আল্লাহ দাঁড়কাকের থেকে কী শিক্ষা নিতে বলেছেন?

প্রকৃতি Contributor
জানা-অজানা
দাঁড়কাক
© Valentin Armianu | Dreamstime.com

পাখিদের সাধারণত বুদ্ধিমান বলে ধরা হয় না, এমনকি কাউকে যদি ‘পাখির মত বুদ্ধি’ বলা হয় তাহলে বেশ খানিক অপমানই করা হয়। আমারও এতদিন তাই ধারণা ছিল। সেই কারণেই বিখ্যাত বাঙালি লেখক সত্যজিৎ রায়ের ‘কর্ভাস’ নামের গল্পে যখন একটি কাকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়া হয়েছিল, আমি বিশ্বাস করিনি। লেখকের কল্পনার ঘোড়দৌড় যে কীরকম হয় সেই ভেবে মুচকি হেসেছিলাম খানিক।

আমার সেই ভুল ভাঙল মহান আল্লাহর কৃপায়। একদিন আমি নিয়মমাফিক কুরআন পড়ছিলাম, সেই সময় একটি সুরা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই সুরায় একটি পাখির বিবরণ ছিল। যে পাখি আদিম মানুষকে প্রথম জীবনযাপনের পদ্ধতি ও উসুল শিখিয়েছিল।

‘অতঃপর তার প্রবৃত্তি তাকে স্বীয় ভ্রাতৃ হত্যার প্রতি প্রলুব্ধ করে তুলল। সুতরাং সে তাকে হত্যা করেই ফেলল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ল। অতঃপর আল্লাহ একটি কাক প্রেরণ করলেন, সে মাটি খুঁড়তে লাগল, যেন সে তাকে (কাবীলকে) শিখিয়ে দেয় যে, স্বীয় ভাইয়ের মৃতদেহ কিভাবে ঢাকবে, সে বলতে লাগলঃ আমার অবস্থার প্রতি আফসোস! আমি ঐ কাকের সমতুল্য হতে পারলাম না এবং নিজ ভাইয়ের মৃতদেহ আবৃত করতে অক্ষম হয়ে গেলাম। ফলে সে অত্যন্ত লজ্জিত হল। ‘ [অধ্যায় ৫, স্তবক ৩০-৩১]

আমার এত বছরের কুরআন পড়ার অভিজ্ঞতা বলে, যদি কোনও সুরাতে আল্লাহ তালা কোনও বিশেষ জন্তুকে প্রাধান্য দেন তাহলে নিশ্চয়ই সেটিতে একাধিক অন্তর্নিহিত অর্থ রয়েছে। সুতরাং, আমি দেখলাম যে কাক ও দাঁড়কাককে মানুষের সাহায্যকারী ও বুদ্ধিমান বলে আল্লাহ চিহ্নিত করেছেন।

এটা বোঝার পর আমার কৌতূহল হল। মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী, তার পরে আর কোন প্রাণীকে বুদ্ধিমান বলা যায়? আমার সীমিত জ্ঞান থেকে আমার ধারণা হয়েছিল ডলফিন। কিন্তু একটি মজাদার ইন্টারনেট রিসার্চ আমাকে চমকে দিল।

আমাদের পরে যে সমস্ত বুদ্ধিমান প্রাণী রয়েছে দাঁড়কাক তার মধ্যে অগ্রগণ্য

প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ও ধর্মে দাঁড়কাককে অশুভ ধরে নেওয়া হয়েছে। ইউরোপিয়ান সাহিত্যে ডাইনিদের অনুগামী বলা হয় এই পাখিটিকে। এছাড়া মৃত্যু ও অশান্তির সঙ্গে এর যোগাযোগের কথাও ভীষণভাবে প্রচলিত। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলে পাখিদের মধ্যে যুক্তি দিয়ে বুদ্ধিমান ভাবে ভাবনা চিন্তা করার ক্ষমতা এই পাখিটিরই রয়েছে।

অরনিথোলজিস্ট বার্নেড হাইনরিখ ও থমাস বুগিনারের গবেষণাপত্রটি মূলত দাঁড়কাকের যুক্তি বুদ্ধি সংক্রান্ত। সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগজিনে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে তাঁরা বলেছেন, ‘ দাঁড়কাক অত্যন্ত বুদ্ধিমান পাখি। যুক্তি ও অত্যন্ত অ্যানালিটিকাল স্কিল দিয়ে তারা তাদের শত্রুদের থেকে নিজেদের রক্ষা করে।’

হাইনরিখ ও বুগিনার নিজেদের গবেষণাগারে দাঁড়কাক নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাঁরা কাকগুলিকে একাধিক জটিল টাস্ক দিয়েছিলেন যেগুলো স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতিতে একটি দাঁড়কাকের করার কথা নয়। কিন্তু একটু সময় পরেই নিপুণভাবে কাজগুলো সম্পন্ন করে কাকগুলো। শুধু তাই নয়, প্রথমবারেই সমস্ত কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।

নানা পরীক্ষার মাধ্যমে দাঁড়কাকের বুদ্ধির পরিচয়

একটি পরীক্ষায় একটি কাচের টিউবে খাবার রেখে আরেকটি জলপূর্ণ টিউবে সেটিকে রাখা হল। চারপাশে কিছু পাথরের টুকরো, ঘাস মাটি ইত্যাদি রেখে একটি প্রাকৃতিক পরিবেশের সৃষ্টি করা হল। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল পাখিটি হয়তো বড় টিউবটাকে উলটে দিয়ে ছোট টিউবটিকে বের করবে। কিন্তু তা হল না। উদ্দিষ্ট কাকটি আশপাশ থেকে পাথর তুলে বড় টিউবে ফেলতে লাগল। যতক্ষণ না জলের লেভেল তার ঠোঁটের কাছাকাছি ছোট টিউবটিকে এনে দিচ্ছে ততক্ষণ পাথর ফেলে গেল। একসময় জলে লেভেল উঠে এলে সে শান্তভাবে ছোট টিউবটি নিয়ে সরে গেল।

এতে প্রমাণিত হল, দাঁড়কাক আশেপাশে পরিবেশ ধ্বংস না করে শুধুমাত্র বুদ্ধির দ্বারা একটি জটিল কাজ সম্পন্ন করল। আমাদের মানুষের প্রচুর শিক্ষণীয় রয়েছে এই ঘটনা থেকে।

দাঁড়কাকের বুদ্ধির আরেকটি প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে জাপানের রাস্তার সিসিটিভি ক্যামেরায়। যে সমস্ত বাদামের খোলা অত্যন্ত শক্ত হওয়ায় তাদের পক্ষে ভাঙ্গা সম্ভব হয় সেগুলি তারা চলন্ত গাড়ির সামনে ছুঁড়ে দেয়। তারপর ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হলে খুব দ্রুত উড়ে গিয়ে ভাঙ্গা বাদামগুলি সংগ্রহ করে। শুধু তাই নয়, তারা এটাও জানে ঠিক কখন রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেশি থাকে ও ট্রাফিক সিগন্যাল ঘন ঘন লাল হয়।

দাঁড়কাক সামাজিক প্রাণীও বটে

দাঁড়কাক দল বেঁধে শিকার করতে সিদ্ধহস্ত। দুটো দাঁড়কাক মাটির কাছাকাছি উড়ে শিকারের পালানোর পথ বন্ধ করবে, অন্যদিকে আরেকটি এসে ছোঁ মেরে শিকারটি তুলে নিয়ে যাবে। এতে বোঝা যায় দাঁড়কাক অনুধাবন করতে পারে শিকার কী ভাবছে। তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বলেছেন এটি ‘থিয়োরি অফ মাইন্ড’ থাকার প্রমাণ।

কোনও কঠিন কাজ তারা দল বেঁধে সম্পন্ন করতে পছন্দ করে। গবেষণাগারের প্রত্যেকটি কাজ তারা দল বেঁধেই সম্পন্ন করেছিল।

এছাড়াও, তাদের উন্নত বুদ্ধির প্রমাণ জীবনযাত্রাতেও পাওয়া যায়। মরুভূমি, শহর, পাহাড় সমস্ত স্থানেই দাঁড়কাক মানিয়ে নিয়ে বসবাস করতে পারে। সাধারণত বড় ঝাঁকে তাদের বসবাস করতে দেখা যায় এবং প্রতি ঝাঁকের মধ্যে একেবারেই কোণওরকম অশান্তি বা মারপিট দেখা যায় না। বড় দাঁড়কাক শিশু দাঁড়কাকের খেয়াল রাখে, শিকার করতে শেখায়।

বিজ্ঞানীদের এখন গবেষণার বিষয় দাঁড়কাকের এই বুদ্ধির কারণ কী? তাহলে কি পাখিদের মধ্যে বিবর্তনের প্রমাণ এই পাখিটি? এ বিষয়ে গবেষণা চলছেও পুরোদমে।

আমার বক্তব্য, মহান আল্লাহ আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে একটি কাক আমাদের জীবনবোধের শিক্ষা দিতে পারে। সেই শিক্ষা পাথেয় করে আমাদের জীবনের পথে এগিয়ে চলা প্রয়োজন। আমিন।