আল-খানসা: খ্যাতনামা মুসলিম মহিলা কবি ও শহীদ জননী

dreamstime_s_181351827

আরবী কাব্যগ্রন্থের পন্ডিতদের মতে, এমন কোনো মহিলা কবির জন্ম হয়নি, যার কবিতা আল-খানসার কবিতার চেয়ে অধিক জ্ঞানে পরিপূর্ণ ছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে মাঝে মাঝে কবিতা আবৃত্তি করতে বলতেন এবং তাঁর কবিতা শুনে তাকে প্রশংসা করতেন।

তার আসল নাম ছিল তুমাদির বিনতে আমর ইবনে হারিস ইবনে শারিদ আল সুলামিয়া। বাঁকানো নাকের হাড় এবং সরু আকৃতির নাকের কারণে তিনি আল-খানসা ডাকনামে পরিচিতি পেয়েছিলেন। আল-খানসার প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর বীরত্বগাথা গল্প আজকের প্রজন্মের মেয়েদের জন্য খুবই আশা জাগানিয়া হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

ইসলামের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলা কবি। নজদ অঞ্চল বা বর্তমান আরবের মধ্যাঞ্চলে ৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত সুলাইম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জিন ও মানুষের কবি হিসেবে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার সময়কার অধিকাংশ মহিলা কবি মূলত মৃতদের জন্য শোকগাথা রচনা করত এবং জনসম্মুখে তা আবৃত্তি করত। সেই প্রথা অনুসারে, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে সুলাইম গোত্রের কেউ নিহত হলে আল-খানসা সেই মৃতকে উদ্দেশ্য করে শোকগাথা রচনা করতেন।

তাঁর আপন ভাই সখর ও মু’আবিয়ার জন্য শোকগাথা কবিতা রচনার জন্য তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। আরবি সাহিত্যে মহিলা কবিদের মধ্যে তিনিই অত্যধিক পরিচিত। ৬১২ সালে তাঁর ভাই মু’আবিয়া অন্য গোত্রের এক ব্যক্তির হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এ কারণে, আল-খানসা চাইতেন যেন তার আরেক ভাই সখর এই হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করে। সত্যিই একদিন এই হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছিলেন সখর। তবে, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়। আর এই আঘতের কারণে এক বছর পর সেও মারা যায়। সখর ও মু’আবিয়ার মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে আল-খানসা কবিতায় তার শোক ফুটিয়ে তোলেন।

শোকগাথা রচনার জন্য বিখ্যাত হলেও আরবী কবিতার সকল অঙ্গনেই আল-খানসার বিচরণ ছিল। তৎকালীন আরব সভ্যতার বিভিন্ন উপাদান যেমন মরুধুলা, ঝড়-বৃষ্টি, উট, পাহাড়-পর্বতের দৃষ্টিনন্দন ক্যানভাস তার কবিতার পংক্তিতে ফুটে উঠত।

বাশার ইবনে বুরদ আব্বাসি যুগের একজন বিখ্যাত কবি। তিনি এক সভায় মন্তব্য করেন, “যখন আমি কোনো মহিলা কবির রচিত কবিতা পড়ি, তখন সেই কবিতায় কোনো না কোনো দুর্বলতা আমার চোখে পড়ে। তবে আল-খানসার রচিত কবিতা এর ব্যতিক্রম। তাঁর মর্যাদা তো পুরুষ কবিদেরও উপরে।”

জাহেলি যুগে শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য চর্চা ও আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ছিল ওকাজ মেলা। সমাজের সকলেই এই মেলায় অংশ নিত। অংশ নিত অন্যান্য কবিদের সাথে আল-খানসাও। তিনি যে তাঁবুতে অবস্থান করতেন তার দরজায় বিশেষ পতাকা উত্তোলন করে তাতে লেখা থাকত ‘আরবের শ্রেষ্ঠ শোকগাথা রচয়িতা’।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লমের সমসাময়িক ছিলেন আল-খানসা। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নবীজির সাথে দেখা করে ইসলাম কবুল করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর কাব্যপ্রতিভা তিনি ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত করেন। ইসলাম নিয়ে যেসব অপদার্থ কবি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করত, তিনি কবিতা দিয়েই সেগুলির জবাব দিতেন। ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে পারস্য সম্রাট কাদেসিয়ার বিরুদ্ধে মুসলমানদের এক দুঃসাহসী অভিযান পরিচালিত হয়। যার সেনাপতি ছিলেন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস(রাযিঃ)। ভয়াবহ এই যুদ্ধে প্রায় ত্রিশ হাজার পারস্য সেনা নিহত হয়। আল-খানসার চার ছেলেই এই জিহাদে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং চারজনই এই জিহাদে শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।

চার ছেলেকে জিহাদে প্রেরণের পূর্বে তিনি তাদেরকে বলেন, “হে আমার পুত্রগণ! তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছ এবং স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেছ। এখন তোমাদের এটা বোঝা উচিত যে, চিরস্থায়ী আবাস ক্ষণিকের আবাসের চেয়ে অবশ্যই উত্তম। সেই চিরস্থায়ী আবাসের দিকে তোমাদের ডাক এসেছে। আল্লাহ বলেছেন, “হে ঈমানদানগণ! তোমরা ধৈর্য্যধারণ করো এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাকো যাতে তোমরা উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ্য হতে পার।” আগামীকাল তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হবে। সে সময়ে তোমাদেরকে যেন ভীরুতা না পেয়ে বসে। আল্লাহর নামে জিহাদ করবে এবং জিহাদে নিজেদেরকে সর্বাত্মকভাবে বিলিয়ে দেবে। আল্লাহ তোমাদেরকে সম্মানিত করুন।”

জিহাদ শেষে চার ছেলের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে আনন্দ চিত্তে আল-খানসা বলে ওঠেন, “আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, যিনি তাদেরকে শাহাদাতের মাধ্যমে আমাকে সম্মানিত করেছেন। আমি আশা করি আমার রব তাঁর দয়ায় তাদের সঙ্গে আমারও সাক্ষাত ঘটান।”

২৪ হিজরি মোতাবেক ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে উসমান(রাযিঃ)-এর খেলাফতের শুরুর দিকে বাদিয়া অঞ্চলে এই মহিয়সী মহিলা কবি ও শহীদ জননী ইন্তেকাল করেন।