আল্লাহর প্রতি অমনোযোগিতার ব্যথা

আমাদের জীবনের সকল আশা, ভরসা ও ভালোবাসা সাধারণত কোনো ব্যক্তির প্রতি নিবদ্ধ থাকে। জীবনের সকল কিছু তার সাথে আমরা শেয়ার করে থাকি। আমাদের সকল দুর্বলতা, গভীর ও গোপন বিষয় আমরা তার কাছে প্রকাশ করি। তার প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস নিবদ্ধ থাকে। কিন্তু একটা সময় আসে যখন আমরা বাস্তবতাকে বুঝতে পারি, আমাদের ভুল বুঝতে পারি যখন আমরা স্বার্থের কারণে এই ব্যক্তির মধ্যে কপটতা ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখতে পাই।  

যখন আপনি এরূপ ঘটনার মুখোমুখি হন তখন আপনার কষ্ট উপলব্ধি করার মত কেউ থাকে না।

এখন, আপনি নিজেকে এই ব্যক্তির মত অপরাধী হিসাবে কল্পনা করুন — যে কাউকে নিপীড়িত করার জন্য দোষী। আমরা নিজেরাই বলি যে, আমরা কখনই এমন চোগলখোর, অসৎ মানুষ হতে পারি না; তবুও, আমরা যদি একটু ঘনিষ্ঠভাবে তাকাই, তখন আমরা সম্ভবত এরূপ কপটতার জন্য নিজেকেও দোষীরূপে দেখতে পাব। আসুন আমরা একটু গভীরভাবে চিন্তা করি।

আমরা সাধারণত সালাত আদায় করলেও খুব অলসতার সাথে তা আদায় করি। আমরা প্রতারণা করি, মিথ্যা বলি, চুরি করি এবং গীবত করি। আমাদের জিহ্বা, চোখ, কান এবং সমস্ত অঙ্গের মাধ্যমে আমরা হারাম কাজে লিপ্ত হই। আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালবাসা ও ভক্তি প্রকাশ করার সময়ও আমরা আমাদের অন্তরকে এই ফিতনার জগত দুনিয়াতে ডুবিয়ে রাখি। তবে হ্যাঁ, এই ভালবাসা এবং নিষ্ঠা কোনো কোনো সময় বাস্তবও হতে পারে। এ সকল বিষয়েরই ফলস্বরূপ আমাদের জীবনে ও মনে অশান্তি বিরাজ করে। আমরা হয়ত কখনও তওবা করে ফিরে আসি; কিন্তু পরক্ষণেই আবার আগের গুনাহে লিপ্ত হয়ে যাই। এ কপটতার গুণ আমাদের সবার মাঝেই কমবেশি উপস্থিত আছে।

আল্লাহ তা’আলা হলেন ‘আল-গনি’, যিনি সম্পূর্ণরূপে কোনো প্রয়োজন থেকে মুক্ত, আমাদের আন্তরিকতার তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই; বরং তাঁকে আমাদের প্রয়োজন। সুতরাং, তাঁর প্রতি অসতর্ক হয়ে আমরা কেবল নিজেদেরকেই ক্ষতিগ্রস্ত করি, আমরা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ধাক্কা দিয়ে শেষ করি। হতাশা, যন্ত্রণা, ঘৃণা, অপরাধবোধ এবং আরও অনেক কিছু এর ফলস্বরূপ আমাদের মাঝে সৃষ্টি হয়। সুতরাং, আমরা যেমন আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে এমন কাউকে ঘৃণা করি, তেমনি আমাদের নিজেদের দিকেও একটু তাকানো দরকার যে, আমরা আল্লাহর সাথে প্রতারণা করছি না তো?

ইদানীং, আমি নিজেকে আমার আন্তরিকতা নিয়ে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সোশাল মিডিয়াতে কোনো আয়াত, হাদিস বা ধর্মীয় উক্তি শেয়ার করে আমি অনেক স্বস্তি অনুভব করতাম। আমি দেখতাম কেউ হয়ত একটি বিড়ালের ভিডিও তুলে শেয়ার করেছে, তবে এগুলিকে আমি অনর্থক মনে করতাম এবং এর পরিবর্তে কোনো আয়াত বা হাদিস শেয়ার করাকে আমি ভাল মনে করতাম। পরে আমি নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলাম যে, আসলে আমি যেগুলি শেয়ার করছি এগুলোর পিছনে আমার উদ্দেশ্য কি? আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এগুলি করছি নাকি দুনিয়াবি কোনো উদ্দেশ্যে এগুলি করছি? আমি ঐ ধরনের মুসলিম হতে চাই না যারা মানুষকে তো উপদেশ দেয় কিন্তু নিজেরা তার উপর আমল করে না। আমি প্রকৃত মুসলিম হতে চাই যার কথা ও কাজে মিল আছে, যে আল্লাহ তা’আলার হুকুম মানার প্রতি আন্তরিক।

প্রিয় বোনেরা ও ভাইয়েরা, আপনারাও কি একই রকম বেদনা অনুভব করেন যখন আল্লাহর সাথে আপনার আন্তরিকতা নিয়ে আপনার মনে প্রশ্ন আসে? আপনারা কি অস্বস্তি, উদ্বেগ, চিন্তিত অনুভব করেন যখন আল্লাহর কোনো হুকুম আপনার দ্বারা ছুটে যায় ? আমি নিশ্চিত যে আমি কী বলতে চাচ্ছি তা আপনারা সকলেই উপলব্ধি করতে পারছেন। আর যদি আপনি উপলব্ধি করতে পারেন তাহলে এখানে চিন্তার অনেক খোরাক রয়েছে। হতে পারে আল্লাহ তা’আলার প্রতি আমাদের আন্তরিকতার অভাবের এই উপলব্ধি আমাদের প্রতি আশির্বাদস্বরূপ। হতে পারে তিনি আমাদের আমাদের ত্রুটিগুলি উপলব্ধি করে এবং একটি নতুন, খাঁটি আন্তরিকতার সাথে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিতে চান।

আল্লাহর প্রতি আমাদের আন্তরিকতার অভাব আমাদের জন্য যতই বেদনাদায়ক হোক না কেন তাঁর কাছে আমাদের তওবা এবং তাঁর দিকে ফিরে যাওয়ার এই উপলব্ধিই আমাদের মুক্তির উপায় হতে পারে। সুতরাং আপনার দ্বারা গুনাহ হয়ে গেলেও আল্লাহর রহমত থেকে কখনও হতাশ হবেন না । বরং এর পরিবর্তে, যেকোনো অবস্থাতেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন, তাঁর প্রতি মনোযোগ আবদ্ধ করুন। দেখবেন আল্লাহ আপনাকে তাঁর রহমতের চাদর দিয়ে আবৃত করে নিয়েছেন।

যেকোনো বিষয় সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলাই অধিক জ্ঞাত।