আল আকসা মসজিদের গম্বুজ ‘কুব্বাতুস সাখরাহ’ কী আছে এর ভিতর?

এশিয়া ০৯ জানু. ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
কুব্বাতুস সাখরাহ
© Alexirina27000 | Dreamstime.com

কুব্বাতুস সাখরাহ বা ডোম অফ দ্য রক কোনো মসজিদ বা ইবাদতখানা নয়। আরবিতে কুব্বাহ শব্দের অর্থ গম্বুজ আর সাখরাহ শব্দের অর্থ পাথর। অর্থাৎ, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘পাথরের (উপর নির্মিত) গম্বুজ’।

সেকেন্ড টেম্পল বা দ্বিতীয় বাইতুল মুকাদ্দাসের কিছু অংশ রোমানরা সম্পূর্নরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিল। রোমানরা সেখানে তাদের দেবতা জুপিটারের মন্দির বানিয়েছিল। সেই একই জায়গায় উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান এই কুব্বাতুস সাখরাহ বা ডোম অফ দ্য রক নির্মাণ করেন।

‘কুব্বাতুস সাখরাহ’ নির্মাণ

৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালিক কুব্বাতুস সাখরাহ পাথরের উপর নির্মিত এই গম্বুজ ‘কুব্বাতুস সাখরাহ’ নির্মাণ করেন। এই স্থাপনাটি দেখতে অষ্টাভুজাকৃতির। এটি মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন। এর নকশা এবং অলংকার-করণে সমসাময়িক বাইজেন্টাইন স্থাপত্যশৈলী এবং স্বতন্ত্র ইসলামিক ঐতিহ্যের প্রভাব খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করা যায়।

১০১৫ খ্রিষ্টাব্দে ভুমিকম্পের ফলে গম্বুজটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়; এরপর ১০২২-২৩ খ্রিষ্টাব্দে গম্বুজটি আবার পুনর্নির্মিত হয়।

১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে সালাহউদ্দিন আইয়্যুবী জেরুজালেম জয় করার পর কুব্বাতুস সাখরাহ বা ডোম অফ দ্য রকের উপরের ক্রুশ নামিয়ে সেখানে ক্রিসেন্ট লাগিয়ে দেন।

সুলতান সুলেমান তার রাজত্বকালে (১৫২০-১৫৬৬) এ স্থাপত্যের বাহিরের সমগ্রটা জুড়ে টাইলস লাগানো হয়। আর ভেতরে লাগানো হয় মোজাইক ও মার্বেল পাথর যাতে সূরা ইয়াসিন লিখিত হয়। তার উপরে লেখা হয় সুরা ইসরা বা সুরা বনী ইসরাইল, কারণ সেখানে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের মি’রাজের যাত্রায় বাইতুল মুকাদ্দাসে আসার কথা লিখিত আছে।

১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় কুব্বাতুস সাখরাহ বা ডোম অফ দ্য রকের মাথায় ইসরায়েলের পতাকা উড়ানো হয়। কিন্তু শীঘ্রই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দায়ানের নির্দেশে সেটি নামিয়ে ফেলা হয় এবং এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মুসলিম সংগঠন ওয়াকফের হাতে। এখনো ওয়াকফের হাতেই এর অধিকার সংরক্ষিত রয়েছে।

ডোম অফ দ্য রক পুনর্নির্মাণ

১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে জর্ডানের বাদশাহ হুসাইন তার একটি বাড়ি বিক্রি করে পাওয়া ৮.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়ে ৮০ কেজি সোনা কিনে তা দান করে দেন এ কুব্বাতুস সাখরা বা ডোম অফ দ্য রকের পুনর্নির্মাণ জন্য। সেই সোনা দিয়ে কুব্বাতুস সাখরাহকে মুড়ে দেওয়া হয়; যা আজ অবধি জ্বলজ্বল করছে কুব্বাতুস সাখরাহ বা ডোম অফ দ্য রকের গম্বুজে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, কুব্বাতুস সাখরাহ বা ডোম অফ দ্য রক কোন মসজিদ বা ইবাদতখানা নয়। তাহলে এর মধ্যে এমন কি আছে যা সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে? মূলত এই গম্বুজের মধ্যে রয়েছে একটা পবিত্র পাথর এবং এই পাথরের নিচে আছে একটি গুহা।

এ পাথরটি হচ্ছে এই পুরো মসজিদ কমপ্লেক্স বা টেম্পল মাউন্টের অন্তর্গত সবচেয়ে পবিত্র জিনিস।

হাদিসের বর্ণনা মতে, এ পাথরের উপর ভর রেখেই হযরত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজের রাত্রিতে উর্ধ্বারোহণ করেছিলেন। আর, ইহুদী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাথরটির নাম, ফাউন্ডেশন স্টোন বা ভিত্তিপ্রস্তর। হিব্রু ভাষাতে যার নাম ‘এভেন হা-স্তিয়া’। এটিই ইহুদীদের হোলি অফ দ্য হোলিজ এর অবস্থান বলে তারা বিশ্বাস করে। ইহুদিদের কাছে এই পাথরটিই হল মূল কিবলা। এই পাথরটির সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হল, হযরত উমর (রাযিঃ) এই পাথরটিকে সালাম দিয়েছিলেন, “আসসালামু আ’লাইকুম”; আর তখন পাথরটি উত্তরে বলেছিল, “ওয়া আ’লাইকুমুসসালাম”।

কুব্বাতুস সাখরাহ গম্বুজটির ঠিক নিচে এই পাথরটি। আর পাথরটির দক্ষিণ পূর্ব কোনায় একটি গর্ত আছে। এই গর্ত দিয়ে প্রাকৃতিক এবং মানব সৃষ্ট একটি গুহাতে প্রবেশ করা যায়। এই গুহাটির স্থানীয় নাম ‘বির আল-আরুয়াহ’ বা আত্মার কূপ। এই গুহার ভিতরে নামাজ পড়ার জন্য জায়গা আছে। গুহাটির আয়তন প্রায় ৬৫ বর্গফুট এবং উচ্চতা ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি থেকে ৮ ফুট ২ ইঞ্চি পর্যন্ত।