আশুরার দিন পালনীয় কিছু আমল

© Grafoo | Dreamstime.com

হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম। মুসলিম উম্মাহর কাছে এই দিন নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়ত ও ইতিহাস উভয় বিবেচনায় মাসটি তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসের অনেক অনুপ্রেরণামূলক ঘটনার সাক্ষী এই মুহাররম মাস। শুধু উম্মতে মুহাম্মদিই নয়, বরং পূর্ববর্তী অনেক উম্মত ও নবীর অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এই মাসে। মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই মাসকেন্দ্রিক অনেক কুসংস্কার, ভুল বিশ্বাস ও কাজের চর্চা রয়েছে মুসলিম সমাজে; যার বৃহদংশই ভিত্তিহীন। ভিত্তি রয়েছে এমন তিনটি আমল নিম্নে তুলে ধরা হলো—

 রোজা রাখা

আশুরার দিনে আমল হিসেবে তিনটি কাজ করা যায়। প্রথমত, রোজা রাখা। এ আমল সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আশুরা উপলক্ষে দুই দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। মুহাররমের ১০ তারিখের আগে বা পরে এক দিন বাড়িয়ে রোজা রাখার কথা হাদিস শরিফে এসেছে। ইসলামে আশুরার রোজার বিশেষ গুরুত্ব আছে। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা ফরজ ছিল। জাবের (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের (রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে) আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। আর এ বিষয়ে তিনি নিয়মিত আমাদের খবরাখবর নিতেন। যখন রমজানের রোজা ফরজ করা হলো তখন আশুরার রোজার ব্যাপারে তিনি আমাদের নির্দেশও দিতেন না, নিষেধও করতেন না। আর এ বিষয়ে তিনি আমাদের খবরাখবরও নিতেন না।’ (সহিহ মুসলিম)

ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরা ও রমজানের রোজা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন, অন্য কোনো রোজা সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে সেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতে দেখিনি।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

পরিবারের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করা

আরেকটি আমল বর্ণনা সূত্রে দুর্বল হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো, আশুরার দিনে যথাসাধ্য খাবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করা। যথাসম্ভব ভালো খাবার খাওয়া। হজরত আবদুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিনে পরিবারে প্রশস্ততা প্রদর্শন করবে, সে সারা বছর প্রশস্ততায় থাকবে।’ (তাবরানি, মু’জামে কাবির, বায়হাকি)

এ হাদিসের বর্ণনা সূত্রে দুর্বলতা আছে। তবে ইবনে হিব্বানের মতে, এটি ‘হাসান’ বা গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের হাদিস। আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর দাবি, রিজিকে প্রশস্ততার ব্যাপারে কোনো হাদিস নেই। এটি ধারণাপ্রসূত। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন, এটি বিশুদ্ধ হাদিস নয়। তবে এ বিষয়ে একাধিক বর্ণনা থাকার কারণে ‘হাসান’ হওয়া অস্বীকার করা যাবে না। আর ‘হাসান লিগাইরিহি’ পর্যায়ের হাদিস দ্বারা আমল করা যায়। (আস-সওয়াইকুল মুহরিকা আলা আহলির রফজি ওয়াদ দালাল ওয়াজ জানদিকা)

নবীর পরিবারের জন্য দু’আ পাঠ করা

আরেকটি আমল যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত। আর তা হলো, আহলে বাইত তথা নবীর পরিবারের সদস্যরা শাহাদাতের কারণে তাঁদের জন্য দু’আ করা, দরুদ পড়া এবং তাঁদের কাছ থেকে সত্যের ওপর অটল থাকার শিক্ষা গ্রহণ করা। এই তিনটি কাজ ছাড়া আশুরায় অন্য কোনো আমল নেই।

স্মরণ রাখতে হবে, ইসলামের ইতিহাসে মুহাররম মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিভিন্ন কারণে। প্রাক-ইসলামী যুগেও মহররমের ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসের অসংখ্য কালজয়ী ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষী পুণ্যময় এ মাস। আর কারবালার ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিও আশুরার দিনে সংঘটিত হওয়ায় পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। রচিত হয়েছে শোকাভিভূত এক নতুন অধ্যায়। কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনাই আশুরার একমাত্র ও আসল প্রেরণার উৎস নয়। তাই আশুরা মানেই কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা নয়, আশুরার ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকেই চলে আসছে। আয়েশা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, জাহেলি যুগে মক্কার কুরাইশ বংশের লোকেরা আশুরার রোজা রাখত এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-ও আশুরার রোজা রাখতেন। (সহিহ মুসলিম) কাজেই আশুরার সুমহান ঐতিহ্যকে ‘কারবালা দিবসে’র ফ্রেমে বন্দি করা শুধু সত্যের অপলাপই নয়, একই সঙ্গে দুরভিসন্ধিমূলকও!