আল-মদিনা: নাম এবং ইতিহাস

ইতিহাস ১৬ ডিসে. ২০২০ Tamalika Basu

তাইবাহ, ইয়াতরেব এবং দার-আল-হিজরাহ হল আল-মদিনা শহরেরই বিভিন্ন নাম। সৌদি আরবের মদিনা প্রদেশ, লোহিত সাগরের উপকূলে দেশের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। এই শহরের নামকরণ আল-মদিনা (শহরের আরবি) করার কারণ হল, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে এই শহরেই এসেছিলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ।

এই শহরের অপর একটি নাম হল তাইবাহ, এই আরবী শব্দের অর্থ দয়া। এর অপর একটি নাম দার আল-হিজরাহ (যা হল, হিজরত ভূমির আরবি প্রতিশব্দ) কারণ নবী (সাঃ) মক্কা থেকে হিজরত করে এখানেই এসেছিলেন।

বানু মাতরাওয়েল এবং বানু হাউফ- এই দুই উপজাতি আল-মদিনার মরুদ্যানে বসবাস ও চাষ করার জন্য প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। উভয় উপজাতিই হযরত নোয়পুত্র শেমের বংশ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিল। বহু বছর পরে, ইয়েমেনী উপজাতি বানু আউস এবং বানু খাজরাজ এসে মদিনায় পৌঁছেছিল।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন মদিনায় পাড়ি জমান তখন তিনি মদিনা সনদ প্রবর্তন করেছিলেন, যা প্রকৃতপক্ষে মানব জাতির ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান।

আল-মদিনার সনদ

এই সনদটির উদ্দেশ্য ছিল, বসবাসকারী মুসলমান এবং ইহুদিদের মধ্যে সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করা। এটি উভয় পক্ষকে সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের অধিকার দিয়েছিল।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং তাঁর পরবর্তী প্রথম চার জন খলিফার আমলে ইসলামী সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ও রাজধানী ছিল আল-মদিনা। উমাইয়া শাসনের সূচনার সাথে সাথে এই ইসলামিক রাষ্ট্রটি দামাস্কাসের অধীনে চলে যায়।

শহর পরিকল্পনা

পবিত্র অঞ্চল হওয়ার কারণে মদিনায় কেবলমাত্র মুসলমানদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। তবে এখানকার বিমানবন্দরটি পবিত্র সীমার বাইরে রয়েছে। এবং সেই কারণে বিমান অবতরণ করার সময় অমুসলিমরা এই শহরটি ভালো ভাবে দেখে নিতে পারেন।

তুর্কি শাসনকালে গ্যারিসনের ব্যারাকের নিকটে দক্ষিণে সুলতানায় একটি ছোট সামরিক অবতরণ ক্ষেত্র ছিল। তবে বর্তমানে এই অঞ্চলটি এখন রাজার প্রাসাদ এবং তাঁর বিস্তৃত অংশের দখলে। ফিলিস্তিন ও মিশরের প্রথম দিকে ইসলামের বিখ্যাত বীর আমর ইবনে আল আস-এর সমাধির ধ্বংসাবশেষও রয়েছে। হারুনের সমাধিটি উহুদ পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থিত।

মহানবী (সাঃ)-এর মসজিদ

তবে সমস্ত তীর্থযাত্রীর মূল আকর্ষণ হল নবীর মসজিদ, যা মুহাম্মদ (সাঃ) নিজেই তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন। খলিফার উত্তরাধিকার সূত্রে এই মসজিদে সংযোজন ও উন্নতি সাধিত হয়েছিল এবং উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালাদ ইবনে আবদুল মালিক (রাঃ)-এর সময়ে নবীর পত্নীদের কক্ষটি সম্প্রসারণ করে একীভূত করা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের জেরে এই মসজিদ দু’বার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল, প্রথমে ১২৫৬ সালে এবং দ্বিতীয় বার ১৪৮১ সালে। এর পুনর্নির্মাণ বিভিন্ন ইসলামী দেশের ধর্মপ্রাণ শাসকরা বিভিন্নভাবে শুরু করেছিলেন।

সুলতান দ্বিতীয় সেলিম (১৫৬৬-৭৪ খ্রিস্টাব্দ) মসজিদের অভ্যন্তর সোনার সাথে মোজাইক দিয়ে সাজিয়েছিলেন। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ ১৮১৭ সালে এর গম্বুজটি তৈরি করেছিলেন এবং ১৮৩৯ সালে একে সবুজ রং করেন, যা হল ইসলামের স্বীকৃত রং। সুলতান প্রথম আবদুলমেসিড ১৮৪৮ সালে মসজিদের ভার্চুয়াল পুনর্নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প শুরু করেছিলেন এবং এই কাজ শেষ হয় ১৮৬০ সালে। ১৯৪৮ সালে রাজা আবদুল আজিজ দ্বারা পরিকল্পিত আধুনিক সম্প্রসারণের আগে এটি ছিল সর্বশেষ সংস্কার, এবং ১৯৫৩-৫৫ সালে রাজা সৌদ দ্বারা কার্যকর করা হয়েছিল।

মসজিদের স্থাপত্য

মসজিদের উত্তরে এখন একটি নতুন সভা নির্মীত হয়েছে, যার চারপাশে রয়েছে একাধিক স্তম্ভ। এর গঠনশৈলী উনিশ শতকের মতো একই ধাঁচের, তবে এই কাজ করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে আনা পাথরের পরিবর্তে কংক্রিট ব্যবহার করে। পূর্বে মহিলারা এই মসজিদের যে নির্দিষ্ট অংশে প্রবেশ করতে পারতেন, বর্তমানে তা ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর কিছু ছোটখাটো মেরামতের কাজ ছাড়া মসজিদের দক্ষিণ (মূল) অংশ সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।

এখানে রয়েছে তিনটি লোহার কাঠামো রয়েছে যা নবীর ঘরের প্রতিনিধিত্ব করে এবং যথাক্রমে (সাধারণ সিদ্ধান্ত অনুসারে) মহান সবুজ গম্বুজের নীচে রয়েছে নবীজী, প্রথম দুই খলিফার আবু বকর এবং উমর এবং নবী কন্যা ফাতিমা (রাঃ)-এর সমাধিসৌধ। স্তম্ভযুক্ত দক্ষিণ স্তম্ভের বিশেষভাবে অলঙ্কৃত অংশটি পাম গ্রোভ (আল-রাওয়াধ)-কে উপস্থাপন করে যেখানে প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

আধুনিক আল-মদিনা

জিন্নাহ, রিয়াদ এবং সৌদি অন্যান্য শহরগুলির মতো মদিনায় এত দ্রুত আধুনিকায়ন হয়নি। বিল্ডিং ডেভেলপমেন্ট পুরানো শহরের প্রাচীরটি সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে, এর ফলে তা মিশে গিয়েছে আবু জিদা-র ওপারে বর্তমানে নির্মীত তীর্থযাত্রীদের শিবিরভূমি (আল-মানখ) এবং আনবারিয়াহ কোয়ার্টারের সাথে, যে ঐতিহাসিক অঞ্চলটি আগে খ্যাতনামা বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল, এবং তুর্কিরা এখানে রেল স্টেশন এবং টার্মিনাল ইয়ার্ড স্থাপন করেছিল।

আল-কুরাইদা গ্রাম ছাড়াও এখানে বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় ঢিবি (ʿitm) রয়েছে, যা অবশ্যই চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে পারে। ১৯২৫ সালের ওয়াহহাবী অভিযানের সময় আল-বাক্বার (বাক্বুল আল-ঘারকাদ) ইসলামিক কবরস্থানটি নানবিধ গম্বুজ এবং সন্তদের সমাধির উপরে কারুকাজ দ্বারা শোভিত ছিল; বর্তমানে সেখানে পুরানো স্মৃতিস্তম্ভের জায়গায় সাধারণ কংক্রিট কবর এবং একটি সার্কিট প্রাচীর স্থাপন করা হয়েছে।