আল আন্দালুজ আর হিন্দের মধ্যে মুসলমান পণ্ডিতদের যাতায়াতের ইতিহাস

ID 104256389 © Milkos | Dreamstime.com
ID 104256389 © Milkos | Dreamstime.com

কথায় বলে, যোগাযোগের পন্থা যত সহজ হলেও যোগাযোগ করা যায় না। এই ২০২০ সালে দাঁড়িয়ে সেটা যে খুব ভুল নয়, তা আমরা বেশ ভাল মতোই টের পাচ্ছি। কোভিড-১৯ এর আক্রমণের আগে পর্যন্ত এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া বেশ সহজই ছিল। আজকের গল্পক দশম শতাব্দীতে মুসলমানদের এক দেশ থেকে অন্য দেশ ভ্রমণের ইতিহাস নিয়ে।

আনুমানিক ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান শাসকরা যখন আইবেরিয়ান পেনিনসুলা দখল করে তখন থেকেই স্পেনে ইসলামের উত্থান। সেই উত্থান চরমে পৌঁছয় দশম শতাব্দীতে উমায়া খলিফার রাজত্বকালে। সেই স্বর্ণযুগেই স্পেন থেকে ভারতবর্ষ তথা হিন্দের মধ্যে শিক্ষা ও সংস্কৃতির আদানপ্রদানের জন্য পন্ডিত ও শিক্ষিত ব্যক্তিরা যাতায়াত করতেন। স্পেনের তৎকালীন নাম ছিল আল আন্দালুজ। দুই দেশের চিন্তাধারার এই আদানপ্রদানে বেশ সুন্দর একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

অসুখ সারানো ও বিদ্যাশিক্ষাঃ 

আল আন্দালুজ বা স্পেন থেকে ভারতবর্ষে পা রাখা বিদ্বজনেদের মধ্যে প্রথমেই যার নাম মনে আসে তিনি হলেন মুহাম্মদ ইবন মুয়াইয়াহ, আনুমানিক ৯০০ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের কর্ডোবা অঞ্চলে তিনি বসবাস করতেন। পেশাগত ভাবে ব্যবসায়ী হলেও তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা ছিল অদম্য। ভারতবর্ষে এসে এখানকার সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সম্পর্কে জানার আগে তিনি মিশর, মক্কা, বাগদাদ, কুফা প্রভৃতি দেশে ভ্রমণ করে সেখানকার স্কলারদের থেকে বিদ্যাশিক্ষা করেছিলেন। তারপর ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিছু কিছু ঐতিহাসিকের মতে তিনি বিদ্যাশিক্ষার সঙ্গে-সঙ্গে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে এদেশে এসেছিলেন। আবার অন্য একদল ঐতিহাসিক বলেন মুহাম্মদের পেটে ছিল ক্ষত, যা বর্তমানে গ্যাস্ট্রিক আলসার নামে পরিচিত। আন্দালুজের কোনও ডাক্তার সেই আলসার সারাতে না পারায় তাঁরা তাঁকে পরামর্শ দেন ভারতে এসে চিকিৎসা করানোর। সেই উদ্দেশেই মুহাম্মদের ভারতে পা রাখা। 

ভারতবর্ষ মুহাম্মদকে নিরাশ করেনি, জ্ঞানলাভের সঙ্গে-সঙ্গে অসুখও সেরেছিল তাঁর। তবে, সেই সঙ্গে মুহাম্মদের হয়েছিল বেশ কিছু অনুপম অভিজ্ঞতা।

শোনা যায়, ভারতবর্ষে পা রেখে এক ভিষগের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। প্রাচীনকালে চিকিৎসকদের ভিষগ বলা হত। সে চিকিৎসক মুহাম্মদের কাছে একটি শর্ত রাখেন। তিনি যদি ক্ষতটি সারিয়ে তোলেন তবে মুহাম্মদের সমস্ত সম্পত্তি তাঁর। আলসারের যন্ত্রণায় পর্যুদস্ত মুহাম্মদ রাজি হন প্রস্তাবে। কিন্তু তা সেরে যাওয়ার পর তিনি যখন শর্তানুসারে সম্পত্তি অর্পণ করতে যান, ভিষগ শুধু ওষুধের দামটুকু ছাড়া বাকি সবই ফিরিয়ে দেন। তারপর, উৎসুক মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে বলেন, “এটা আপনার পরীক্ষা ছিল, অর্থের প্রতি আপনি কতটা আকৃষ্ট তা জানার।“ 

শুধু এই অভিজ্ঞতাই নয়। সিন্ধু নদ পার হওয়ার সময় তিনি জলে পড়ে যান। সঞ্চিত অর্থ সমেত সমস্ত দ্রব্য ভেসে যায় নদীতে। শূন্যহাতে আবার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। অতঃপর, ত্রিশ বছর পর ৯৩৭ সি ই-তে যখন কর্ডোবা ফিরে আসেন , তখন তাঁর কাছে ছিল ৩০০০০ দিনার। শূন্য থেকে শুরু করে এত টাকা আবার সঞ্চয় করেছিলেন মুহাম্মদ, আর তাঁর বিদ্যাচর্চা ছিল অব্যাহত। 

ভারতবর্ষে নিজের অভিজ্ঞতাসমূহ ও আল আন্দালুজের ইতিহাস নিয়ে বিস্তর লেখালিখি করেছিলেন তিনি। ৯৬৯ সিই-তে তাঁর দেহাবসান হয়।

আল আন্দালুজ থেকে হিন্দঃ

সেই শুরু, ক্রমে আরও পণ্ডিত ব্যক্তি ও স্কলাররা ভারতবর্ষের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য উমর আহমেদ ইবন সৈয়দ যিনি ইবন হাজম নামেও পরিচিত। তাঁর পুর্বপুরুষরা ভারতবর্ষ থেকে আগত বলে তাঁর আরেক নাম ইবন –আল-হিন্দি। পেশায় তিনি নাখিলা মসজিদের ইমাম। স্পেনীয় ইতিহাস, আইনশাস্ত্র ও প্রশাসনিক কার্যে বিশেষ দক্ষ ছিলেন। শেষ বিষয়টির উপর তাঁর লিখিত বই আন্দালুসিয়ান ইতিহাসের এক বিশেষ অংশ। খলিফার সভায় নিয়মিত কবিতা পড়ার আমন্ত্রণও পেতেন তিনি। এই ইবন হাজম ভারতবর্ষের ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বিশদে লিখে গিয়েছেন। ইবন হাজমের পর তাঁর শিষ্য আবুল কাশিমও ভারতবর্ষ সম্পর্কে প্রভূত বই লিখেছিলেন। যদিও প্রমাণ পাওয়া যায় না তিনি ভারতে এসেছিলেন কিনা। 

শুধু শিক্ষা নয়, বাণিজ্যওঃ 

আন্দালুজ ও হিন্দের মধ্যে এই যাতায়াত বাণিজ্যের এক সুষ্ঠ পথ খুলে দিয়েছিল। স্পেন থেকে ডুমুর, পারদ, উল, লিনেন, ও কাচের বাসনপত্র ভারতে আসতে। অপরাপর, ভারত থেকে তরমুজ, আখ, কমলালেবু, হাতির দাঁত, কস্তুরী মৃগনাভি স্পেনে আমদানি হত।  দ্রব্য ও জ্ঞানের সঙ্গে ভাষারও আদানপ্রদান যে হত না তা কিন্তু নয়, উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কমলালেবু, অর্থাৎ নারাঞ্জ নামে যা ভারতে পরিচিত ছিল তা আল আন্দালুজে গিয়ে হয়ে যায় ‘নারাঞ্জ’, সেখান থেকেই ইংরেজি ‘অরেঞ্জ’ শব্দটির উৎপত্তি। 

আল বিরুণী জ্ঞানের অন্বেষণে ইরাক থেকে ভারতবর্ষে পৌঁছেছিলেন। ইবন মুয়াইয়াহ অসুখ সারিয়েছিলেন ভারতবর্ষে গিয়ে। আবার পূর্বপুরুষ ভারতীয় হলেও স্পেনে গিয়ে ইমাম হতে ইবম হাজমের কোনও সমস্যা হয়নি। এগুলোই প্রমাণ করে মুসলমানেরা যদি নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদান চালু রাখে, তাহলে একে অপরের সংস্কৃতি ও আদর্শ সম্পর্কে সহজেই অবগত হবে। আর তার ফলেই সারা বিশ্বের ইসলাম এক সুরে বাঁধা পড়বে।