আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি (২য় পর্ব)

অর্থনীতি Contributor
মতামত
আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে
Photo by cottonbro from Pexels

গত পর্বে (১ম পর্ব) আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ইসলামী অর্থব্যবস্থার ৩টি মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই পর্বে বাকি ৪টি মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করা হল-

৪) যাকাত ব্যবস্থা

গতপূর্বে আলোচিত হয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলাম যে দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করে তার সারমর্ম হল, সম্পদ একস্থানে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকতে পারবে না। ইসলামী সমাজের যে কয়জন লোক তাদের যোগ্যতা ও সৌভাগ্যের কারণে নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ করেছে ইসলাম চায় তারা যেন এ সম্পদ পুঞ্জীভূত করে না রাখে। বরং এই সম্পদ যেন ব্যয় করে এবং এমন সব ক্ষেত্রে ব্যয় করে যেখান থেকে সম্পদের আবর্তনের ফলে সমাজের স্বল্পবিত্তের মানুষরাও যথেষ্ট অংশ লাভ করে।

এ উদ্দেশ্যে ইসলাম উন্নত নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে দানশীলতা ও অপরকে সাহায্য-সহযোগীতার প্রবণতা সৃষ্টি করে। এভাবে মানুষ নিজেদের মনের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সম্পদ সঞ্চয় করাকে মন্দ জানবে এবং তা ব্যয় করতে উৎসাহী হবে। একেই যাকাত ব্যবস্থা বলা হয়। ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যাকাতকে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে, এমনকি যাকাতকে ইসলামের মূল স্তম্ভেসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সালাতের পরেই যাকাতের উপর সবচেয়ে বেশী জোর দেওয়া হয়েছে এবং দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করা হয়েছে, যে ব্যক্তি সম্পদ সঞ্চয় করে, যাকাত আদায় না করা পর্যন্ত তার ঐ সম্পদ হালাল হবে না।

৫) মীরাস বা উত্তরাধিকার আইন

নিজের ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজনে, আল্লাহর রাস্তায় ও যাকাত আদায় করার পরও যে সম্পদ একস্থানে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবে তাকে বিকেন্দ্রীভূত করার জন্য ইসলাম আরও একটি সুন্দর পন্থা অবলম্বন করেছে। একে বলা হয় মীরাস বা উত্তরাধিকার আইন।

উত্তরাধিকার আইনের উদ্দেশ্য হল, কোনো ব্যক্তি সম্পদ রেখে মৃত্যবরণ করলে তা যত কম বা বেশী হোক না কেন, তা তার নিকট ও দূরের সকল আত্নীয়ের মধ্যে নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে বন্টন করা হবে। যদি এমন কোনো ব্যক্তি থাকে, যার কোনো ওয়ারিস নেই তবে তার সম্পদ মুসলমানদের বায়তুল মালে জমা করে দিতে হবে। তাহলে সমগ্র জাতি এ সম্পদ থেকে লাভবান হতে পারবে।

মীরাস বণ্টনের এ আইন একমাত্র ইসলামেই দেখা যায়, অন্য কোনো অর্থব্যবস্থায় এর অস্তিত্ব নেই।

৬) গনীমত লব্ধ ও বিজিত সম্পদ বন্টন

যুদ্ধে সেনাবাহিনী যে গনীমতের সম্পদ (শত্রুপক্ষের পরিত্যক্ত সম্পদ) হস্তগত করে সে সম্পর্কে ইসলাম একটি বিশিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছে । এ সম্পদ ৫ ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪ ভাগ সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয় এবং অবশিষ্ট এক ভাগ সাধারণ জাতীয় কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করার জন্য বায়তুল মালে জমা করা হয়।

“জেনে রাখো, গণীমত হিসাবে তোমরা যাকিছু হস্তগত করো তার এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর রসুল, রসূলের নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।” (৮:৪১)

আল্লাহ ও রাসূলের অংশ বলে এমন সব কাজকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশের আওতাধীন ইসলামী রাষ্ট্রের কতৃত্বাধীনে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধের ফলে ইসলামী রাষ্ট্র যেসকল সম্পদের মালিক হয় ইসলাম তার একটি নির্দিষ্ট অংশকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামী রাষ্ট্রের কতৃত্বাধীন রাখার বিধান দিয়েছে।

৬) মিতব্যয়ীতার নির্দেশ

ইসলাম একদিকে সম্পদ সমগ্র দেশবাসীর মধ্যে আবর্তন করার ও ধনীদের সম্পদ থেকে গরীবদের অংশ লাভ করার ব্যবস্থা করেছে, অপরদিকে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেছে। এভাবে অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি কখনও প্রান্তিকতার আশ্রয় নিয়ে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কুরআনের মৌলিক শিক্ষা হচ্ছে,

“আর আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দারা যখন ব্যয় করে, অপব্যয় করে না আবার কার্পণ্যও করে না। বরং এ দুটির মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা (মিতব্যয়ীতা) অবলম্বন করে।” (২৫:৬৭)

এই শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজের আর্থিক সঙ্গতির মধ্যেই সম্পদ ব্যয় করে। তার সম্পদ ব্যয় যেন কখনও এমন পর্যায়ে না পৌঁছায় যার ফলে তা তার আয়ের অঙ্ককে ছাড়িয়ে যায় এবং নিজের আজেবাজে খরচের জন্য তাকে অন্যের নিকট দ্বারস্থ হতে হয়। অথবা অন্যের উপার্জনে ভাগ বসাতে হয় এবং যথার্থ প্রয়োজন ছাড়াই অন্যের নিকট থেকে ঋণ নিতে হয়।

আবার সে যেন নিজের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের তুলনায় অনেক কম খরচ করার মত কার্পণ্যও না দেখায়। নিজের আয় ও অর্থনৈতিক উপায়-উপকরণের সীমার মধ্যে থেকে ব্যয় করার মানে এই নয় যে, সে ভালো আয়-উপার্জন করলে নিজের সব টাকা-পয়সা কেবলমাত্র ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ ও ভোগবিলাসীতার মধ্যেই উড়িয়ে দেবে। আর অন্যদিকে তার আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীরা চরম সংকটের মধ্যে দিন অতিবাহিত করবে। এ ধরনের স্বার্থান্ধ ব্যয় বাহুল্যকে ইসলাম অমিতব্যয়িতার মধ্যে গণ্য করেছে।

এভাবে আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ একটি অবস্থা সৃষ্টি করে ইসলাম এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছে যা বাস্তবায়ন হলে বর্তমান পৃথিবীর রূপই পাল্টে যেত।

(সমাপ্ত)

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.