আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে বাদশাহি সড়ক

delhi highway

কোনও কোনও রাস্তা বা সড়কপথের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত থাকে আস্ত একটা ঐতিহাসিক বিবরণী। আজ আমাদের আলোচনাতে এমনই এক সড়কপথের কথা শোনাব। যে সড়কপথের ইতিহাস কমপক্ষে ২৫০০ বছরেরও প্রাচীন বললেও বোধহয় ভুল হবে না। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। সকলেই ইতিহাস বইয়ের পাতাতে এই নামের সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচিত। তবে গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড বা জিটি রোড এই নামের আগেও এর আরও বেশ কয়েকটি নামের সঙ্গে আমরা বিশেষভাবে পরিচিত হয়েছি। যেমন- উত্তরাপথ, শাহ রাহে আজম, সড়কে আজম, বাদশাহি সড়ক ইত্যাদি। মূলত এই সড়কপথটি এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন এবং দীর্ঘতম সড়কপথ হিসেবেই সুপরিচিত। শতকের পর শতক জুড়ে উপমহাদেশের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করা গেছে এই সড়কপথের মাধ্যমেই। সড়কপথের বিস্তৃতি এবং দৈর্ঘ্য নিঃসন্দেহে আমাদের অবাক করে। এটি বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে শুরু হয়ে আফগানিস্তানের কাবুল পর্যন্ত প্রসারিত। বলার অপেক্ষা রাখে না সুবিস্তৃত এই সড়কপথটি ইতিহাসের দিক থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষ্য বয়ে নিয়ে চলেছে।

সড়কপথটি প্রায় ২২৮০ কিলোমিটারের সুদীর্ঘ পথ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় এই পথটি মৌর্য শাসনের সময় থেকেই ছিল। পরবর্তী সময়ে অবশ্য ইসলামি শাসনব্যবস্থায় সড়কপথটির চেহারার পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে শেরশাহের ভূমিকা এই ক্ষেত্রে ছিল কার্যকরী। প্রশাসনিক এবং একইসঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির স্বার্থে তিনি সড়কপথটি সংস্কার করেছিলেন। ষোড়শ শতকে তাঁর এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমেই রাজধানী আগ্রার সঙ্গে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সংযুক্ত রাখার যে প্রকল্প তা অনেকাংশেই ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। মূল পরিকল্পনাতে ছিল রাজধানী আগ্রাকে পূর্বে সোনারগাঁও, পশ্চিমে দিল্লি ও লাহোর হয়ে মুলতান, দক্ষিণে বোরহানপুর এবং দক্ষিণ পশ্চিমে যোধপুরের সঙ্গে সংযুক্ত করা। সামরিক সুবিধা তো হয়েছিল একইসঙ্গে আমরা জানতে পারি বাণিজ্যিক ব্যবস্থার উন্নতি, ডাক যোগাযোগের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেইসঙ্গে গুপ্তচরের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের গোপন তথ্যাদি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুরাহা হয়েছিল। সেনাবাহিনির উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে তিনি একদিকে যেমন ‘দাগ’ এবং ‘হুলিয়া’ ব্যবস্থা চালু রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তেমনই অন্যদিকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে প্রথম ডাকব্যবস্থা বা যোগাযোগ রক্ষার পদ্ধতি এনেছিলেন শেরশাহ। উল্লেখ করতে হবে সড়ক-ই-আজমের সংস্কারের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষভাবে তৎপর ছিলেন। সরকারি কর্মচারী এবং অন্যান্য পথচারীদের সুবিধার জন্য এই সড়কপথের কয়েক ক্রোশ অন্তর অন্তর তিনি সরাইখানা ও বিশ্রামাগার তৈরি করেছিলেন। পথের দুইপাশে গাছও লাগিয়েছিলেন। সরাইখানাতে খাবারসহ অন্যান্য আবাসিক সুবিধাও ছিল। 

শেরশাহের সময়ে সড়কপথের বিস্তৃতি ছিল পঞ্জাব পর্যন্ত কিন্তু পরে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে এর সংস্কার হয়ে পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন নির্মাণের পর থেকে কয়েক শতক পর্যন্ত এটি ভারত উপমহাদেশের ভেতরে স্থলপথে অন্যতম প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে এসেছে। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান এবং আফিগানিস্তানে এই সড়কপথটি পরিচিত এশিয়ান হাইওয়ে নামে। 

তথ্যসূত্র- বাংলাপিডিয়া