গদেশের অন্যান্য নৌবন্দরে। নতুন করে নৌবাহিনীতে নিয়োগ করা হয় এবং দ্রুত তাদের সজ্জিত করে তোলা হয়, এবং যোগ্য লোকেদের নির্বাচন করে উঁচু পদে নিয়োগ করা হয়, যেমন অ্যাডমিরাল ইবনে হুসেন। মাত্র এক বছরের মধ্যে ৩০০টি নৌকা মজুত করে ফেলা হয় এবং মৌযুদ্ধের জন্য তাদের প্রস্তুত করা হয়।

দুই তরফের হামলা 

আওরঙ্গজেবের নির্দেশ অনুসারে, শায়েস্তা খাঁ ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেন। কারণ সেই সময়ে পর্তুগীজদের মতো ডাচদেরও ইন্দোনেশিয়ায় পোক্ত ঘাঁটি ছিল। ইন্দোনেশিয়ার এই ঘাঁটি থেকেই পর্তুগীজরা আরাকানী বৌদ্ধদের অর্থ, বাহিনী এমনকী আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করে সাহায্য করতেন। ক্রমশ ডাচেরা বুঝতে পারেন যে, মুঘল সম্রাটের সাথে সখ্যতা বজায় না রাখলে হিন্দুস্থানে বাণিজ্য করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন তারা পর্তুগীজদের সাথে মধ্যস্থতা করে এবং পর্তুগীজরা আশ্বাস দেয় যে, তারা আর আরাকানীদের কোনও রকম সাহায্য করবে না।

এরপরে শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে মুঘল নৌবাহিনীর অভিযান শুরু হয় এবং আরাকানী নিয়ন্ত্রণে থাকা সন্দ্বীপ নামক দ্বীপে প্রথম আক্রমণ করা হয়। আরাকানী এবং পর্তুগীজদের মধ্যে সেই সময় আর সখ্যতা না থাকার ফলে যুদ্ধের প্রকৃতি শীঘ্রই মুসলিম বাহিনীর অনুকূলে চলে আসে। আরাকানী রাজার রোষ থেকে বাঁচার জন্য পর্তুগীজরা সপরিবার ওই দ্বীপ ত্যাগ করে পালাতে শুরু করেন। তখন শায়েস্তা খাঁ আরাকানীদের হাত থেকে তাঁদের সুরক্ষা ও সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, এবং শীঘ্রই ১৬৬৫ সালের নভেম্বর মাসে সন্দ্বীপ দখল করে নেয় মুঘল বাহিনী।

মুঘলদের আরাকান জয় 

সেই বছরেরই ডিসেম্বর মাসে, শায়েস্তা খাঁচট্টগ্রামের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেন, যেখানে আরাকানী রাজ্যের ঘাঁটি ছিল। চট্টগ্রামে ক্রমাগত জল এবং স্থল, উভয় পথে হামলা চালানোর জন্য একটি শক্ত ঘাঁটির প্রয়োজন ছিল, সন্দ্বীপ সেই সমর্থন প্রদান করে। এরপরে মুঘল ও পর্তুগীজদের যৌথ বাহিনী আরাকানী বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। কিছু দিন যুদ্ধ চলার পরে ডাচরাও মুঘলদের সাহায্য করতে শুরু করে। তবে ডাচদের জাহাজ এসে পৌঁছনোর আগেই শায়েস্তা খাঁ আরাকানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেন। আরাকানী বৌদ্ধদের হাতে বন্দি থাকা কয়েক হাজার মুসলিম ও হিন্দু নাগরিককে উদ্ধার করা হয়। আরাকানীদের ত্রাস থেকে মুক্তি পাওয়ায়, হিন্দুস্থানের জনগণ উল্লাসে মেতে ওঠে। ধীরে ধীরে বঙ্গদেশে কৃষিকাজ ও বাণিজ্য শুরু হয়, অল্প সময়ের মধ্যেই এই এলাকা সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে।